সরকারের ভেতরেই তৈরি হয়েছে ‘বিরোধী দল’?

আফসান চৌধুরী

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক কাঠামোর চারটা মূল অংশ রয়েছে। সবার ওপরে আছে সেনাবাহিনী। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন তাদের স্পর্শ করে না। এসব থেকে তারা আলাদা থাকে। তারপর আছে ব্যবসায়ীরা। তারপর আমলারা এবং সর্বশেষ আছে রাজনীতিকরা। সবচেয়ে দুর্বল অংশ হলো রাজনীতিকরা, কারণ অন্যান্য দলের দয়া-মায়ার ওপর নির্ভর করে তাদের ক্ষমতায় যাওয়া।

সম্প্রতি ক্যাসিনোতে যে অভিযান হলো সে প্রসঙ্গে বলছি, যতদিন পর্যন্ত তাদের দিকে পুলিশ-র‍্যাব তাকায়নি ততদিন পর্যন্ত তারা আরাম আয়েশে ব্যবসা করে গেছে। যেই তাকালো, তারা শেষ হয়ে গেল। তাহলে সবচেয়ে দুর্বল অংশ কোনটা? রাজনীতিকদের অংশটা। এটা যে আজকে প্রথম হচ্ছে তাও তো নয়।

যুবলীগেরঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি থাকতেন গুলশানে। তার তো প্রকাশ্য কোন ব্যবসা নেই। পত্রিকায় পড়লাম তার সম্পদের বড় উৎস চাঁদাবাজি। এই রাজনীতিবিদদের ধারণা হচ্ছে, যেহেতু তাদের দল ক্ষমতায় তাই কোন অসুবিধে হবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তো প্রমাণ করে দিলেন যে, তাদের ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী চলতে পারেন। এ রকম যখন অবস্থা তখন সবারই একটু সামলে চলা উচিত।

যারা দলীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে এসব আন্যায় কাজে লিপ্ত হলো, তারা হয়তো ভাবছিলেন প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে কিছু বলবেন না। তারা কী করে ভাবলেন তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রতি প্রধানমন্ত্রী অনুগত? কী করে ভাবলেন প্রধানমন্ত্রী এগুলো জানার পরও সব মেনে নেবেন? প্রধানমন্ত্রী দলের সভাপতি হদতের পারেন, কিন্তু তিনি তো প্রধানমন্ত্রী। তিনি শুধু আওয়ামী লীগের নন, সারা দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাকে সব সামলাতে হয়।

একটা বিষয়ে আমরা বিস্মিত হয়েছি যে, এই ক্যাসিনোগুলো থানার কাছাকাছি। তাহলে পুলিশ তো নিশ্চয়ই জানতো। সাংবাদিকতায় আমার ৪৫ বছর হয়েছে। আজ পর্যন্ত একটা ঘটনাও দেখিনি যেটা পুলিশ জানে না। সেটাই যদি হয় তাহলে পুলিশ নিশ্চয়ই জানতো। আমার ৬৭ বছর বয়স। সত্যি বলতে কি আমি জনিজেও জানতাম না যে, ঢাকায় ক্যাসিনো আছে। কিন্তু  অনেকে দেখি জানতো। তাহলে আমার মতো মানুষের সংখ্যা নিশ্চয়ই কম।

প্রশ্ন হলো, এগুলো এত দিন চলতে দেওয়া হল কেন? নিশ্চয়ই রাজনৈতিক প্রভাব ছিল বলে। যদি রাজনৈতিক প্রভাব থাকে তাহলৈ পৃষ্টপোষকও ছিল। একটা খবর এসেছে, যুবলীগের অনেকেই এটা থেকে ভাগ পেত। তাই যদি হয় তাহলে যুবলীগ এটা করতে গেল কেন? পুলিশ চোখ উল্টেছে। তারা সব সময়ই এটা করে। এই অভিযান কিন্তু র‍্যাব করেছে। তাহলে বোঝা যায় শুধু পুলিশের ওপর সরকার নির্ভর করেনি। নির্ভর করেছে র‍্যাবের ওপর।

২০১৮ সালের নির্বাচনের পর পুলিশের ওপর কিন্তু অনেকবার আঘাত এসেছে। পুলিশ যদি মনে করে সরকার কোন না কোনভাবে তাদের ওপর নির্ভর করছে, এটা ঠিক না। যিনি ডিআইজিকে জেলে ঢোকাতে পারেন তিনি অনেক কিছুই করতে পারেন। দলের লোকেরা এতটা বোধ হয় ভাবেনি।

আওয়ামী লীগের নিশ্চয়ই দলের ওপর কোন চাপ তৈরি হয়েছে। আগে যখন বিএনপি ছিল কমবেশি সবাই তো একই কাজ করে। একটা দল ততক্ষণ শুদ্ধি অভিযানে যায় না, যতক্ষণ না তাদের কোন অসুবিধা হয়। আমরা জানি না আওয়ামী লীগের ওপর কোন চাপ তৈরি হয়েছে কিনা। তবে একটা দল যখন বিশালভাবে জয়ী হয় বা ক্ষমতাবান হয় এবং অন্য কোন বিরোধী দল থাকে না, তখন সরকারের ভিতরেই বিরোধী দল তৈরি হয়ে যায়। এটিই এখন হচ্ছে।

লেখক : গবেষক, সাংবাদিক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম       

মন্তব্য