আপডেট : ১ এপ্রিল, ২০১৮ ২০:৫২

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের তিনপেয়ে সেই বাঘিনীর মৃত্যু

মোতাহার খান,গাজীপুর প্রতিনিধি
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের তিনপেয়ে সেই বাঘিনীর মৃত্যু

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের ছোট বেষ্টনীতে সেই তিনপেয়ে বাঘিনী মারা গেছে। আজ রোববার সকালে ১৫ বছর বয়সী বাঘিনীটি মারা যায়। কিছুদিন আগে ভুল প্রক্রিয়ায় বাঘিনীকে অচেতন করার অভিযোগ উঠেছে।

সাফারি পার্ক সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিন আগে বেষ্টনীতে থাকা একটি পুরুষ বাঘকে না সরিয়ে এই বাঘিনীকে ভুল প্রক্রিয়ায় ট্রাঙ্কুলাইজার গান দিয়ে অচেতন করা হয়। অচেতন বাঘিনীকে তখন আক্রমণ করে আহত করে ওই পুরুষ বাঘ। বাঘিনীটিকে পরে চিকিৎসা দেওয়া হলেও সে আর সুস্থ হয়নি।

সূত্রমতে, সুন্দরবনের এই বাঘিনীর প্রজনন বিষয়ে রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষের দক্ষতার অভাব ছিল। সুন্দরবনের বাঘ হিসেবে এর বংশবিস্তারের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা একটি পুরুষ বেঙ্গল টাইগারের সঙ্গে রাখা হয়। শক্তিশালী ও ক্ষিপ্র বুনো এই বাঘিনী ওই বাঘের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে একাকী বসে থাকত। পরে বাঘিনীকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সেটিকে ট্রাঙ্কুলাইজার গান দিয়ে অচেতন করা হয়। তবে সেটা ভুল প্রক্রিয়ায় হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাধারণত বাঘকে অচেতন করতে হলে অন্য বাঘগুলো আগে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই বাঘিনীকে ওই বাঘের সঙ্গে রাখা অবস্থায় কিছুদিন আগে অচেতন করা হয়। বাঘটি যখন অচেতন হয় পড়ে, তখন বাঘটি হঠাৎ হামলা করে আহত করে। চিকিৎসা করে বাঘিনীর জ্ঞান ফিরিয়ে আনা হলেও সেটি আর বাঁচেনি।

বাঘিনীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক বন সংরক্ষক শামসুল আজম। তিনি বলেন, বাঘিনীটির বয়স হয়েছিল। সেটির এক পা ছিল না। কাটা পা দিয়ে রক্ত ঝরত। এ কারণে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনে অচেতন করা হয়। তবে তিনি দাবি করেন, বাঘিনীর চেতনা ফিরে আসার পর সেটি সুস্থ হয়ে উঠেছিল। তবে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত করা হবে। তিনি আরও জানান, বাঘিনীর চামড়া সংরক্ষণ করা হবে। আর এটিকে মাটিচাপা দেওয়া হবে।

বাঘ বিশেষজ্ঞ খসরু চৌধুরী বলেন, এভাবে বাঘিনীকে রেখে বোকামির চূড়ান্ত পর্যায়ের একটি কাজ করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ক্ষেত্রে প্রজননের জন্য একই জাতের সুন্দরবনের বাঘের সঙ্গে বাঘিনীকে রাখা উচিত ছিল। তিনি বলেন, সাধারণত দেশের চিড়িয়াখানা বা সাফারি পার্কে যেসব বাঘ থাকে, সেগুলোর সঙ্গে বুনো বাঘ খাপ খাওয়াতে পারে না। প্রজননের ব্যবস্থা না নিয়ে বাঘিনীকে আগের মতো একাকী রাখা হলে হয়তো সে আরও বেশি সময় বাঁচত।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পা কাটা অবস্থাতেই এই বাঘিনীকে পাওয়া যায় ২০১২ সালের ১৪ জানুয়ারি সন্ধ্যাবেলায়। সেদিন এক পা কাটা অবস্থায় এই বাঘিনী সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেতকাশি গ্রামের একটি ঘরে অতর্কিতে ঢুকে পড়ে। বাড়ির লোকজন ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। খবর পেয়ে বন বিভাগ ও বন্য প্রাণী ট্রাস্টের কর্মীরা সেখানে পৌঁছান। ট্রাঙ্কুলাইজার গানে চেতনানাশক ওষুধ প্রয়োগ করে বাঘিনীকে অচেতন করা হয়। ধারণা করা হয়, চোরা শিকারিদের ফাঁদে বাঘিনীটির পা কাটা পড়েছিল।

উদ্ধার শেষে বন বিভাগের কর্তারা বাঘিনীকে প্রথমে ঢাকায়, পরে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে পাঠান। ২০১৩ সালের ২৪ মে এই বাঘিনীকে আনা হয় গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে। তখন থেকে সাড়ে তিন বছর ধরে একা রয়েছে তিন পায়ের এই বাঘিনী।

২০১৬ সালে সাফারি পার্ক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছিলেন, সুন্দরবনের বাঘিনীটি প্রাপ্তবয়স্ক হলেও সঙ্গীহীন। টাইগার সাফারিতে আরও নয়টি বেঙ্গল টাইগারও সুন্দরবনের এই বাঘিনীর কাছে পাত্তা পায় না। জাতে বেঙ্গল টাইগার হলেও নয়টি বেঙ্গল টাইগার এখানে আনা হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কিনে। ওদের জন্মও হয়েছিল গৃহপালিত পরিবেশে। অনেকটা পোষা প্রাণীর মতো নিয়ম করে খাওয়া-দাওয়া করা নয়টি বাঘের জন্মগত অভ্যাস। বুনো ভাব একেবারেই নেই বাঘগুলোর। সুন্দরবনের বাঘের বংশবিস্তার করানো হলে সাফারি পার্কের আকর্ষণও বাড়বে। তাই আফ্রিকা থেকে আনা বাঘের সঙ্গে রাখা হয়েছিল তিন পেয়ে বাঘিনীকে। তবে সুন্দরবনের বাঘিনীর গর্জনে আফ্রিকার বেঙ্গল টাইগাররা চুপসে থাকত।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে