পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরেও জোরদার হচ্ছে স্বাধীনতার দাবী

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন

ভারত যখন চাঁদে মহাকাশচারী পাঠাবার কথা ভাবছে, প্রতিবেশী পাকিস্তান তখন ভাবছে, কীভাবে কাশ্মীরে আরও কয়েকটা আত্মঘাতী জঙ্গি পাঠানো যায়!‌ কাশ্মীর সমস্যাকে জিইয়ে রেখে কিভাবে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করা যায়। কাশ্মীরের স্বাধীনতা নয়; ধর্মের নামে কাশ্মীরিদের শোষণ করা, কাশ্মীরের ভূমি দখল করে রাখার নীতি জন্মলগ্ন থেকেই জারি রেখেছে পাকিস্তান।

কাশ্মীর সমস্যার কথা আমরা সবাই জানি, তবে আমাদের জানার মাঝে বড় ফাঁক রয়ে গেছে। আমরা মূলত কাশ্মীর সমস্যা বলতে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরকে বুঝে থাকি। অথচ কাশ্মীরের একটা বিশাল অংশ দখল করে রেখেছে পাকিস্তান। যুগের পর যুগ সেখানে চলছে সেনা নিপীড়ন, সে খবর আমরা কয়জনই বা রাখি। পাকিস্তানের দখলে থাকা আজাদ কাশ্মীরের জনগণের উপর পাক সেনারা যে বর্বর নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে, তাঁদের স্বাধীনতার দাবিকে বন্দুকের নলে দাবিয়ে রেখেছে, সে খবর বিশ্ববাসী খুব একটা জানে না। কারণ বেলুচিস্তানের মতোই পাক নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বিদেশি সাংবাদিক ও মিডিয়ার প্রবেশের কোন অনুমতি নেই। স্থানীয় সাংবাদিকদেরও সেনা নিয়ন্ত্রণে থেকে কাজ করতে হয়।

গত ৯ সেপ্টেম্বর স্বাধীনতার দাবিতে আজাদ কাশ্মীরে জম্মু-কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্টের বিক্ষোভ। এখান থেকে ৪০ বিক্ষোভকারীকের আটক করে পাকিস্তানি পুলিশ।

একটা তিক্ত সত্য মনে রাখা দরকার- গত ৫ আগস্ট ভারত সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করেছে এটা নিয়ে আমরা সোচ্চার, অথচ ভারত ৭০ বছর পরে যা করেছে, পাকিস্তান বহু আগেই তা করে রেখেছে। অর্থাৎ ভারত ৩৫ (ক) ও আর্টিকেল ৩৭০-এর বলে অন্তত এতদিন কাশ্মীরিদের তাদের বিধানসভা দিয়েছিল, নিজস্ব সংবিধানের সুযোগ দিয়েছিল, বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা দিয়েছিল; আজ না হয় তা কেড়ে নিয়ে বিরাট অন্যায় করেছে। কিন্তু পাকিস্তান তার নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরিদের তো কখনও কোন মর্যাদাই দেয়নি, সেটা কি আমরা জানি?

আজাদ কাশ্মীরের জনগণের নেতাও নেই, ক্ষমতাও নেই, স্কুলও নেই, হাসপাতালও নেই, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা, অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থানও নেই। এমনকি তারা পাকিস্তানিও নয়। স্রেফ লেজকাটা হনুমান- কাশ্মীরি! স্বাধীনতাকামীদের নিরাপদ ঘাঁটি বানিয়ে রাখার অজুহাতে এলাকাটাকে পাকিস্তান ঘুটঘুটে অন্ধকার বানিয়ে রেখেছে। সীমান্তে উত্তেজনা হলেই কাশ্মীরি জনসাধারণকে নিদারুণ উৎকণ্ঠা বুকে নিয়ে পালাতে হয়।

কাশ্মীরিরা নিজেদের ইন্ডিয়ান ভাবে না ঠিক- বিশ্ব মিডিয়াও তাদের বিভক্ত ভূখণ্ডকে পরিচয় করিয়ে দেয় ‘ভারত অধিকৃত কাশ্মীর’ ও ‘পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর’ বলে- কিন্তু তারা তো নিজেদের পাকিস্তানিও ভাবে না। তাহলে পাকিস্তান কাশ্মীরকে নিজের ভাবে কেন? মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে? সেটা হলে জিজ্ঞাসা রাখি, ‘৪৭ থেকে ’৭১ পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে যে আচরণ করেছে পাকিস্তান, বেলুচিস্তানে দশকের পর দশক ধরে যে অন্যায়-অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান, সেই চরিত্র বদলে কি ইদানিং সত্যিকার শুদ্ধ মুসলিম হয়ে গেছে সে?

