বিশ্ব কাঁপানো ১০টি মাস্টারপিস সিনেমা, যেগুলো না দেখলেই নয়! (ভিডিও)

হলিউডের মারমার কাটকাট একশন, থ্রিলার, রোমান্টিক কিংবা বিশাল বাজেটের সিনেমার বাইরেও যে বিশাল এক সিনেমার জগৎ আছে সেটা আমরা কজন জানি? তবে এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, বিশ্বের সবচেয়ে মেধাবী আর প্রতিভাবান পরিচালক-অভিনেতা কিংবা টেকনিশিয়ানরা কাজ করেন হলিউডে, বিগ বাজেটের সিনেমাগুলোও এখানেই নির্মিত হয়। কিন্ত বাজেট বা ভালো অভিনয়- এগুলোই কি শুধু ভালো সিনেমার প্রধান শর্ত? চলুন, আজ হলিউডের বাইরে সারাবিশ্বের এমন দশটা মাস্টারপিস সিনেমার গল্প আপনাদের শোনাবো, যেগুলো দেখার পর আপনি নিজেই বলবেন, এতদিন কি বোকার স্বর্গেই না বাস করেছেন এই সিনেমাগুলো না দেখে। তো চলুন জেনে নেওয়া যাক__

১) সিটি অব গড

ফুটবলের জন্য বিখ্যাত ব্রাজিল যে এমন একটি মাস্টারপিস সিনেমা বানিয়ে ফেলতে পারে সেটা ‘সিটি অব গড’ না দেখলে বিশ্বাসই হবে না। এই সিনেমাটি ক্রাইম ড্রামা ঘরানার সিনেমার জগতে অঘোষিত ঈশ্বর। ব্রাজিলের পথঘাট থেকে শুরু করে বস্তি জীবন, কিংবা মাফিয়া আর গ্যাংস্টারদের উপস্থিতি কী নেই এই সিনেমাটিতে? সত্তর ও আশির দশকের ব্রাজিলের পটভূমিতে নির্মিত এই সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে অজস্র ভাষায় ডাবিং করা হয়েছে। ব্রাজিলের আনাচে-কানাচে শুধু মেধাবী ফুটবলার নয় মেধাবী নির্মাতা আর অভিনেতারাও যে ঘুরে বেড়ায় পৃথিবীকে সেই বার্তা দিয়েছিল ‘সিটি অব গড’ কে। এমনকি সর্বকালের সেরা ১০টি সিনেমার লিস্টেও অলটাইম থাকবে সিনেমাটি।

২) ট্রেন টু বুসান

দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমা ‘ট্রেন টু বুসান’। ট্রেন ভর্তি একদল মানুষ, সবার গন্তব্য বুসান শহর। একেক জনের একেক উদ্দেশ্য, বাচ্চা একটা মেয়ে বাবার সঙ্গে যাচ্ছে তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। গর্ভবতী একজন মহিলা তার স্বামীর সঙ্গে ভ্রমণ করছেন, হাইস্কুলের একটা বেসবল টিমও আছে ট্রেনে, আছে ঘরহারা একজন আধা পাগলা মানুষ। সেই ট্রেনের হল জোম্বি অ্যাটাক, যাকের কামড় দিচ্ছে সেই পরিণত হচ্ছে জম্বিতে। জীবন বাঁচাতে হলে পৌঁছাতে হবে বুসানে, কিন্তু সেই পর্যন্ত কি যেতে পারবে ট্রেনের আরোহীরা? নাকি তার আগেই সবাই খতম হয়ে যাবে? এমন চমৎকার একটা গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘ট্রেন টু বুসান’ নামের সিনেমাটি। এককথায় বলতে গেলে মাস্টারপিস। থ্রিলার সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে হলিউড যে কোরিয়ানদের কাছে শিশু সেটাই যেন প্রমাণ করে দিয়েছে সিনেমাটি। অসাধারণ নির্মাণ শৈলী, দুর্দান্ত অ্যাকশন আর থ্রিলারের সাসপেন্স মিলে অনন্য এক সিনেমা হয়ে উঠেছে ‘ট্রেন টু বুসান’।

