পাকিস্তানপ্রেমী শাসকদের একুশ বছর বাংলাদেশের অন্ধকার সময়

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বিজয় অর্জনের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে পা রাখেন। সেখান থেকেই একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ার অভিপ্রায়ে কাজে নেমে পড়েন তিনি। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু পুরো পরিবারসহ নিহত হন। এরপর থেকেই বাঙালি জাতিকে নিয়ে শুরু হয় এক নতুন চক্রান্ত। শুরু হয় ইতিহাসকে ভিন্নভাবে লেখা।

তাঁর এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আমাদের বাঙালিত্ব, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং একটি শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের যাত্রার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ২১ বছর দেশ শাসন করেছেন পাকিস্তানপন্থীরা। পাকিস্তানপ্রেমীদের দেশ শাসনের ২১ বছর বাংলাদেশের অন্ধকার যুগ।

এ সময়ে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে ফের একটি পূর্ব পাকিস্তান কায়েম করা হয়। শুধু বাংলাদেশের নামটি পরিবর্তন করার সাহস দেখায়নি ষড়যন্ত্রকারীরা। বাংলাদেশ নামেই শুরু হয় পাকিস্তানি করণ কার্যক্রম, পাকিস্তানের ধ্যান-ধারণা, চিন্তাচেতনার যা কিছু ছিল, তার সবকিছুই আবার ফিরে আসে। এতে স্বাধীনতার চেতনা বাধাগ্রস্ত হয়। যে স্বপ্ন, চেতনা, ধ্যান-ধারণা নিয়ে মানুষ দেশ স্বাধীন করেছিল তার বিপরীতধর্মী একটি শক্তি বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসে। তারা ক্ষমতায় বসে প্রথমেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করে।

ইতিহাস বিকৃতির মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মকে বিপথগামী করা হয়েছিল। ৭৫ থেকে ৯৬ পর্যন্ত ২১ বছর এই বাংলাদেশে জাতির পিতার নাম নিষিদ্ধ ছিল। ৭ মার্চের ভাষণ বাজাতে দেওয়া হতো না। একটি জাতি যদি ক্রমাগত বিকৃত ইতিহাস শুনতে থাকে তাদের চরিত্র বিকৃতই হয়ে যায়। সেই বিকৃতি আমরা এখন সমাজে দেখি, যেখান থেকে জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসের উত্থান ঘটেছে। এই সময়ে জন্মগ্রহণ করা কোটি কোটি নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের এক পাল্লায় মেপে রাজাকারদের হালাল করার চক্রান্ত চলেছে।

বাংলাদেশে রাজনীতির পশ্চাৎযাত্রার চূড়ান্ত পর্ব শুরু হয় জিয়ার অবৈধ ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে। ৭ নভেম্বর কোনো সিপাহি-জনতার বিপ্লব ছিল না বা জাতীয় সংহতির কোনো বিষয়ও ছিল না। এদিন মূলত বাংলাদেশকে একটি মিনি পাকিস্তান বানানোর প্রকল্পে হাত লাগান জেনারেল জিয়া। তিনি খালেদ মোশাররফ, কর্নেল তাহের, কর্নেল হুদা ও মেজর হায়দারের মতো মুক্তিযোদ্ধাদেরও হত্যা করেন। জিয়া আমৃত্যু লক্ষপ্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে একটি মিনি পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তিনি জামায়াত-মুসলিম লীগের মতো সব ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে পুনরুজ্জীবনের সুযোগ করে দেন। তখন থেকেই বাংলাদেশে রাজনীতিতে ধর্মের অবাধ ব্যবহার শুরু হয়। একাত্তরের ঘাতক শিরোমণি গোলাম আযমকে পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে দেশে আসার অনুমতি দেন। যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন তাঁর আমলেই শুরু ও শেষ হয়। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিচার চীরতরে বন্ধ করতে তিনি সংবিধানে ইনডেমনিটি আইন অন্তর্ভুক্ত করেন। জিয়া নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে ও বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তান বানানো জন্য দুই হাজারেরও বেশি মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেন। ইতিহাসের বিচারে ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বর কয়েকটি কালো দিন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসের চাকা পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে এ দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে সব রকমের প্রতিক্রিয়াশীলতা সৃষ্টি হয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ‘জয় বাংলা’-এর পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ জিয়াউর রহমান চালু করেন। বাংলাদেশ বেতারের নাম পরিবর্তন করে পাকিস্তানের আদলে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ করা হয়। এভাবেই তারা স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিদের পুনর্বাসন এবং শীর্ষ পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শাহ আজিজসহ অন্য নেতৃত্বকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার কাজ করেন।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশের সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যত ধরনের পরিবর্তন আনা হয়, তাতে স্বাধীনতার চেতনা-ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বৈষম্যহীন সমাজের আবেদন বিনষ্ট করা হয়। শুধু তাই নয়, এখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের চেতনা পুনঃপ্রস্ফুটিত হতে থাকে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে জাতি শুধু রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে যায়নি বরং অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হওয়ার জন্য যে জাতীয় চেতনাবোধ অর্থাৎ একটি শক্তিশালী সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স্বপ্ন, তা নস্যাৎ হয়।

নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তানি ভাবধারার সামরিক স্বৈরশাসনের পতন হয়। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে উল্টো যাত্রা থেকে দেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। দেশ আবার স্বাধীনতার চেতনায় ফিরে আসে।

প্রথমে ১৯৯৬ ও পরে ২০০৯ সাল থেকে এ দেশের ইতিহাস সঠিক নেতৃত্বের পথে অগ্রসর হয়েছে। আজ ২০১৯ সালে এসে আমরা নিজেদের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাই, সারা বিশ্ব এখন বাংলাদেশের এগিয়ে চলা মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে। শুধু বড় বড় প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়া নয়, এ দেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা আজ উচ্চারিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। টেকসই উন্নয়নের জন্য ভবিষ্যৎ প্রসারী কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে, সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে; আর অগ্রগতির অংশীদারী করার জন্য সারা বিশ্বের সঙ্গে একত্রে কাজ করছে বর্তমান সরকার। সব মিলে বিজয়ের মাসে এ দেশের অর্জনগুলো তুলে ধরার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দিকেই তাকাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় এগিয়ে গেলে আমরা ২০৪১ সালের আগেই জাতির জনকের স্বপ্ন-সুখী, সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারব।

লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট

One thought on “পাকিস্তানপ্রেমী শাসকদের একুশ বছর বাংলাদেশের অন্ধকার সময়

মন্তব্য