ভাষণে রোহিঙ্গা নেই, উইঘুর নেই; তবুও ইমরান মুসলিম বিশ্বের নেতা!

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন

জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দেওয়া ভাষণে আবেগাপ্লুত আমাদের দেশের অনেকেই।এই ভাষণের পর অনেকেই তাঁকে এরদোগান, মাহথিরের পর মুসলিম বিশ্বের নতুন নেতা হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। ইমরান খানে মুগ্ধতা বাংলাদেশিদের জন্য নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তান টিমের প্রথম বাংলাদেশ সফরের কথা স্বরণ করে ইমরান খান বলেছিলেন, রাস্তার দুই ধারের মানুষ যেভাবে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে কয়েক মাইল রাস্তা তাদের অভ্যর্থনা জানিয়েছিল তা দেখে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন বাংলাদেশে এসে তাদের একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা হবে। কারণ ইমরান জানতেন সদ্য মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশিদের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের কথা ভুলে যাবার কথা নয়। তবে ইমরানর সেই হিসেব ভুল ছিল।

সেই বাস্তবতা স্বরণ করে ইমরানের জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশিরা আবেগাপ্লুত হবে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। ইমরান খানের ভাষণ তাদের তৃপ্ত করেছে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণের পর ইমরান খানকে যেভাবে মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে তাঁর ভাষণে মুসলিম বিশ্বের সমস্যা নিয়ে কোন বক্তব্য কি ছিল? নির্মোহ দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে বলতে হয় তেমন কিছুই ছিল না। ইমরান যা বলেছে সব পাকিস্তানের স্বার্থ কেন্দ্রীক।

ইমরানের ভাষণের অনেকটা অংশজুড়ে কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন। ভারতে মুসলিম নির্যাতন, হিন্দু মৌলবাদ ও আরএসএস নিয়ে কথা বলেছেন। কাশ্মীর ও আরএসএস নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, “কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া সংবিধানের ৩৭০ নং আর্টিকেল তারা বাতিল করলো। কাশ্মীরে প্রচুর সেনা সমাবেশ করলো। এখন কাশ্মীরে মোট সেনার পরিমাণ ৯ লাখ। এর মাধ্যমে ৮ মিলিয়ন লোকের উপর কারফিউ জারি করা হলো।

মি. প্রেসিডেন্ট একজন লোক কিভাবে এটা করতে পারে? এটা বুঝার জন্য আপনাকে জানতে হবে আরএসএস সম্পর্কে। আমি আরএসএস সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে চাই। নরেন্দ্র মোদি আরএসএস এর আজীবন সদস্য। আরএসএস এমন একটি সংগঠন যেটি এডলফ হিটলার এবং মুসোলিনীর হিংস্র আদর্শে অনুপ্রাণিত। নাৎসীরা যে পদ্ধতিতে অন্য সকল জাতি হতে নিজেদের সেরা ভাবতো। একইভাবে আরএসএসও নিজেদের সবার চেয়ে সেরা মনে করে।

আরএসএস ভারত থেকে মুসলমানদের জাতিগত নিধনে বিশ্বাসী, এটা সবাই জানে। আরএসএস হিন্দুত্ববাদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী। তারা মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ায়। তারা বিশ্বাস করে মুসলিম শাসনের ফলে হিন্দুত্ববাদের সোনালী যুগের অবসান ঘটেছে। তারা সরাসরি মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ায়। এটা সবাই জানে। গুগল করে আপনি জানতে পারবেন আরএসএস এর প্রতিষ্ঠাতা গোলকওয়ার। এই ঘৃণার আদর্শ ১৯৪৮ সালে হত্যা করেছে ভারতের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীকে।