৩) হিটম্যান

অ্যাকশন সিনেমার ভক্ত হলে হিটম্যনের নাম শোনার কথা। চীনা এই ভদ্রলোক ছিলেন বিখ্যাত সুপারস্টার ব্রুসলির গুরু। লিকে মার্শাল আর্ট শিখিয়েছিলেন তিনি। সেই হিটম্যানের জীবনের গল্প নিয়েই নির্মিত হয়েছে সিনেমা। দারুণ সাড়া জাগানোয় নির্মিত হয়েছে হিটম্যানের একে একে বেশ কয়েকটি সিকুয়েল। শুধু অ্যাকশন সিনেমা ভাবলে ভুল করবেন, হিটম্যান আসলে একটা অন্যরকম জীবন সংগ্রামের গল্প। তুখোড় অ্যাকশন আর চাইনিজ মার্শাল আর্টের পাশাপাশি বিশ্বযুদ্ধের পাকে পড়ে সবকিছু হারিয়ে ফেলা একটা মানুষ কিভাবে ঘুরে দাঁড়ায় সে গল্প বলা হয়েছে হিটম্যান সিনেমায়। সমালোচকরা দারুণ প্রশংসা করেছেন সিনেমাটির। চীনের নিয়ন্ত্রণে থেকেও হংকংয়ের সিনেমা যে কতদূর এগিয়ে গেছে সেটা বোঝার জন্য এক হিটম্যানই যতেষ্ট।

৪) দ্য রেইড

এবার বলবো একটি ইন্দোনেশিয়ান একশন থ্রিলার ছবির কথা। সন্ত্রাসী ্রআর মাফিয়াদের ডেরায় হানা দিয়ে বেড়ানো সোয়াটের একটা দল আচমকাই একজন মাফিয়া ডনের আস্তায় গিয়ে ফাঁদে পড়লো। সন্ত্রাসী আর মাফিয়াদের ডেরা থেকে প্রাণ নিয়ে ফেরার এক অসাধারণ গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। অনেকের কাছে মার্শাল আর্ট ও ফিজিক্যাল ভায়োলেন্স নিয়ে এ যাবৎকালের নির্মিত সেরা সিনেমা হচ্ছে ‘দ্য রেইড’। সিনেমাটি মুক্তির পর এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে হলিউডের বিখ্যাত সনিপিকচারস নেটওয়ার্ক চড়া দামে সিনেমাটির শর্ত কিনে নিয়েছিল। পরের কিস্তিটার প্রযোজনাও করেছিল তারা।

৫) দঙ্গল

ইন্দোনেশিয়া থেকে আবার ভারতে ফিরে যাওয়া যাক। বলিউডের সবচেয়ে বেশি আয় করা সিনেমার তালিকায় সবার ওপরে যে নামটা জ্বলজ্বল করছে সেটার নাম ‘দঙ্গল’। হরিয়ানার মহাবীর সিং ও তার দুই মেয়ে গিতা এবং ববিতার কুস্তিগীর হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে বানানো হয়েছে সিনেমাটি। বক্স অফিসে ঝড় তোলার পাশাপাশি সে বছরের বেশিরভাগ পুরস্কারও ঘরে তুলেছিল ‘দঙ্গল’। নারীর ক্ষমতায়ন, খেলার প্রতি ভালোবাসা আর দেশপ্রেমের মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল এই সিনেমায়। ‘দঙ্গল’ নিয়ে একটা মজার তথ্য জানাই আপনাদের, আমির খান কিন্তু এই সিনেমার জন্য এক পয়সাও পারিশ্রমিক নেননি।প্রযোজকের সাথে আমির খানের চুক্তি ছিল সিনেমা যদি লাভ করে সেখান থেকে একটা অংশ তিনি পাবেন। ‘দঙ্গল’ এত বেশি লাভ করেছে যে শেষমেষ শুধু এই সিনেমায় অভিনয় করেই আমির খানের পকেটে ঢুকেছে ১৫০ কোটি রুপি।

