কাশ্মীরে সোচ্চার হলেও উইঘুরে নিশ্চুপ ইমরান

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন

চীনে কয়েক লাখ উইঘুর মুসলিমকে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রেখে ‘মগজ ধোলাই’ করা হচ্ছে এমন কিছু দলিলপত্র সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে। এসব বন্দিশিবিরে ১০ লাখের অধিক উইঘুর মুসলিমকে বছরের পর বছর বিনাবিচারে আটক রাখা হয়েছে। ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে উইঘুর মুসলিমদের বিশ্বাস, ভাষা এবং নিজস্ব জীবনযাত্রা পুরোপুরি বদলে ফেলার এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া সেখানে চলছে। উইঘুর মুসলিমদের স্বাতন্ত্র্য ও ঐতিহ্য মুছে ফেলার স্পষ্ট নির্দেশনা এতে রয়েছে। এই দলিলপত্র ফাঁস হওয়ার পর সারা বিশ্বজুড়ে চীনের উইঘুর নির্যানতের বিষয়ে নিন্দার ঝড় উঠলেও আশ্চর্যজনকভাবে বরাবরের মতো মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র পাকিস্তান। বিষয়টা এমন যেন উইঘুর নির্যাতন সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না।

কাশ্মীরের মুসলিমদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তান যতটা সরব ঠিক ততটাই নিরব উইঘুরদের সম্পর্কে। কাশ্মীরে মুসলমানদের নির্যাতনের বিষয়ে প্রায় সব আন্তর্জাতিক ফোরামে সোচ্চার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। কিন্তু চীনে জাতিগত নির্যাতনের শিকার ১০ লাখ উইঘুর মুসলমানের বিষয়ে ইমরান খান বরাবরই চুপ।

এভাবেই উইঘুর নারীদের জোরপূর্বক ধরে নিয়ে বন্ধ্যা করে দেওয়া হচ্ছে

গত ২৭ সেপ্টেম্বর মুসলিমদের নিয়ে পাকিস্তানের এমন ‘দ্বিমুখী-নীতি’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালিস ওয়েলস বলেন যে, পাকিস্তান যেভাবে কাশ্মীরের মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব সেভাবে চীনের মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে নয় কেন? আমি মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অবস্থানে ভারসাম্য দেখতে চাই। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ইমরান খান কাশ্মীর সমস্যাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে। অথচ উইঘুর সমস্যা পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন।

জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তার ভাষণে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের তীব্র নিন্দা করেছেন এবং এ অঞ্চলে মুসলিমদের ওপর ভারতের চলমান নির্যাতনের বিষয়টি তোলেন। ইমরান খান সবসময় নিজেকে ‘কাশ্মীরের দূত’ বলেও দাবি করে থাকেন। কিন্তু চীনের মুসলিমদের বিষয়টি এলেই পাকিস্তান সবসময় নীরব থেকেছে এবং এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে বলা হলে ইমরান খান – ‘আমাদের নিজের দেশেই অনেক সমস্যা আছে’ বলে এড়িয়ে গিয়েছেন।

উইঘুর নারী ও শিশুদের ওপর চীনা বাহিনীর নির্যাতনের চিত্র

গত ১৪ অগাস্ট ইমরান খান কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে কাশ্মীরীদের অসহনীয় অবস্থা এবং ভারতের ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকার বিজেপির ‘বর্ণবাদী’ ও ‘উগ্রবাদী’ আচরণ তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, যদি তিনি শি জিনপিংয়ের সাথে আলোচনার সুযোগ পান তাহলে উইঘুর মুসলিমদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরবেন কিনা? ইমরান খান তখন মন্তব্য করেন, তিনি এ সমস্যাটি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না এবং চীনকে পাকিস্তানের ‘মিত্র’ বলেও সম্বোধন করেন। এটা মুসলিমদের নিয়ে পাকিস্তানের স্পষ্টতই দ্বিচারিতা।

জিনজিয়াং এর মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে নিপীড়ন চালাচ্ছে চীন সে বিষয়ে পাকিস্তান নীরব কেন? এর প্রধান কারণ হলো, চীন বড় অংকের ঋণ দিচ্ছে পাকিস্তানকে। পাকিস্তানকে ৬০০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার কথা শোনা যায়। একই সঙ্গে দেশটি চীনা-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রজেক্ট অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ছয় হাজার কোটি ডলারেরও বেশি ঋণ দিয়েছে। এছাড়া পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো মূল্যে চীনকে পাশে রাখতে ইচ্ছুক। উন্নত প্রযুক্তির বিপুল সমর রসদ কিনছে তারা চীন থেকে। সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ০৫৪এপি টাইপ চারটি যুদ্ধজাহাজ ও ৪৮টি ড্রোন। এ ছাড়া হয়েছে যৌথভাবে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান তৈরির চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস সিস্টেমের বিকল্প হিসেবে চীন যে স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম গড়ে তুলেছে, পাকিস্তান ইতিমধ্যে তার অংশীদার হয়েছে। চীনের অস্ত্র ব্যবসায়ের প্রায় ৪০ ভাগ সরবরাহ এখন পাকিস্তানমুখী।

