খালেদা মুক্তির আন্দোলন শুধুই কর্মীদের মন রক্ষার চেষ্টা?

গাজী মুনির

গতকাল জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি পিছিয়ে দেওয়ার প্রেক্ষাপটে আদালতকক্ষে ন্যক্কারজনক হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা মুহুর্মুহু স্লোগান দেন। বিচারপতিদের এজলাস ত্যাগের সময় ‘ধর, ধর’ বলে চিৎকার করেন। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে আদালতকক্ষে তাঁদের অবস্থান ও হট্টগোলের কারণে আপিল বিভাগের কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে চরম হট্টগোল ও নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার নিকৃষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তাঁরা।

বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের বিশৃঙ্খলার কারণে আদালতে কাল আর কোন মামলার শুনানি হতে পারেনি। খালেদা জিয়ার মামলার শুনানি না হলে অন্যকোন মামলার শুনানি হতে দেবেন না বলে আদালত কক্ষে অবস্থান নেন তারা। হইচইয়ের মধ্যে আদালতের ক্রম অনুসারে মামলা ডাকা হয়। ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে অন্য একটি মামলায় শুনানির জন্য দাঁড়ান সিনিয়র আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি। বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা টেবিল চাপড়ান, হৈ চৈ করেন। শুনানি করার চেষ্টা করেও পারেননি আজমালুল হোসেন কিউসি। এ সময় বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা বলেন, খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি ছাড়া আর কোনো শুনানি হবে না। এসময় বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করে চলে যেতে চাইলে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা ‘ধর, ধর’ বলে চিৎকার করেন।

বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মুহুর্মুহু স্লোগান, মাঝে মাঝে সরকার সমর্থক আইনজীবীদের প্রতিবাদের মুখে চরম হৈচৈ-হট্টগোলের সৃষ্টি হয় আদালতে। ফলে বিচারকাজ বন্ধ হয়ে যায়। বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘খালেদা, জিয়া; জিয়া, খালেদা’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। এ প্রেক্ষাপটে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতি প্রথম ধাপে এজলাস ত্যাগ করেন। পরে সোয়া এক ঘণ্টার বেশি সময় নির্বিকার এজলাসে বসে থাকেন বিচারপতিরা।

আদালতে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের এধরণের নজিরবিহীন আচারণে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। তিনি বিএনপির আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেছেন– ‘বাড়াবাড়ির একটা সীমা থাকা দরকার। আদালতে এ রকম (আদালতে বিশৃঙ্থলা) নজির আর দেখিনি। আমরা কাগজ দেখে বিচার করব। কে কী বলল, তা দেখব না।’

খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের এধরণের কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য অন্যের অধিকার হরণের পর্যায়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার আদালতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি থাকে। সেগুলো না হওয়ায় অনেকেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। একটা মামলার শুনানি না হলে কি যে ভোগান্তি সেটা ভুক্তভূগীরাই ভালো বলতে পারবেন। এভাবে আদালতকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের চেষ্টা নিঃসন্দেহে আদালত অবমাননা ও অন্যের অধিকার হরণের সামিল। কোন সভ্য সমাজে এমনটা ঘটার নজির নেই।

দেশের মানুষ দুর্নীতি পছন্দ করে না। তারা এও জানেন, খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান দুর্নীতির জন্যে দেশের মানুষের কাছে নিন্দিত। শুধু যে নিন্দিত তা নয়, তারা অনেকখানি ধিকৃত। যে কারণে খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় সাজা পাওয়ার পর, জেলে যাওয়ার পরে বিএনপি দেশের সাধারণ মানুষের কোনও সমর্থন পায়নি। বিএনপি নেতারাও বিষয়টি বুঝতে পেরে, আজ অবধি খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্যে কোনও আন্দোলনের কর্মসূচি দেননি। কারণ তারা জানেন, এই কর্মসূচিতে দেশের সাধারণ মানুষের কোনও সমর্থন পাওয়া যাবে না। এমনকি নির্বাচনের আগে তারা যে নির্বাচনি জোট গড়েছিলেন, সেখানেও তাদের জোটের মূল নেতা ড. কামাল হোসেনের শতভাগ সমর্থন পাননি খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে। তিনি অনেকটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি ভাবের ভেতর দিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির কথাটি বলেছিলেন। ৪ ডিসেম্বরও তিনি খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে যে কথা বলেছেন, তাও তেমনটি। তার কথার অর্থ এমন ছিল, যে কেউ জামিন পেতে পারেন। ড. কামালের এই অবস্থান দেখে বিএনপি তাকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী হিসেবেও নেননি।