৬) এলিট স্কোয়াড

ক্রাইম থ্রিলারের ভক্ত হয়ে থাকলে ‘এলিট স্কোয়াড’ সিরিজের সিনেমাগুলো দেখা যে কারো জন্যই ফরয। বিশেষ করে ‘এলিট স্কোয়াড: দ্য এনিমি উইথ ইন’ সিনেমাটা তো দেখতেই হবে। তবে প্রথম সিনেমা এলিট স্কোয়াড না দেখলে গল্প বা চরিত্র বুঝতে একটু অসুবিধা হতে পারে। ব্রাজিলিয়ান এই সিনেমার গল্প এগিয়েছে রিও ডি জেনিরো শহরে। সন্ত্রাস দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশেষ পুলিশ বাহিনীর কি অসাধারণ মিশন। তবে সিনেমাটা দেখার পর অনেকক্ষণ মাথা ঘোরাতে পারে আপনার, অবাক হয়ে ভাববেন কি দেখলাম এতক্ষণ! দুই ঘন্টা সময় খরচ করে সিনেমাটা দেখলে সময়টা নষ্ট হবে না, টানটান উত্তেজনার সাথে রয়েছে খুব শক্তিশালী গল্প। ব্রাজিলের শুধু নেইমার-রোনালদোদের চিনলে তো হবে না তাদের সিনেমাটাও দেখতে হবে।

৭) অং ব্যাক: দ্য থাই ওয়ারিয়র

আবারও মার্শাল আর্ট সিনেমা। তবে চীন, হংকং কিংবা ইন্দোনেশিয়া নয় এবার যেতে হবে থাইল্যান্ড। ছোট্ট একটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যে এত দুর্দান্ত অ্যাকশন মুভি তৈরি করতে পারে ‘অং ব্যাক: দ্য থাই ওয়ারিয়র’ সিনেমাটি না দেখলে সেটা বিশ্বাসই হবে না। গ্রামের এক বুদ্ধমূর্তির মাথাটা চুরি করে নিয়ে গেছে কেউ, সে চোরকে ধরতেই তিং নামের এক তরুণের আগমন ঘটে ব্যাংককে। মূর্তির মাথা উদ্ধার করতে গিয়ে ব্যাংককের মাফিয়া আর আন্ডারগ্রাউন্ডে সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে সে। সেটা নিয়েই এগিয়েছে সিনেমার গল্প। মার্শাল আর্টের দুর্দান্ত প্রদর্শনী বসেছে এই সিনেমায়, সেই সঙ্গে দারুণ অভিনয় ও দুর্দান্ত পরিচালনা সব মিলিয়ে ভিষন এন্টারটেইনিং একটা প্যাকেজে পরিণত হয়েছে ‘অং ব্যাক: দ্য থাই ওয়ারিয়র’ এবং এই সিরিজের বাকি মুভিগুলো। মজার ব্যাপার হলো শুধুমাত্র ‘অং ব্যাক: দ্য থাই ওয়ারিয়র’ সিনেমায় অভিনয় করেই এই সিনেমআর নায়ক এখন হলিউডের নিয়মিত অভিনেতা।

