রাজাকারের তালিকায় ‘মুক্তিযোদ্ধা’, দায় কার?

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন

স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা এবং পাকিস্তানিদের দোসর হিসেবে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত থাকা ব্যক্তিদের এই তালিকা প্রকাশ করা হয়। তবে তালিকা প্রকাশের পরপরই শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক। তালিকায় নানা অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় এমন সব ব্যক্তির নাম এসেছে, যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, লড়াই করেছেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। দেখা যাচ্ছে অনেক গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের নাম, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই মঞ্চে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করা ব্যক্তির নাম, এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির নামও এই তালিকায় রয়েছে। অথচ এতে নেই চিহ্নিত অনেক রাজাকারের নাম। এসব কারণে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বরিশালের আইনজীবী তপন চক্রবর্তী একজন তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা। যিনি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও পান। একাত্তরে তার বাবা সুধীর চক্রবর্তীকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। অথচ তপন চক্রবর্তী ও তার মা শহীদজায়া উষা চক্রবর্তীর নামও এসেছে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায়।

একইভাবে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও স্বাধীনতা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি মজিবুল হক, বগুড়ায় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে পরিচিত আইনজীবী মহসিন আলী, আব্দুস সালাম, তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুর রউফ, পুলিশ কর্মকর্তা এস এস আবু তালেব, জয়পুরহাট মহকুমার (সাব-ডিভিশন) সাবেক গভর্নর কছিম উদ্দীন আহম্মেদ, সাবেক জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) মজিবর রহমান আক্কেলপুরি, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ফরেজ উদ্দীন মাস্টার, প্রয়াত মজিবর রহমান মাস্টার, প্রয়াত তাহের উদ্দীন মাস্টার, প্রয়াত ডা. মহসিন আলী মল্লিক, প্রয়াত হবিবর রহমান, প্রয়াত নজিবর রহমান সরদার, মুক্তিযোদ্ধা আমিরুল ইসলামসহ আরও অনেকের নাম এসেছে স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায়, যারা জাতীয় বা স্থানীয়ভাবে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে পরিচিত। অনেকে আবার নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও পাচ্ছেন। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে এ তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ সংশ্নিষ্টদের পরিবার, স্বজনরা ও সাধারণ মানুষ।

রাজশাহীতে রাজাকারের তালিকায় নাম এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপুর। রাজাকারের তালিকায় নাম আসার বিষয়ে গোলাম আরিফ টিপু বলেন, ‘আমি এটা শুনে বিস্মিত হয়েছি। এটা কি করে সম্ভব? আমি জীবনে কখনো ওদের লাইনে যাইনি। রাজাকারের তালিকায় আমার নাম আসবে এটা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি এটার শক্ত প্রতিবাদ করবো।’

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘১৯৭১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতকৃত রাজাকারদের তালিকা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে হুবহু প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে কোনো ভুলত্রুটি আছে কি না, সেটা আমরা জানি না। তালিকা প্রকাশের পর অনেকে ফোন করে বলছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নামও তালিকায় রয়েছে। কোনো ব্যক্তির নামের সঙ্গে অন্য কারোর নামের মিলের কারণে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে থাকতে পারে। তারপরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে, সেগুলো বিবেচনা করা হবে।’

তালিকায় এসব ব্যক্তির নাম যেভাবেই আসুক না কেন সেটি দেশের জন্য লজ্জাজনক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রাজাকারের এই তালিকায় কেন আসবে এসব ব্যক্তির নাম। যারা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন, আবার যিনি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর—তার নাম কেন আসবে। হয়তো রাজাকাররা এই তালিকা তৈরিতে কাজ করেছেন। এ বিষয়ে (১৫ ডিসেম্বর) ভাষাসৈনিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেছেন, ‘অনেক রাজাকার আছে, যাদের জিয়াউর রহমান ও এরশাদ সম্মান দিয়েছিল। যেমন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ফারুক। তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই ফারুককে পরে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। এখনো রাজাকার আছে। অনেক রাজাকার আছে। এখনো আছে। এমনকি আমাদের জননেত্রী শেখ হাসিনার আশপাশেও আছে। …তাদের নাম বললে আমার আর ঢাকায় আসা হবে না। তাই আমি নাম বলতে চাই না। এই হচ্ছে অবস্থা। রাজাকারদের তালিকা করলে দেখা যাবে, রাজাকাররাই সেই তালিকা তৈরি করছে। ওই তালিকায় মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকার, রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাবে।’

প্রকাশিত ওই তালিকা নিয়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘অভিযোগ গুরুতর। কিছু নাম ইতোমধ্যে আমরাও শুনেছি। তদন্ত না করে কিছু বলা ঠিক হবে না। কারণ একই নামে বিভিন্ন ব্যক্তি থাকতে পারেন। তাই যেসব নাম আমরা পেয়েছি, সেগুলো তদন্তের জন্য নির্মূল কমিটির জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাদের মতামত পাওয়ার পর এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে শিগগিরই জানানো হবে। তার আগে তালিকা বিতর্কিত করা ঠিক হবে না।’

