স্বাধীনতাবিরোধী দল ‘জামায়াত’ নিষিদ্ধ হবে কবে?

মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জামায়াতে ইসলামীর বিচার এবং দলটি নিষিদ্ধ করার কথা বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলে এলেও বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও সরব একাত্তরে প্রকাশ্যে স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। জামায়াত নিষিদ্ধ এবং বিচার নিয়ে সারাদেশ সোচ্চার হলেও নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন বাতিল ছাড়া আর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অর্ধযুগেও নিষ্পত্তি হয়নি জামায়াত নিষিদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের দায়েরকৃত মামলার। ফলে ঝুলে আছে জামায়াত নিষিদ্ধের আইনি প্রক্রিয়া।

যুদ্ধাপরাধী রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিষিদ্ধের দাবি দীর্ঘদিনের। ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই রাজাকার শিরোমণি গোলাম আযমের মামলার রায়ে একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে ‘ক্রিমিনাল দল’ আখ্যায়িত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ে বলা হয়, জামায়াত একটি অপরাধী সংগঠন। একাত্তরে তাদের ভুমিকা ছিল দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। এরপর বিভিন্ন মহল থেকে দল হিসেবে জামায়াতের বিচারের দাবি জোরালো হয়।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি সংসদে জামায়াত নিষিদ্ধে জনসাধারণের দাবি বাস্তবায়ন আর কতদূর- নজিবুল বশর মাইজভান্ডারির এমন প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জামায়াতের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি মামলা রয়েছে। এ মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। দ্রুত মামলার রায় হয়ে গেলে নিবন্ধনের মতো আদালতের রায়েই নিষিদ্ধ হবে জামায়াত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার শুরুর পর ২০১৩ সালের আগস্টে সেই অপরাধীদের দল জামায়াতের বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়। পরের বছর ২০১৪ সালের ২৫ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্তও করে মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থা। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে সংগঠনের বিচার ও শাস্তির বিধান নেই। এই অবস্থায় ২০১৪ সালে আইন মন্ত্রণালয় অপরাধী সংগঠনেরও শাস্তির বিধান রেখে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। প্রস্তাবিত ওই সংশোধনীতে ট্রাইব্যুনালস আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ‘ব্যক্তি’ শব্দটির পর ‘অথবা সংগঠন’ সন্নিবেশ করা হচ্ছে। আরেকটি ধারায় ‘দায়’ শব্দটির পরিবর্তে ‘অথবা সাংগঠনিক দায়’ এবং অপর ধারায় ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি’ পরিবর্তে ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংগঠন’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া সংগঠন হিসেবে দোষী প্রমাণিত হলে ওই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার বিধান রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এরপর নিষিদ্ধ হতে পারে এমন আশঙ্কায় জামায়াতও নতুন নামে আত্মপ্রকাশের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবরও বের হয় বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু নিষিদ্ধ না হওয়ায় তাদের সে পথে যেতে হয়নি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দলটি এখনো রাজনীতিতে টিকে আছে সদর্পে।

সরকারপক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস পাওয়া গেলেও আইনের সংশোধন হয়নি গত পাঁচ বছরেও। মন্ত্রিপরিষদে ফাইলবন্দি রয়েছে সংশোধিত আইনের চূড়ান্ত খসড়া। জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, আইনটি এখনো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে রয়েছে। কবে নাগাদ মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে সে বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

অন্যদিকে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে মাঠে নামেন ২০১৩ সালের ১ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে নিবন্ধন ও দলীয় প্রতীক হারানো জামায়াতের ২৫ জন প্রার্থী। অবশ্য তাদের মধ্যে কেউ জিততে পারেননি। নিষিদ্ধ না হওয়ায় তারা সংগঠিত হচ্ছে বলে মনে করেন অনেকেই।

তবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী শুরুর আগেই জামায়াত নিষিদ্ধ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এতদিনেও জামায়াত নিষিদ্ধ না হওয়া আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়। এটি আমাদের ব্যর্থতা। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষিদ্ধ হবে জামায়াত।

গবেষকদের মতে, সংবিধানের ৩৮ ধারার গ উপধারা অনুযায়ীই সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। ওই ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, রাষ্ট্র বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি কার্য পরিচালনার উদ্দেশে গঠিত কোনো সমিতি বা সংঘের ‘সংগঠনের স্বাধীনতা’ থাকবে না। ফলে সংবিধান অনুযায়ীই নিষিদ্ধ হতে পারে জামায়াত।

এ ব্যাপারে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, বিদ্যমান আইনেই জামায়াতসহ অভিযুক্ত দল, সংগঠনের বিচার এবং শাস্তি দেয়া সম্ভব। বিদ্যমান আইনে সংগঠন হিসেবে বিচারের শাস্তির বিধান না থাকলেও ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা তা নির্ধারণ করতে পারেন। আমাদের বিদ্যমান ফৌজদারি আইনে শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিধান নেই। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের বিচাররকরা মানবতাবিরোধী অপরাধে একাধিক ব্যক্তিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের ১০ বছর হয়ে গেল এখনো জামায়াত, আলবদরের বিচার হয়নি। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনের বিচার হয়েছে। আমরা কেন জামায়াত, আলবদরের বিচারে দেরি করছি এটা বুঝতে পারছি না। সংগঠন হিসেবে জামায়াত, আলবদর, রাজাকারবাহিনীর বিচার না হলে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কারণ শহীদ পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞেস করলে উত্তর একটাই- রাজাকার, আলবদর, আলশামসবাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে গেছে। এখানে বাহিনী হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তির বিচার শেষপর্যায়ে। এখন দ্রুত দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল চালু করে ন্যায়বিচারের স্বার্থেই জামায়াতসহ সংগঠনগুলোর বিচার করা প্রয়োজন।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

মন্তব্য