গত সেপ্টেম্বর মাসে আজাদ কাশ্মীরের রাজধানী মুজাফফরবাদ থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে তাত্রিনোট গ্রামে জেকেএলএফ এর বিক্ষোভ। এই বিক্ষোভে ব্যাপক লাঠি চার্জ ও ২২ জন আটক করে পাকিস্তান পুলিশ।

পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের বাসিন্দাদের মধ্যে ক্রমেই স্বাধীনতার দাবি জোরালো হচ্ছে। আজাদ কাশ্মীরের জনগণের এবার সাফ কথা, কোন পক্ষের সঙ্গেই আর আলোচনা নয়, আমাদের স্বাধীনতা দিতে হবে। মূলত কাশ্মীরিদের চাওয়া স্বাধীন দেশ, তারা ভারত-পাকিস্তান কারও নিয়ন্ত্রণে থাকতে চায় না।

আজাদ কাশ্মীরের স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, কাশ্মীরের পাকিস্তান অংশে স্বাধীনতাকামীদের ওপর ব্যাপক দমনাভিযান চালানো হচ্ছে। যে খবর বিশ্ব মিডিয়ায় আসছে না। আজাদ কাশ্মীরে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নেই। তবে সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের একজন প্রতিনিধি সৌভাগ্যক্রমে আজাদ কাশ্মীরে প্রবেশের সুযোগ পান। সেখানে পাক বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিপরীতে স্থানীয় জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে বলে এই সাংবাদিক দেখতে পান। আজাদ কাশ্মীরের জনগণ পাক বাহিনীর অত্যাচার নিয়েও এখন মুখ খুলতে শুরু করেছে। কাশ্মীরিরা এখন নিজেদের কথা বলতে চায়। স্বাধীনতা চায়।

গত সেপ্টেম্বরে স্বাধীনতার দাবিতে আজাদ কাশ্মীরিদের র‍্যালি। এখান থেকেও কমপক্ষে ৪৪ জেকেএলএফ বিক্ষোকারীকে আটক করে পাকিস্তান পুলিশ। ছবি- আল জাজিরা

আজাদ কাশ্মীরের রাজধানী মুজাফরাবাদের প্রখ্যাত সাংবাদিক আব্দুল হামিদ কাশ্মীরি বলেন, ‘কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তান দুই দফা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। তবে সেখানে কাশ্মীরিদের মতামত দেয়ার কোন সুযোগ ছিল না। কাশ্মীরের জনগণ আসলে কি চায়-এই বিষয়টি বরাবরই উপেক্ষিত ছিল। আমরা পাকিস্তানী সেনা ও সেখানকার জনগণকে ভালবাসি। তবে এটাও মনে রাখা উচিত যে, কাশ্মীরের নিজস্বতা রয়েছে। এখানকার মানুষের সংস্কৃতি আলাদা। তাই এখন মানুষ যে কথাটি আসলে মুখ ফুটে বলতে পারছে না- তা হলো কাশ্মীরের স্বাধীনতা।’

আব্দুল হামিদ কাশ্মীরি আরও বলেন, আজাদ কাশ্মীরে আগে অল্প সংখ্যায় মানুষ স্বাধীনতার দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নিত। এখন সে সংখ্যা হাজার হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আজাদ কাশ্মীরে স্বাধীনতার দাবিতে বিক্ষোভগুলোতে -‘আমরা পুরো কাশ্মীরের স্বাধীনতা চাই, বিদেশী দখলদাররা আমাদের ভূমি ত্যাগ কর’ বলে স্লোগান উঠছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর আজাদ কাশ্মীরে স্বাধীনতার দাবির আন্দোলন থেকে অন্তত ৪০ বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। আন্দোলনকারীরা জম্মু ও কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট (জেকেএলএফ) এর সদস্য। সংগঠনটি ভারত ও পাকিস্তানের উভয় কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে কাজ করে।

পাকিস্তান কি কাশ্মীরিদেরকে ভালোবাসে? প্রজারা হয়তো বাসে, রাজারা নয়। প্রজারা যে বাসে, তাও কি এই কারণে নয় যে, তারা মুসলিম? কাশ্মীরের হিন্দু-বৌদ্ধদেরও কি তারা একইরকমভাবে পাশে চায়, যেভাবে ভূখণ্ডসহ মুসলিমদের চায়? পাকিস্তানি রাজনীতিকদের ভালোবাসার বেশিরভাগই তো মেকি। তাদেরও আসল চাওয়া ভূস্বর্গ- মানুষ নয়।

গত ৫ অক্টোবরে কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে আজাদ কাশ্মীর থেকে সীমান্তের অভিমূখে রোড মার্চ। এটাতেও বাঁধা দেয় পুলিশ। পুলিশের বাঁধায় পণ্ড হয়ে যায় রোড মার্চ।

পাকিস্তানের শাসকেরা জানে, কাশ্মীরের জনগণ পাকিস্তানের সমর্থন প্রবলভাবে কামনা করে। রাষ্ট্র চোরাপথে সেখানে সেনা কিংবা বিদ্রোহী পাঠায়। কেননা, ভারতকে হারাতে সে-ও উদগ্রীব; এই সুযোগ সে হেলায় হারাতে চায় না। কাশ্মীরিদের নিখাঁদ মুক্তির জন্য ততটা দায় পাকিস্তানের নেই। যদি থেকেই থাকে, তাহলে কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার দাবি কি পাকিস্তান মেনে নেবে? অর্থাৎ আজাদ কাশ্মীর, যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং পুরো কাশ্মীর প্রদেশের ৩৭ ভাগ, তা কি তারা ছেড়ে দেবে? কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটা খুব বেশি জরুরি। হয়তো এই প্রশ্নের মাঝেই লুকিয়ে আছে কাশ্মীরিদের স্বাধীনতার ‘প্রাণ ভোমরা’।

লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মন্তব্য