উইঘুর মুসলিমদের ‘মগজ ধোলাই’ করছে চীন, গোপন নথি ফাঁস!

চীনে কয়েক লাখ উইঘুর মুসলিমকে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রেখে তাদের ‘মগজ ধোলাই’ করা হচ্ছে এমন কিছু দলিলপত্র সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশে এ ধরণের গোপন বন্দীশালার কথা চীন বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। চীনের দাবি এগুলো বন্দিশিবির নয়, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। সেখানে উইঘুর মুসলিমরা স্বেচ্ছায় কারিগরি প্রশিক্ষণ নিতে এসেছে।

তবে ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট (আইসিআইজে) যেসব গোপন দলিলপত্র হাতে পেয়েছে সেখানে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে কিভাবে উইঘুর মুসলিমদের ডিটেনশন ক্যাম্পে নির্যাতন করা হয়, মগজ ধোলাই করা হয় সেই চিত্র। জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিমরা দীর্ঘদিন ধরে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে জীবনযাপন করছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব বন্দিশিবিরে ১০ লাখের অধিক উইঘুর মুসলিমকে বিনাবিচারে আটক রাখা হয়েছে।

একটি ডিটেনশন ক্যাম্পে উইঘুর মুসলিমদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

ফাঁস হওয়া দলিলপত্র থেকে পরিষ্কার এসব শিবিরের ভেতরে আসলে কী ঘটছে। জিনজিয়াং কমিউনিস্ট পার্টির ডেপুটি সেক্রেটারি ঝু হাইলুন ২০১৭ সালে নয় পৃষ্ঠার এই সরকারি দলিল পাঠিয়েছিলেন – যারা এসব শিবির পরিচালনা করেন তাদের কাছে।

এসব নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে এই শিবিরগুলো অত্যন্ত সুরক্ষিত জেলখানার মতো চালাতে হবে, বজায় রাখতে হবে কঠোর শৃঙ্খলা এবং কেউ যাতে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে না পারে সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের এসব নির্দেশনার মধ্যে ছিল:

× কখনোই পালানোর সুযোগ দিও না।
× শৃঙ্খলা এবং শাস্তি বাড়াতে থাকো।
× কেউ আচরণবিধি ভঙ্গ করলে তাকে কঠোর শাস্তি দাও।
× স্বীকারোক্তি ও অনুতপ্ত হতে উৎসাহিত করো।
× ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দাও।
× পুরোপুরি বদলে যাওয়ার ব্যাপারে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করো।
× পুরো ভিডিও নজরদারি চালাও, কোন জায়গা যেন বাদ না থাকে।

এসব দলিলে দেখা গেছে শিবিরে বন্দী উইগারদের জীবনের ওপর কীভাবে নজর রাখা হচ্ছে ও কতোটা নিয়ন্ত্রণের ভেতরে তাদেরকে রাখা হয়েছে। যেমন: শিক্ষার্থীদের বিছানা কোথায় কীভাবে থাকবে, কে লাইনের কোথায় দাঁড়াবে, শ্রেণীকক্ষের কোথায় বসবে, কে কী শিখবে – সেগুলো সব নির্ধারিত থাকবে। এগুলো পরিবর্তন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

একটি ডিটেনশন ক্যাম্পের উচু প্রাচীর ঘেরা সিমানা

এসব নির্দেশনায় ঘুম থেকে ওঠা, রোল কল করা, কাপড় ধোওয়া, টয়লেটে যাওয়া, ঘর গুছিয়ে রাখা, খাওয়া দাওয়া, লেখাপড়া, ঘুমানো এমনকি দরজা বন্ধ করার বিষয়েও উল্লেখ করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একজন মুখপাত্র সোফি রিচার্ডসন বলছেন, এসব দলিল আসলে এমন একটি প্রমাণ যার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া যায়।

যেসব নিষ্ঠুরতার কথা আছে এই দলিলে, তা সাবেক বন্দীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে ভালো করেই জানেন। এরকম একজন ইয়ো জান। তাকে রাতের বেলায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এর পর তাকে এক বছর আটকে রাখা হয় বন্দি শিবিরে।

