‘হাইব্রিড’ ‘কাউয়া লীগ’ এবং ‘অনুপ্রবেশকারী মুক্ত হতে পারবে আ’লীগ?

গাজী মুনির

গত কয়েক বছরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ‘হাইব্রিড’ ‘কাউয়া লীগ’ এবং ‘অনুপ্রবেশকারী। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের উন্নয়নে মূল বাধা এসব হাইব্রিড। কেন্দ্র্র থেকে তৃণমূলে বিভক্তির কারণ এরাই। এদের কারণে নিজ ঘরের আগুনে পুড়ছে নৌকা। তৃণমূলে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় পর্যায়ে যেন সবাই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নব্য আওয়ামী লীগারদের কাছে কোণঠাসা ত্যাগী এবং দুর্দিনের কাণ্ডারিরা। দলে অনুপ্রবেশকারীদের এই হিড়িক এখনো অব্যাহত।

আওয়ামী লীগের টানা ১১ বছরের ক্ষমতায় থাকাকালে যে হারে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সুবিধাভোগী শ্রেণি হিসেবে দিনে দিনে আওয়ামী লীগার হয়ে গেছে, এমনটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেওয়া ‘বাকশাল’ গঠনের সময়ও দেখা যায়নি। এত আওয়ামী লীগার হয়নি বঙ্গবন্ধুর শত অনুরোধেও। অথচ আজ হাইব্রিড, কাউয়া, অনুপ্রবেশকারী বলার পরও নষ্টরা ক্ষমতার লোভে ছ্যাঁচড়ার মতো পড়ে থাকছে দলে! আজ আওয়ামী লীগের দিকে তাকালে মনে হয়, এ দেশে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত, মুসলিম লীগার বা পাকিস্তানের দোসর রাজাকাররা তাদের কোনো সন্তান-সন্ততি রেখে যায়নি। দেশে কোন কালে এদের কোন অস্তিত্ব ছিল না!

এদের কবল থেকে নৌকাকে মুক্ত করতে না পারলে ম্লান হয়ে যাবে সব উন্নয়ন-অগ্রগতি। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রানান্তকর চেষ্টা চালিয়েও কিছু অসৎ নেতার কারণে সফল হতে পারছেন না। শেখ হাসিনার নির্দেশে একদিকে সরকারের শুদ্ধি অভিযান শুরু, অন্যদিকে এখনো তৃণমূলে অনুপ্রবেশকারীর দৌরাত্ম্য। স্থানীয় সাংসদ বনাম সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কোন্দল থেকে বের হতে পারছে না নৌকা। কাজে আসছে না কেন্দ্র্রের হুঁশিয়ারি। তবে এবার এদের জন্য রয়েছে সুনামী বার্তা। কোনো কমিটিতে দায়িত্ব পাবেন না নৌকার সুনামবিনষ্টকারী, তৃণমূলে কোন্দল সৃষ্টিকারী ও হাইব্রিডরা। তৃণমূলে দলীয়প্রধানের এমন কড়া বার্তা পৌঁছে গেছে। কোনো কমিটিতে এদের ঠাঁই হবে না। এখন দেখা যাক ফলাফল কী দাঁড়ায়।

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব পুরনো। অবিভক্ত ঢাকা মহানগর কমিটি থাকা অবস্থাতেও সভাপতি ও সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ এবং সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। দুই পক্ষের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষও হয়েছে। মহানগর কমিটি উত্তর ও দক্ষিণে ভাগ করার পরও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। এবার নতুন নেতৃত্ব এসেছে ঢাকা মহানগরের দুই কমিটিতেই। তবে স্বার্থান্বেষীরা এখনো সক্রিয়। এর নেপথ্যে রয়েছে নগরের ফুটপাত, চাঁদাবাজি, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের দরপত্র নিয়ন্ত্রণসহ আধিপত্য বিস্তারের লড়াই।

রাজধানীর অদূরে নারায়ণগঞ্জ সিটির মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সাংসদ শামীম ওসমানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তীব্র কোন্দল চলছে ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ে। এখানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক সাংসদ এমএ মালেককে সস্ত্রীক অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বর্তমান সাংসদ বেনজির আহমদ গ্রুপ তাকে বাদ দিয়েই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলন করছে। আগামী ৬ ডিসেম্বর ধামরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগে কোন্দল সবচেয়ে বেশি। জেলা সভাপতি ও রাজশাহী-১ আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের দ্বন্দ্ব ব্যাপকভাবে প্রকাশ্য। বিএনপি থেকে আসা ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে জেলা কমিটির সভা হচ্ছে না অন্তত তিন বছর হলো। বিএনপি-জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগে ভিড়ে বড় বড় পদ দখলে নেয়াসহ এমপি, পৌর মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়েছেন অনেকে। বিতর্কিত এসব নেতার কারণে জেলার তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অনেকটাই কোণঠাসা। ফলে অন্তঃকোন্দল চরমে।

