নির্যাতিত মুসলিম উইঘুরদের বিষয়ে চুপ ‘মুসলিম উম্মাহ’

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন

চীন সরকারের বিরুদ্ধে উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ বেশ পুরনো। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে এই নির্যাতনের মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিরীহ মুসলিমদের উপর নির্যাতনের নানা কালা কানূন প্রয়োগে উঠেপড়ে লেগেছে চীন সরকার। কঠোরভাবে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে উইঘুর নির্যাতনের কাহিনী বহিঃবিশ্বে প্রকাশের সুযোগ খুব কম, তবুও ফাঁক ফোকড় গলে যে খবর প্রকাশিত হয়ে পড়ে তাতেই আন্দাজ করা যায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা।

ফ্রিডম ওয়াচের মতে, চীন হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম ধর্মীয় নিপীড়ক দেশ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকায় এসব নিপীড়িত মুসলিম জনগোষ্টির গোঙানির শব্দ বিশ্ববাসী খুব একটা জানতে পারে না।

চীন সরকার বিপুল সংখ্যক উইঘুর মুসলিমকে বন্দী শিবিরে আটকে রেখেছে শুধু ধর্মীয় কারণে। ২০১৮ সালের আগস্টে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক একটি কমিটি জানতে পেরেছে ১০ লাখেরও বেশি উইঘুর মুসলিমকে পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশের কয়েকটি বন্দি শিবিরে আটকে রাখা হয়েছে। এসব ক্যাম্পে তাদের নতুন করে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। স্বায়ত্তশাসিত এলাকাটিকে মূলত বন্দী শিবিরে পরিণত করেছে। যদিও চীন সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, যেসব উইঘুরদের আত্মীয়-স্বজন ২৬টি তথাকথিত স্পর্শকাতর দেশে অবস্থান করছে তাঁদেরকে এসব ক্যাম্পে আটক রাখা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান, তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ আরও কিছু দেশ। এছাড়া যারা ম্যাসেজিং অ্যাপ উইচ্যাটের মাধ্যমে বিদেশের কারও সাথে যোগাযোগ করছে, কথা বলছে তাদের ধরে ক্যাম্পে আনা হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এসব ক্যাম্পে যাদের আটক রাখা হয়েছে তাদের জোর পূর্বক চীনা ম্যান্ডারিন ভাষা শেখানো হচ্ছে। তাদের নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা করতে অথবা ধর্ম ত্যাগ করতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। চাপ দেওয়া হচ্ছে নন হালাল খাবার খেতে। সরকারী ভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে যারা নন হালাল খাবার খায় না তারা দূমুখো শয়তান।

রমজান মাসে রোজা রাখা নিষিদ্ধ করেছে দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট সরকার। এছাড়া জিনজিয়াংয়ের মসজিদগুলোতে আজান, লম্বা দাড়ি রাখা, ইসলামি স্কার্ফ পরা ও তুর্কি ভাষা ব্যবহারেও সরকারের নিষেধাঝ্ঞা রয়েছে। সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিও অনুষ্ঠান না শুনলে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় উইঘুর মুসলিমদের। বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে উইঘুরদের তথ্য-উপাত্ত, ত্রিমাত্রিক পোর্টেইট, কণ্ঠ শনাক্ত, ডিএনএ ও আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে উইঘুরদের ওপর নজরদারি করছে কমিউনিস্ট সরকার। এছাড়া আরও অত্যাধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে রয়েছে জিনজিয়াংয়ে।

উইঘুর মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় চীন সরকার নগ্ন হস্তক্ষেপ করছে অভিযোগ করে অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, ২০০৯ সালের দাঙ্গার পর চীনা সরকারের সমালোচনা করে মতামত প্রকাশের দায়ে চীন সরকার গোপনে বেশ কয়েকজন উইঘুর মুসলিম বুদ্ধিজীবীর বিচার করেছে।

বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব শিবিরে বন্দীদের মান্দারিন ভাষা শিখতে বাধ্য করা হচ্ছে। উইঘুরে নিজশ্ব ভাষা শিক্ষার উপর জারী করা হয়েছে নিষেধায্ঞা। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রশংসার কথা বলা এবং তাদের সঠিক আচরণ পরিচালনার নিয়মগুলো কঠোরভাবে মনে রাখতে বাধ্য করা হয়। এ অভ্যাসগুলোর অংশ হিসেবে চীন সরকার জিনজিয়াংয়ের উইঘুর সংস্কৃতি ও জাতিগত সত্তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এই শিক্ষা শিবিরের পাশাপাশি উইঘুর শিশুদের জন্যও ক্যাম্প ও স্কুল রয়েছে, যেখানে মূলত তাদের পরিবার, ভাষা,ধর্ম ও সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। ২০১৮ সালে আগ পর্যন্ত উইঘুরেরা কখনই চায়নিজ নতুন বছর ইদযাপন করে নি । এবছর সেখানে ঘটা করে চায়নিজ নিউ ইয়ার পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে সরকারিভাবে। উইঘুরেও শিশুদেও শেখানো হচ্ছে ড্রাগন নৃত্য।জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি নিয়ে বিবিসির একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, কেবল একটি শহরেই ৪ শতাধিক শিশুর পিতা ও মাতা উভয়েই ওই শিবির অথবা কারাগারে বন্দি। এই শিশুদের রাষ্ট্রীয়ভাবে দেখভাল প্রয়োজন কিনা তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ণ চালানো হচ্ছে।

জিনজিয়াংয়ের প্রাপ্তবয়স্কদের পরিচয় বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানোর পাশাপাশি, বিভিন্ন প্রমাণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, শিশুদেরকে তাদের আদি সংস্কৃতি থেকে দূরে রাখার আরেকটি প্রয়াসও চালানো হচ্ছে। শিনজিয়াং-এ ভীষণ কঠোর নজরদারি চালায় চীন। বিদেশী সাংবাদিকদের সেখানে ২৪ ঘণ্টা নজরে রাখা হয়। ফলে সরাসরি সেখান থেকে কারও স্বাক্ষ্য গ্রহণ অসম্ভব। তবে তুরস্ক থেকে অনেকের স্বাক্ষ্য নেওয়া সম্ভব হয়েছে। ইস্তাম্বুলে একটি বড় হলে উপস্থিত হয়ে কয়েক ডজন মানুষ সারিবদ্ধ হন নিজেদের কষ্টের কথা জানাতে। এদের অনেকের হাতেই শিশুদের ছবি, যাদেরকে শিনজিয়াং-এ নিজ বাড়িতে আর পাওয়া যাচ্ছে না।

এক সন্তানের মা বলেন, ‘আমি জানি না এখন তাদের দেখভাল করে কে।’ তার হাতে নিজের ৩ কন্যার ছবি। তিনি বলেন, ‘তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই নেই।’ আরেক মায়ের হাতে ৩ ছেলে ও ১ মেয়ের ছবি। অশ্রু মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘আমি শুনেছি যে, তাদেরকে একটি এতিমখানায় নেওয়া হয়েছে।’ মোট ৬০টি পৃথক সাক্ষাৎকারে পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজন জিনজিয়াং-এ প্রায় ১০০ শিশুর অন্তর্ধানের মর্মন্তুদ বর্ণনা দিয়েছেন।

চীনা সরকার উইঘুর মুসলিমদেন নির্যাতনের ক্ষেত্রে তিনটা অভিযোগ করে থাকে-চরমপন্থা, সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। জোর পূর্বক শিক্ষা শিবিরে পাঠানো লাখো বিশিষ্ট উইঘুর ব্যক্তিত্ব গত কয়েক বছরে আটক বা নিখোঁজ হয়ে গেছেন। এদের মধ্যে আছেন ইসলামি শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ সালিহ হাজিম, অর্থনীতিবিদ ইলহাম তোকতি, নৃতাত্ত্বিক রাহাইল দাউদ, পপশিল্পী আব্দুর রহমান, ফুটবল খেলোযাড় এরফান হিজিম প্রমূখ।

মিয়ানমার সরকার যখন হাজার হাজার সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাকে হত্যা করে এবং সাত লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে, তখন মুসলিম বিশ্ব চুপ ছিল না। প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যখন তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করে তখনও তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছিল তারা। কিন্তু চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশে ইসলামকে দমন করার যে নারকীয় চেষ্টা সে বিষয়ে তারা সবসময়ই নীরব।