৮) থার্টিন অ্যাসাসিনস

এবার বলবো একটি জাপানি সিনেমার কথা। সিনেমার নাম ‘থার্টিন অ্যাসাসিনস’। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন ভরপুর একশন থাকছে এই ছবিতে।সেই সঙ্গে থাকছে জীবন্ত ইতিহাস। দেড়শ বছর আগের সত্যি একটা ঘটনা নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। ১৩ জন গুপ্তঘাতকের নীতির জন্য লড়াই স্বয়ং দেশের প্রধান রাজার বিরুদ্ধে। এই সিনেমাটিতে যে রণকৌশল দেখানো হয়েছে তা খুব স্বাভাবিকভাবেই আপনাকে মুগ্ধ করবে। জাপানিজ সামুরাইদের ইতিহাসের অন্যতম প্রতিচ্ছবি এই সিনেমাটি। সাধারণ সিনেমাপ্রেমী হলেও এই সিনেমাটি মিস করবেন না। কি বিশাল ক্যানভাসে নির্মিত জাপানি এই সিনেমাটি তা চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হতে চাইবেনা আপনার। প্রতিটা মুহূর্ত টানটান উত্তেজনায় আপনাকে বেঁধে রাখবে এই সিনেমাটি। হিস্টোরিক্যাল অ্যাকশন ফিল্ম যাদের পছন্দ তাদের জন্য মাস্ট ওয়াচ সিনেমা ‘থার্টিন অ্যাসাসিনস’।

৯) বাহুবলী

এবার এক ভারতীয় সিনেমার গল্প। ভারতীয় মানেই কিন্তু বলিউডের নয়, বাহুবলী হচ্ছে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা। একটা আঞ্চলিক সিনেমা হয়েও পুরো ভারত কাঁপিয়েছে বাহুবলীর দুটি খন্ড। বাহুবলী-২ তো পুরো ভারতীয় ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আয় করা সিনেমার হয়ে গেছে। বিগ বাজেট, বড়সড় স্টার কাস্ট আর কোটি কোটি রুপি খরচ করে দারুন সব লোকেশনে চমৎকার সেট বানিয়ে শুটিং করা হয়েছে বাহুবলী সিনেমার। বাহুবলী সিরিজ ভারতীয় সিনেমার অন্যরকম একটা স্ট্যান্ডার্ড সেট করে দিয়েছে। যে সব ভিএফএক্সের কাজ বাহুবলীতে দেখানো হয়েছে সেগুলো মূলত হলিউডে দেখা যায়। বলিউডের জন্য লোকে একটা সময় ভারতীয় সিনেমাকে চিনতো, এখন বাহুবলীর কারণে সেই জায়গাটা দখল করেছে দক্ষিণী সিনেমা। বাহুবলি সম্পর্কে এমন একটা বিশেষ তথ্য জেনে রাখুন যেটা আগে কেউ বলেনি। র‍্যয়াল আলবর্ট সিনেমা হল ১৮৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় লন্ডনে, এত বছর কখনই তারা ইংরেজি সিনেমা বাদে আর কোন সিনেমা দেখায় নাই। ১৪৮ বছরে প্রথম তারা একটা অন্য ভাষার সিনেমা চালিয়েছে আর তার নাম বাহুবলী।

১০) প্যারাসাইট

কিছু সিনেমা থাকে যেগুলো না দেখলে জীবনটাই বৃথা বলে মনে হয়। দক্ষিণ কোরিয়ান সিনেমা ‘প্যারাসাইট’ এমনই একটা সিনেমা। চলতি বছরেই মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি ইতিমধ্যে তুমুল হৈচৈ ফেলে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ধনাঢ্য এক পরিবারের ভেতরে দরিদ্র একটি পরিবারের বিলীন হয়ে যাওয়ার অদ্ভুত এক গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘প্যারাসাইট’ সিনেমাটি। শেষ পর্যন্ত দেখার পর দর্শক অবাক হয়ে ভাবতে বাধ্য হবেন কি দেখলাম? কেন দেখলাম? এ বছর অস্কারেও বাজিমাত করতে পারে সিনেমাটি এমন গুঞ্জণ শোনা যাচ্ছে। কোরিয়ান সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা যদি থেকে থাকে তাহলে ‘প্যারাসাইট’ আপনার জন্য মাস্ট ওয়াচ সিনেমা। আর অভ্যাস না থাকলেও ‘প্যারাসাইট’ দিয়ে শুরু করে দিন অভিযান। সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে কোরিয়ানরা যে হলিউডকেও টেক্কা দেয়ার সামর্থ্য রাখে সেটা ‘প্যারাসাইট’ দেখলেই পরিষ্কার বুঝতে পারবেন।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

মন্তব্য