বিএনপি নেতারা বুঝতে পেরেছে আইনি লড়াইয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি অসম্ভব। এমত অবস্থায় বিএনপি খালেদা জিয়ার জন্য যে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সেটা অনেকটা তাদের কর্মীদের মন রক্ষার জন্যে। কারণ, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের কিছু অন্ধ ভক্ত কর্মী থাকে। এরাই মূলত একটি দলের প্রাণ। তাদের ধরে রাখা যেকোনও রাজনৈতিক দলের কর্তব্য। বিশেষ করে দুর্দিনে তারা ছাড়া কেউ থাকে না। বিএনপির এখন দুর্দিন। এখন তাদের কর্মী বলতে সারাদেশে হাতেগোনা কিছু মানুষ। জামায়াতে ইসলামীর যে কর্মীদের ওপর ভরসা করে তারা মিছিল মিটিং করে, তারা শেষ অবধি কোথায় যাবে তা নিয়ে বিএনপিরও সন্দেহ আছে। তাই তাদের অন্ধভক্ত কর্মীদের ধরে রাখার জন্য তাদের কোনও একটা কিছু করতে হচ্ছে। তাঁরা যদি আইনি পথে খালেদা জিয়ার মুক্তি চাইতেন তাহলে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এ ধরণের বিশৃঙ্খলা করতেন না। এ ধরণের বিশৃঙ্খলা করে যে খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয় সেটা তারা ভালো করেই জানেন। খালেদা জিয়ার মুক্তি নয়, আদালতে বিশৃঙ্খলা করে তারা ভিন্ন কিছু চাইছেন বলেই রাজনীতি সচেতন মহলের ধারণা।

এমন বাস্তবতায়, বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীদের সামনে দাঁড়িয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে তাদের জুনিয়রা যে কাজ করলেন, সেটা তো তারা নিজ চোখেই দেখেছেন। যে ধরণের কাজে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা তাদের আসন ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন, সে কাজ একটি দেশের বিচার বিভাগের সিনিয়র আইনজীবীদের চোখের সামনে কতটা শোভনীয়, তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে এই কাজের ভেতর দিয়ে দেশের মানুষ দুটো মেসেজ পেলো, বাস্তবে আইনের কথা বললেও আইনের প্রতি বিএনপির বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই। দুই, তারা জানেন, প্রকৃত বিচার হলে তারা খালেদা জিয়ার জামিন পাবেন না, তাই বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যে, বিচার বিভাগকে জিম্মি করে রায় পক্ষে নেওয়ার জন্র এ কাজ করেছেন।

বিচারবিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যে বিএনপি গত এক সপ্তাহ ধরে পত্র-পত্রিকা ও রেডিও টেলিভিশনে তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে নানান কথা বলে আসছেন। তারা এও বলেছেন, ৫ তারিখ তারা কোর্টের চারপাশে বিপুল জনসমাবেশ করাবে। খালেদা জিয়ার জামিন না হলে সুপ্রিম কোর্ট থেকেই সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে যাবে তারা। যদিও তারা সেসবের কিছুই করতে সমর্থ হয়নি, তারপরেও গত কয়েকদিন ধরে একটি অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরির চেষ্টা তারা করেছে। এমনকি তারা গাড়ি ভাঙচুরের জায়গা হিসেবে বেছে নেয় সুপ্রিম কোর্টের সামনের রাস্তাটি। এটাও মূলত বিচারপতিদের ওপর এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা। তাই বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীদের উপস্থিতিতে তাদের জুনিয়রা ৫ তারিখ সুপ্রিম কোর্টের অভ্যন্তরে যে কাজ করেছে সেটা এই ধারাবাহিক কাজেরই চূড়ান্ত প্রকাশ।

এখানে একটি সত্য সবাইকে মানতে হবে, রাস্তা আর সুপ্রিম কোর্টের অভ্যন্তর এক নয়। তাছাড়া সাধারণ পাবলিক আর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা এক নয়। তাই বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীরা তাদের এই আইনজীবীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবেন, সেটা তাদের বিষয় তবে বিচারবিভাগ যদি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সেটা বিচার বিভাগের শৃঙ্খলার পক্ষেই যাবে।  সেটার প্রয়োজনও আছে। ভবিষ্যতে যাতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এধরণের নজিরবিহীন কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষার্থে এটা জরুরি।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

মন্তব্য