শুধু মুসলমান হওয়ার অপরাধে ১০ লাখেরও বেশি উইঘুর মুসলিমকে অবৈধভাবে জিনজিয়াংয়ের ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে’ আটকে রাখা হয়েছে। ‘কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে সমাজের মূল ধারায় নেয়ায় প্রক্রিয়া’র নামে সেখানে তাদের ওপর চালানো হচ্ছে নির্মম নির্যাতন। যা আধুনিক ইতিহাসে মুসলমানদের ওপর সবচেয়ে নির্লজ্জ সম্মুখ হামলা-নির্যাতন।

আর এই দমন-নিপীড়নের প্রতিবাদে বিশ্বের ৪৯টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ প্রায় কিছুই বলেনি। মালয়েশিয়া গত বছর এক ডজন উইঘুর শরণার্থীকে চীনে ফেরত পাঠাতে অস্বীকার করেছিল, কুয়েত পার্লামেন্টের চার সদস্য জানুয়ারিতে উইঘুরদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছিল এবং তুরস্ক গত মাসে চীনের নির্মম আচরণের নিন্দা জানিয়েছিল। ব্যস, এটুকুই। বাকি ৪৬টি দেশ বিষয়টি নিয়ে কিছুই বলেনি, বলা ভালো এড়িয়ে গেছে। একমাত্র আল-জাজিরা ছাড়া আরব মিডিয়াগুলোতে এমনকি ইরান, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় মুসলিম দেশগুলোতেও এ বিষয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করতে শোনা যায়নি। বিষয়টি অবাক করা মতো!

১০ জুলাই ২০১৯, উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনা নিপীড়নের নিন্দা জানিযে জাতিসংঘে চিঠি দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি ও জাপানসহ ২২টি দেশ। সবচেয়ে মজার ব্যপার হলো এই তালিকায় একটাও মুসলিম দেশ নেই। এসব দেশের রাষ্ট্রদূতেরা জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে পাঠানো লিখিত বার্তায় চীনের উইঘুর নীতির তীব্র সমালোচনা করেন।
উইঘুর আমেরিকান বাহরাম সিনতাশ; যার পিতা বর্তমানে জিনজিয়াংয়ে নিখোঁজ রয়েছেন তিনি একটি সংবাদপত্রে বলেন, “জিনজিয়াংয়ে এই মুহুর্তে ১,৪৪০ বছরের ইসলামিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মুসলিম নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। অথচ কোনও ইসলামী দেশই এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেনি।”

অথচ সৌদি আরব-পাকিস্তানের মতো দেশগুলো নির্লজ্জের মতো চীনের উইঘুর নীতিতে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। গত ১২ জুলাই ২০২৯, এএফপি প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- উইঘুরে মুসলমানদের বন্দিশিবিরে আটকে রেখে নির্যাতনের চীনা নীতিকে সমর্থন জানিয়ে জাতিসংঘে চিঠি পাঠিয়েছে সৌদি আরবসহ ৩৭টি দেশ। চিঠিতে জিনজিয়াং প্রদেশে চীন সরকারের ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনকে ‘চীনের অসামান্য অর্জন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

উইঘুর বন্দিশিবির বিষয়ে চীনকে সমর্থন জানানো চিঠিতে সৌদি আরবসহ অন্য স্বাক্ষরকারী দেশগুলো হলো- রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা, উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, পাকিস্তান, ওমান, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, বার্মা, ফিলিপাইন, কিউবা এবং বেলারুশ। তাছাড়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরাও চিঠিটিতে স্বাক্ষর করেছেন।

চিঠিতে বলা হয়, আমাদের জানামতে সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং ধর্মীয় চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলি জিনজিয়াংয়ের জাতিগত গোষ্ঠীগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় চীন জিনজিয়াংয়ে সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদবিরোধী নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো যেটিকে বন্দিশিবির বলছে ওই চিঠিতে এসব বন্দিশিবিরকে ‘বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ বলে অবহিত করা হয়েছে।
চিঠিতে দাবি করা হয়, চীন সরকারের এমন পদক্ষেপের ফলে জিনজিয়াংয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ফিরে এসেছে। সব নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।

মূলত; চীনের অর্থনীতির রমরমা অবস্থা এবং তাদের কাছ থেকে নানান সুবিধা পেয়ে অধিকাংশ মুসলিম দেশ উইঘুর মুসলিমদের নির্যাতনের বিষয়ে নিরব রয়েছে। তারা চীনের দমননীতির বিরুদ্ধে কোন কথা বলে না, এসব নির্যাতিত মুসলিমদের কান্না তাদের কর্ণকুহরে পৌঁছায় না।

লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মন্তব্য