তিনি বলেন, ‘ওরা আমাকে উলঙ্গ করে পায়ে শেকল পরিয়ে দিল। খুবই ভীতিকর অভিজ্ঞতা। ওরা আমাদের মানুষ বলে গণ্য করতো না। সেখান থেকে জীবিত বেরিয়ে আসতে পারবো বলে ভাবিনি কখনো।’

ইয়ো জান তার যে অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন, সেটা বন্দি শিবিরে আটক আরও লাখ লাখ উইঘুর মুসলিমেরই কাহিনি।

চীনা সরকার বিদেশি সাংবাদিকদের অবশ্য এসব শিবির ঘুরিয়ে দেখিয়ে দাবি করেছে যে সন্ত্রাসবাদ দমনে সাহায্য করছে এসব শিবির। এখানে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা নতুন দক্ষতা অর্জন করছে। কিন্তু আইসিআইজের অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা বলছেন, এখন ফাঁস হওয়া দলিলপত্রে বোঝা যায়, এসব শিবিরের আসল উদ্দেশ্য আসলে কী।

ফাঁস হওয়া সরকারি গোপন নথির একটি

বিশ্ব উইঘুর কংগ্রেসের আইনি উপদেষ্টা বেন এমারসন বলেন, চীন এখন বিশ্বের এক বড় পরাশক্তি, কিন্তু তারা নিজের জনগণকে আটকে রাখছে, যতক্ষণ না তারা তাদের বিশ্বাস, ভাষা এবং নিজস্ব জীবনযাত্রা পুরোপুরি বদলে ফেলছে। এটাকে গণহারে মগজ ধোলাই ছাড়া অন্য কিছু ভাবা আসলেই কঠিন। একটি পুরো জাতিগোষ্ঠীকে টার্গেট করে এই কাজ চালানো হচ্ছে।’

নথিতে উইঘুর মুসলিমদের সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। এমনকি তারা যখন টয়লেটে থাকবে তখনও এ নজরদারি অব্যাহত রাখার কথা এতে বলা হয়। চীনের নৃত্বত্ত্ব বিশ্লেষক ও মেলবোর্নের লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেমস লেবোল্ড এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, দেশটিতে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি তাদের জোরপূর্বক ‘ব্রেইনওয়াশ’ করে থাকে। এ নথি দেশটির ক্ষমতাসীন দলের পূর্বনির্ধারিত, পীড়নমূলক এবং বিচার বহির্ভূত নির্দেশনা। উইঘুর মুসলিমদের স্বাতন্ত্র্য ও ঐতিহ্য মুছে ফেলার স্পষ্ট নির্দেশনা এতে রয়েছে।

২০১৪ সালে দেশটির এক রেলস্টেশনে উইঘুর মুসলিমদের হামলার পর থেকেই এ নির্যাতন শুরু হয়। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর ‘উগ্রপন্থী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতি’ আনুকূল্য না দেখানোর নির্দেশের ফলে আজকের উইঘুর মুসলিম নির্যাতন চরমে উঠেছে। তাদেরকে জোরপূর্বক মান্দারিন ভাষা শেখানো হচ্ছে।

নথিতে আরও বলা হয়, ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে মোবাইল ও ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নথিতে এসব ক্যাম্পগুলোকে ‘সবচেয়ে স্পর্শকাতর’ জায়গা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেখানকার এক কর্মচারী জানান, কেন্দ্রগুলোতে ‘ব্রেইনওয়াশের’ সময় সকল প্রকার নির্যাতন করা হয়ে থাকে উইঘুরদের প্রতি।

২০১৭ সালের জুনে ফাঁস হওয়া বুলেটিন থেকে জানা যায়, দেশটিতে ১৫ হাজার উইঘুর মুসলিমকে ‘ব্রেইনওয়াশের’ জন্য ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে পাঠানো হয়। এর মধ্যে দুই হাজার উইঘুরকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়।

তবে ফাঁস হওয়া এ নথির বিষয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অস্বীকার করেছেন। ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, এগুলো ষড়যন্ত্রকারীদের তৈরি করা ‘ভূয়া নথি।’ তিনি আরও বলেন, কথিত ‘নির্যাতন ক্যাম্পের’ বিষয়ে যা রটনা করা হচ্ছে তা ঠিক নয়। এ ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হলো সন্ত্রাস প্রতিরোধ করা।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

মন্তব্য