এদিকে যশোরের চৌগাছা আওয়ামী লীগে এখন জামায়াতই সব। দ্বন্দ্ব রয়েছে হুইপ ইকবালুর রহিম ও নৌ-প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর এলাকা দিনাজপুরেও। এ ছাড়া দিনাজপুরের স্থানীয় এমপিদের জন্য ডিসি-এসপিদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। পঞ্চগড়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন এবং স্থানীয় এমপির মধ্যে কোন্দলও দৃশ্যমান।

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের গৃহবিবাদও অনেক পুরনো। উত্তর ও দক্ষিণ মহানগর আওয়ামী লীগ ছাড়াও সহযোগী সংগঠনেও কোন্দল চরমে। সংঘাত-সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে কেন্দ্র্রের নানান উদ্যোগ। দলের কেন্দ্র্রীয় সম্মেলনে আগে এই তিনটি সাংগঠনিক জেলার সম্মেলন করার নির্দেশনা থাকলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে স্থগিত করা হয়েছে মহানগর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্বন্দ্বের নেপথ্যে রয়েছে ক্ষমতার দাপট আর আধিপত্য বিস্তার। মহানগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক, সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার ছেলে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর সঙ্গে মেয়র নাছিরের দৃশ্যমান কোনো বিরোধ না থাকলেও অনুসারীদের মধ্যে অদৃশ্য দ্বন্দ্ব রয়েছে। এদিকে মেয়র নাছির উদ্দিনের প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে রয়েছেন নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম। অন্যদিকে নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ডা. আফসারুল আমিন এমপি ও মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি অনেকটা একলা চলো নীতিতে। এদিকে সীতাকুন্ড, মিরসরাই, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, সন্দ্বীপ ও ফটিকছড়ি ৭টি উপজেলার সবকটিতেই কোন্দল দৃশ্যমান।

কোন্দলে বেহাল বরিশাল আওয়ামী লীগও। আগামী ৮ ডিসেম্বর বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনকে ঘিরে বেশ কয়েকটি উপজেলায় প্রভাব বিস্তার, অর্থ ছড়ানো, পকেট কমিটি করা, তৃণমূল কর্মীদের ভয়-ভীতির অভিযোগ উঠেছে। বাবুগঞ্জে সর্বহারা আতঙ্কে সম্মেলন না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উজিরপুর ও বানারীপাড়ায় অর্থের বিনিময় পকেট কমিটি করার চেষ্টায় বিক্ষোভ করেছে নেতাকর্মীরা। হিজলায় প্রভাব বিস্তারের কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এসব ঘটনায় জেলা আওয়ামী লীগের কাছে অনুপ্রবেশকারী ঠেকানোর আহ্বান জানিয়েছেন নেতাকর্মীরা। স্থগিত করা হয়েছে উজিরপুর, বানারীপাড়া, বাবুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন।

কোন্দলে পিছিয়ে নেই সিলেট বিভাগ আওয়ামী লীগ। প্রতিটি জেলা-উপজেলাতেই মন্ত্রী-এমপি-সভাপতির দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে বিরাজমান। এ নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝরে ওবায়দুল কাদেরের কণ্ঠে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর সিলেটে এক জনসভায় তিনি বলেন, সিলেটের সবচেয়ে বড় সমস্যা সংগঠনে কলহ। এই কোন্দল মেটাতে না পারলে আমরা কোনো দিনও ফল পাব না। আপন ঘরে যার শত্রু, তার শত্রু তা করার জন্য বাইরের শত্রু দরকার নেই। সিলেটের অবস্থাও তেমন। তাই বিভক্তি ঝেড়ে ফেলে ঘরের মধ্যে ঘর করা, পকেট কমিটি করা- এসব থেকে বিরত থেকে দুঃসময়ের কর্মীদের কোণঠাসা না করে তাদের দলের বিভিন্ন পদে স্থান দিন। অবশ্য কাজে আসেনি এসব আহ্বান। সম্প্রতি (২৫ নভেম্বর) যুক্তরাজ্যে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হিরণ মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে সিলেট সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি করায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে। ফলে পরদিনই তা স্থগিত করা হয়।

নব্য আওয়ামী লীগাররা বিএনপি-জামায়াতের চেয়েও ভয়ঙ্কর মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘এরা সুযোগসন্ধানী। এখন দেশের সবাই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। যাদের কখনো আওয়ামী লীগের সভা-সমাবেশে দেখিনি তারাও এখন আওয়ামী লীগ করে। এদের থেকে সাবধান ও সতর্ক থাকতে হবে। আগামী কমিটিতে যেন তারা ঠাঁই না পায়, সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

এদিকে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র্রের প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর দেশে রাজনৈতিক সংঘাতে ৫২ জন নিহত হন। এর মধ্যে ৪০ জনই প্রাণ হারিয়েছেন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে। নব্য আওয়ামী লীগারদের নিয়ে এখন বিপাকে আছে দলটি। সুবিধাভোগীরা সবসময় সরকারি দলকে টার্গেট করে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ টানা ১১ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায়। ফলে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। তবে তৃণমূলের কোন্দল ঠেকাতে অনুপ্রবেশকারীদের লাগাম টেনে ধরা যেমন প্রয়োজন; তেমনি হাইব্রিডদের হাতে নৌকা তুলে দেয়া নেতাদেরও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো প্রয়োজন।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

মন্তব্য