এই ঘৃণার আদর্শ আরএসএস এর গুন্ডাদেরকে মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ২ হাজার মুসলিমকে জবাই করতে প্রেরণা দিয়েছিল। মোদির নির্দেশে গেরুয়া পাঞ্জাবী পরে ৩ দিন ধরে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল আরএসএস এর সন্ত্রাসীরা। তাদের তান্ডবে ২ হাজার মুসলিম নিহত হয় এবং গৃহহীন হয় দেড় লাখ মুসলিম। কংগ্রেস পার্টি বিবৃতি দিয়েছিল আরএসএস এর ক্যাম্পসমূহে সন্ত্রাসীরা রয়েছে। মোদি তখন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে আমেরিকা ভ্রমণ করতে পারেনি।

৮ মিলিয়ন লোককে বন্দী করে রাখছে! এটা কেমন মানসিকতা! সেখানে নারী, শিশু ও অসুস্থ মানুষ রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব কী ভাবছে? ৮ মিলিয়ন পশু বন্দী? তারা মানব সন্তান। জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের উগ্র চিন্তাধারা নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপিকে অন্ধ করে দিয়েছে।”

মূলত এগুলোই ছিল জাতিসংঘে দেওয়া ইমরানের ভাষণের টার্নিং পয়েন্ট। এখানে ইমরান খান বিশ্ব মুসলিম নিয়ে একটি কথাও বলেননি। তাঁর ভাষণে কাশ্মীর বাদে অন্য কোন নির্যাতিত মুসলিম বিশ্বের কথা নেই। কথা নেই চাইনিজ উইঘুরদের নিয়ে, যেখানে বছরের পর বছর লাখ লাখ মুসলিমকে বন্দি করে রেখেছে চীনারা। নির্মম ধর্মীয় ও জাতিগত নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। উইঘুর মুসলিমদের অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেটে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ ইমরান উইঘুর চাইনিজ মুসলিমদের সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন। জাতিসংঘের ভাষণেও উইঘুরদের নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি। কথা নেই মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে। যেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যার শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে, সে বিষয়ে কথিত মুসলিম বিশ্বের নতুন নেতা ইমরানের মুখে একটি কথাও ফোটেনি। কারণ এখানেও চাইনিজদের স্বার্থ নিহিত। ইমরান খান ভালো করেই জানেন চীনের এক লাত্থিতে পাকিস্তান ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে পথে বসবে। মুসলমানদের উপর জুলুমের মলম নিয়ে যারা ঘুরে বেড়ায় তারা কেউ কিন্তু উইঘুরে চাইনিজদের পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলে না। তাদের সব চিন্তা কেবল মোদী আর ভারত নিয়ে।

ইমরান খানের নিজ দেশে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে কোন কাদিয়ানী নিজেদের কাদিয়ানী মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিতে পারে না। পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নীরা শিয়াদের উপর হামলা চালায়, শিয়া মসজিদে বোমা মেরে এক-দেড়শো নামাজরত শিয়াদের হত্যা করে মারে। পাকিস্তান সরকার সুন্নী মতালম্বীদের এ জন্য কোনদিন শাস্তির মুখোমুখি করেনি। পাকিস্তানে হিন্দু-খ্রিস্টানদের ব্লাসফেমি আইন দিয়ে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাদের জেলে ভরে সম্পত্তি আত্মসাতের ঘটনা বেশ পুরোনো। এছাড়াও বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ তুলে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে তার নিজ দেশের মুসলিম বেলুচদের। এ বিষয়েও কোন কথা ফোটেনি ইমরানের মুখে।

ইমরানের ভাষণে ভারতের আরএসএস’কে একটা কাল্ট হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে পাকিস্তান দেশটার স্টাকচারটাই গড়া কাল্ট ইসলামিজমে। নরেন্দ মোদী একজন কাল্ট হিন্দুত্ববাদী কিন্তু ইমরান খান একটা কাল্ট ইসলামিক দেশের প্রধানমন্ত্রী, এটাই সত্য। একটা ইসলামিক জোশে পরিচালিত সেনাবাহিনীর পাপেট মাত্র। যে সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের নারীদের গণিমতের মাল ঘোষণা দিয়েছিলো। ৩০ লাখ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। এই যুদ্ধাপরাধের বিচার বাংলাদেশ করতে পারেনি। জাতিসংঘে কখনই এই যুদ্ধাপরাধের কথা উঠানো হয়নি। বিশ্ব তাই জানে না পাকিস্তান ৩০ লাখ বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। অগুণতি নারীদের ধর্ষণ করেছিলো। ওআইসিতে কখনই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