চীনের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নির্যাতিত একজন উইঘুর মুসলমান

সবচেয়ে উপাদেয় দিক হলো, সামরিক-বেসামরিক সব পণ্যে চীনের তরফ থেকে কোনো রাজনৈতিক শর্ত নেই। গ্রহীতা দেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও চীন মনোযোগী হতে চায় না।পাকিস্তানে ‘চীন বিপ্লব’কে জায়গা করে দিতে তাই দেশটির সামরিক কর্মকর্তা ও শাসক এলিটদের কোনো আপত্তি নেই।

আশা করা হচ্ছে, আগামী বছর নাগাদ দুদেশের পণ্য বাণিজ্যের আকার ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। অথচ ২০০৩-এ এটা ছিল মাত্র এক বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবের বাইরে রয়েছে উভয় দেশের অর্থনৈতিক করিডর। যেখানে বিনিয়োগ ইতিমধ্যে ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ৫০-৬০ বিলিয়ন ডলার পৌঁছাবে তা। এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সমগ্র অবকাঠামো এ মুহূর্তে চীনমুখী হয়ে পড়েছে।

একটি ডিটেনশন ক্যাম্পে উইঘুর মুসলিমদের কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে

চীনের বৈশ্বিক উচ্চাভিলাষের একেবারে কেন্দ্রে এখন পাকিস্তান। যেকোন অবস্থায় দেশটিকে পাশে রাখতে ইচ্ছুক তারা। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সামাল দিতে বিপদের বন্ধু হিসেবে সম্প্রতি এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে তারা। তবে সর্বশেষ এই ১ বিলিয়নসহ চীনের কাছে কেবল সর্বশেষ অর্থবছরেই পাকিস্তানের ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৫ বিলিয়ন ডলার। মোট ঋণের অঙ্ক আরও প্রায় চারগুণ বড়। এসব ঋণ পাকিস্তান কীভাবে শোধ করবে, এ নিয়ে দেশটিতে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। মোট কথা চীনা ঋণের ফাঁদে আটকে গেছে পাকিস্তানের মুসলিম ভ্রাতৃত্ব। চীনের বিরুদ্ধে কথা বলার কোন সুযোগই নেই পাকিস্তানের।

কারাগারের মতো উচু প্রাচীরে ঘেরা একটি ডিটেনশন ক্যাম্প

উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষে বললে তো চীন পাকিস্তানকে আর ভিক্ষা দেবে না। আর ভিক্ষা না পেলে পাকিস্তানের কি যে অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়।

উইঘুর প্রসঙ্গ আসলেই পাকিস্তানীদের ধর্ম ব্যবসার কালো মুখোশটা খুলে যায়, তখন আর তাদের মুসলমান পরিচয়টা সামনে আসে না। তবে কাশ্মীরের মুসলমানদের কথা আসলেই ভারত বিরোধীতার মুখরোচক খাদ্যটা আরো সুস্বাদু লাগে। উইঘুর, প্যালেস্টাইন বা ইয়েমেনের মুসলিম হত্যার সময় পাকিদের ধার্মপ্রেম বা মানব প্রেম জাগে না। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যাবহারই করছে পাকিস্তান। কাশীর যে মুসলিম কোন ইস্যু নয় ইমরান খানের উইঘুর নিয়ে নির্বিকার আচরনই তার প্রমান। এই ইমরান খানরা ইয়েমেন, ইরান, রোহিঙ্গা সহ অনেক ক্ষেত্রে নির্বিকার। যেখানে তাদের দেশীয় স্বার্থ জড়িত সেখানেই তারা ধর্মের মসলা যোগ করে উপাদেয় করে তোলে শুধু। তাই পাকিস্তান চীনের বিপক্ষে গিয়ে উইঘুর নির্যাতন নিয়ে কিছু বলবে না।

চীনের অর্থনীতির রমরমা অবস্থা এবং তাদের কাছ থেকে ঋণসহ নানান অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়ে পাকিস্তান উইঘুর নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না। আসল কথাটি হলো বলতে চায় না। এসব মানুষের কান্না তাদের কানে পৌঁছায় না। উইঘুর মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাই পাকিস্তান কোন কথা বলতে পারে না, কারণ তারা ‘বোবা’।

লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মন্তব্য