প্রকাশিত রাজাকারের তালিকা নিয়ে অনেক বিতর্ক-সমালোচনা হচ্ছে। তবে ঢালাওভাবে এই বিতর্ক ভুলও হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। কারণ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এই তালিকা পাক হানাদার বাহিনীর তৈরি করা। মন্ত্রণালয় নিজস্ব কোন তালিকা তৈরি করেনি। রাজাকার বাহিনী দখলদার পাকিস্তান সরকার করেছিল। কেউ পাকিস্তান রক্ষার জজবায় রিক্রুট হয়েছিল, কেউ চাকরির আশায়, কেউ বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার আশায়। আবার অনেকে জীবন বাচাতেও এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।

ঘটনা যাইহোক, রাজাকার বাহিনী পাকিস্তানের তৈরি করা, সঙ্গত কারণেই তালিকা থাকার কথা পাকিস্তানের হাতে। প্রত্যেক রাজাকারের যোগদানের দিনক্ষণ, পাকিস্তান সরকার থেকে প্রাপ্ত বেতন-ভাতার বিবরণ সরকারি নথিতে লিপিবদ্ধ হতো। ফলে বিষয়টা এমনও হতে পারে ওই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হয়তো সেই সময়ে আসলেই রাজাকার বা স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন। পরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান, সামরিক জান্তা এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকারের সময় বিপুল সংখ্যক রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেওয়া হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট যোগাড় করা দশ বছর আগেও কতো সহজ ছিলো তা তো গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা সকলেই জানি।

আবার সব অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রাজাকার বলাটাও যৌক্তিক হবে না। কারন দালাল আইন হবার পর দলীয় কোন্দলের রেশ ধরে অনেককে হেনস্তা করা হয়েছিল তার বিস্তর প্রমান নানাভাবে পাওয়া যায়। হয়তো,এখন যারা অভিযোগ করছেন, তাদের বিরুদ্ধেও সেরকম কিছু হয়েছিল। আবার অনেকের নাম তাঁদের অনিচ্ছায় পাক বাহিনী রাজাকারের তালিকায় দিয়ে থাকতে পারে। পাকিস্তানের কোলাবরেটররা (তখন দখলদার সরকারের অধীনে যারা চাকরি করেছে) তালিকায় শত্রুতামূলক কারো নাম শেষ সময়ে (১০ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) কিংবা পরে (১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ২০১৯) যোগ করেছে কিনা সেটাও যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।

এমন একটা স্পর্শকাতর বিষয় প্রকাশের আগে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে আরও সতর্ক হওয়ার দরকার ছিল। সবদিক বিবেচনা করে, যাচাই-বাছাই করে রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করা উচিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের দেওয়া ব্যাখ্যা শুনে এটা মনে হতেই পারে- জাতিকে দেওয়া কথা রাখতেই তড়িঘড়ি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের থাকা এই নথি প্রকাশ করেছে তাঁরা। তবে এটা এভাবে প্রকাশ করা একেবারেই উচিত হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে ডিসিদের কাছে জেলার রাজাকারদের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। ১১ জেলা থেকে তালিকাও পাঠিয়েছিলো। তবে তাদের পাঠানো তালিকার ওপর ভরসা করতে পারেনি মন্ত্রনালয়। আর তখনই সমস্যা তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এর আগে বহুবার কথা দিয়েছিলেন তিনি মুক্তিযাদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ করবেন কিন্তু তা করতে পারেননি। আবার রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করার কথা বলে আসছেন অনেকদিন থেকে। কিন্তু মাত্র ১১ জেলার তালিকা এসেছে, তাও অসম্পূর্ণ। কী করবে তাহলে মন্ত্রণালয়! চিন্তিত হয়ে দফায় দফায় ফোন দিয়ে স্বরাষ্ট মন্ত্রনালয় থেকে তালিকা এনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় তা যাচাই বাছাই না করে প্রকাশ করে দিলো! তাদের উচিত ছিলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় এবং জেলা রেকর্ডস অবমুক্ত করে দেওয়া। সারা দুনিয়ায় সরকার দলিল অবমুক্ত করে। তাহলে মন্ত্রণালয়ের ওপর এতো চাপ আসতো না।

একটা বিষয় ভালো করে বোঝা প্রয়োজন যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কোনো তালিকা তৈরি করেনি,এই তালিকা যাচাইও হয়নি, তাই এটা নিয়ে যে কেউই সন্দেহ প্রকাশ করতেই পারে। আবার এরা যদি সত্যিই রাজাকার থেকে মুক্তিযোদ্ধা সেজে থাকেন তাহলে এই রাজাকারদের মুক্তিযাদ্ধা বানিয়েছেন কোন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা কোন কর্মকর্তা? তাদেরও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক। দেশের এমন একটা ঐতিহাসিক, স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয় গাছাড়া ভাব নিয়ে তালিকা প্রকাশ করতে পারে না। এই বিষয়টা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া মানেই এর গুরুত্ব হ্রাস পাওয়া। এর গুরুত্ব কমে যাওয়া মানে, প্রভাবশালী রাজাকারদের নিজেদের বাঁচানোর সুযোগ পাওয়া। এটা দেশের জন্য চরম অশনি সংকেত।

লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

মন্তব্য