শেখ হাসিনার উত্তরসূরী শেখ রেহানা?

গত ৩৮ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্বে আছেন বঙ্গবন্ধুকন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া বা দলীয় প্রধানের পদ থেকে সরে যাওয়ার বিষয়টি তিনি নিজেই তুলেছেন বেশ কয়েকবার। কিন্তু প্রতিবারই দলের নেতা-কর্মী, সমর্থকেরা সমস্বরে দাবি তুলেছেন, আজীবন শেখ হাসিনাকেই দলের নেত্রী হিসেবে চান তারা।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে শেখ হাসিনা যদি সত্যিই অবসরে যান তাহলে স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী ঐতিহ্যবাহী দলটির হাল ধরবে কে? কে আছে এমন যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি, যিনি দলকে এক সুতোয় গেথে রাখতে সক্ষম হবেন? বিভিন্ন সময়ে সজিব ওয়াজেদ জয়ের কথা উঠে আসলেও জয়কে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে দলের তেমন কোন নেতৃত্বের ভুমিকায় দেখা যায়নি।

তবে শেখ হাসিনা সম্ভবত জয়ের নেতৃত্বের কথা ভাবছেন না। তাঁর ভাবনায় ছোটবোন শেখ রেহানা। কথাটা শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে ঘরোয়া আলোচনায় বলেছেনও। শেখ হাসিনা বলেন, রেহানা ছাড়া তিনি অচল, শেখ রেহানা ছাড়া তিনি পরিপূর্ণ নন।

আওয়ামী লীগের কোন নেতা নন রেহানা। তবে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দুঃসময়ে, নানা ক্রান্তিকালে শেখ রেহানা যেন ভরসার স্থান। বিশেষ করে শেখ রেহানার অবদানের কথা উচ্চরণ হলে ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেন কথা দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে। শেখ রেহানাই সেই ক্রান্তিকালে আওয়ামী লীগকে বিভক্তর হাত থেকে বাঁচাতে, শেখ হাসিনাকে কারামুক্ত করতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে মূখ্য ভুমিকা পালন করেছিলেন।

শেখ রেহানা যদিও রাষ্ট্রিয় কিংবা দলীয় কোন পদে নেই, কিন্তু আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা তাঁর সঙ্গেই পরামর্শ করেন। শেখ হাসিনা ছোট বোন রেহানার মাঝে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের ছায়া দেখতে পান। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ছয়দফা থেকে শুরু করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৭৯ এর গণআন্দোলনে বাঙালি জাতীর মুক্তির জন্য জীবনবাজি রেখেছিলেন সেসময় বঙ্গবন্ধুকে আগলে রেখেছিলেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। বিশেষ করে , সেসময় আওযামী লীগের সব ধরণের সংকটে বঙ্গমাতার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সাহসী এবং সপ্রতিভ। প্যারোলে মুক্তি নিয়ে নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে না যাওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত ছিল বঙ্গমাতার। আওয়ামী লীগ যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ছিন্নভিন্ন, দলের শীর্ষ নেতারা সকলে যখন কারাবন্দী তখন বঙ্গমাতাই আওয়ামী লীগকে কোন পদে না থেকেও আগলে রেখেছিলেন। নেতাকর্মীদের সহায়তা করেছিলেন এবং আন্দোলনের জন্য দলকে সংগঠিত করেছিলেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিজেই একাধিকবার বক্তৃতায় বলেছেন , ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের ক্ষেত্রে বঙ্গমাতার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তিনিই জাতির পিতাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন তার মনের মাঝে যা আসে তাই বলার জন্য। ঠিক একইভাবে শেখ হাসিনাকে ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন শেখ রেহানা। শেখ রেহানাই হলেন শেখ হাসিনার অভিভাবক। তিনি শেখ হাসিনাকে শাসন করেন, পরামর্শ দেন, নিঃশঙ্কচিত্তে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ান।

রাষ্ট্রপরিচালনায় শেখ হাসিনা অত্যন্ত দক্ষ ও দূরদর্শী হলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি নিজের প্রতি মোটেও যত্নশীল নন। প্রায়ই তিনি তাঁর ওষুধপত্র খেতে ভুলে যান, সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করেন না। সারাক্ষণ দেশের মানুষের চিন্তা করতে গিয়ে নিজে বেছে নিয়েছেন এক অগোছালো জীবন। কিন্তু এখানে তাঁকে শাসন করেন রেহানা। শেখ হাসিনার চেয়ে রেহানা বয়সে ছোট হলেও একজন অভিভাবক বটে। শেখ হাসিনা যার বকুনির ভয় পান তিনিও শেখ রেহানা। তাই রাজনীতিতে শেখ হাসিনা যখন বারবার ঘোষণা করেন অনেক হয়েছে আর নয়, আর তিনি রাজনীতিতে থাকবেন না- তখন বারবার করে শেখ রেহানার নাম উচ্চারিত হয়, শেখ হাসিনার পরে কি শেখ রেহানা?

তবে শেখ রেহানাকে যারা কাছ থেকে চেনেন তারা জানেন মূলধারার রাজনীতিতে শেখ রেহানা কখনও যুক্ত হতে আগ্রহী নন। তিনি একজন রত্নগর্ভা মা। তিনি তার তিন সন্তানকে সঠিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। তাদের মধ্যে টিউলিপ সিদ্দিকী ইতোমধ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি একজন গবেষক ও চিন্তাশীর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। আরেক কন্যা আজমিনা সিদ্দিকী রুপন্তী মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে এরইমধ্যে পশ্চাত্যে সাড়া ফেলেছেন।

শেখ রেহানা এখন নিজেই বলেন আমার অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে। শেখ হাসিনার পাশে থেকে তাকে পরামর্শ দেওয়া ছাড়া তার আর কোন কাজ নেই বলেই তিনি ঘনিষ্ঠজনদের কাছে বলেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোন কিছুই নিশ্চিত নয়। শেখ হাসিনা নিজেও কি জানতেন তাকে আওয়ামী লীগের হাল ধরতে হবে, নেতৃত্ব দিতে হবে ৩৮ বছর ধরে? ঠিক তেমনিভাবে  কে জানে হয়তো আওয়ামী লীগের কোন সন্ধিক্ষণে , কোন ক্রান্তিকালে শেখ রেহানাকেও দলের হাল ধরতে হতে পারে। কারণ শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেওয়ার, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্র একমাত্র গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিটির নাম যে শেখ রেহানা।    

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

মন্তব্য