পাকিস্তান বেলুচিস্থান দখল করে রেখেছে। পাকিস্তান কাশ্মীরের একটা অংশ (আজাদ কাশ্মীর) দখল করে রেখেছে। সেখানকার অবরুদ্ধ মুসলিমদের জন্য ইমরানের মানবিকতা জাগে না কেন? ইমরান ভারত শাসিত কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধের হুমকি দেয়, কিন্তু তারা বেলুচ-কাশ্মীর দখল করে রেখেছে। সারা বিশ্ব জানে পাকিস্তান হচ্ছে ইসলামি জিহাদীদের আঁতুরঘর। পাকিস্তান হচ্ছে চীনের ভাড়াটে গুন্ডা। পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া একটি দেশ। পাকিস্তান যখন বেলুচদের সেনাশাসন দিয়ে ঘিরে রাখে বছরের পর বছর, সেটা ইমরানের ভাষণে মুগ্ধ এদেশের মানবতাবাদীদের একটুও ঘামায় না। পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের স্বাধীনতাও তাঁরা কেউ চায় না।

লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

8 thoughts on “ভাষণে রোহিঙ্গা নেই, উইঘুর নেই; তবুও ইমরান মুসলিম বিশ্বের নেতা!

  1. Comment
    Vai apni bodhoi rohinga
    issue ta shunenni jekane bola hoiche mynmar ethnic cleansing korche jodi na shune takhen abar sunor onurordh roilo…. Imran khan is the pride of Muslim Community

  2. Brother you are in a hallucination situation, You should avoid yellow journalism and do not make people donkey otherwise you will be great donkey. Listen the full phase lecture and then you will know rohinga issue discussed. He stated about 1 million rohinga muslims are thrown out from Myanmar (ethnic cleansing ).

  3. এসব বধির লোকরা কোন কিছু ভাল করে না শোনে মতামত দেয় কিভাবে??

    1. উইঘুর সম্পর্কে বলার ওডিও/ভিডিওটা একটু দিবেন। আমরা যেটা পেয়েছি সেখানে তো একটা শব্দও নেই।

  4. Agreed your speech.
    Imran is show up man.
    Why he worried for Kashmir why not his country?
    After Imran PM day by day why Pakistan is going to hell
    He is not leader he is only speech man.
    Imran’s x,wife said what ever he talked at night he forget next morning.
    Even she said he never be a good leader,

  5. ম রহমান

    - Edit

    Reply

    পাকিস্তান রে ভালো লাগে না। তাই ওর পক্ষে কোনো কথা বলি না। তাই বলে এনায়ে বিনায়ে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কও কে ছোট করার কোনো মানে হয় না। আপনি ভালো লিখতে পারেন ভালো লিখার এ গুণাবলী ভালো কাজে ব্যবহার করেন। এই সব ফালতু বিষয় আপনার সাজে না

  6. কাশ্মীর আর নিজের স্বার্থ ছাড়া ইমরান খান আর কিছু বলেনি, কে বলেছে আপনাকে? সাংবাদিক কি দালালি করতে হয়েছেন??
    আপনাদের পুরো সংবাদটা পড়লাম আমি এটাকে সংবাদ বলি না, দালালি বলি। সঠিক, সত্য সংবাদ প্রচার করেন , তাহলে বাজারজাত করতে পারবেন। এগুলো জনগন খায় না। কমেনগুলো দেখে পড়তে পারছেন🤣😂😂

মন্তব্য