কী ঘটেছিল মহাকাশে যাওয়া সেই কুকুরের ভাগ্যে?

আমরা সবাই জানি পৃথিবী থেকে সর্বপ্রথম মহাকাশ অভিযানে যাওয়া প্রাণীর নাম লাইকা, আর এটি ছিল একটি কুকুর। ১৯৫০ সালের আগে কোনো মানুষকে মহাকাশ অভিযানে পাঠানো চ্যালেঞ্জিং ছিল বিজ্ঞানীদের জন্য। তাই বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে ইদুর, বানর, শিম্পাঞ্জি সহ আরও অনেক প্রানীকে মহাকাশে পাঠিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্পেস মিশনে মানুষ পাঠানো সম্ভব কিনা পরীক্ষা করা; কিন্তু মহাশূন্যে পাঠানোর পরে এই প্রাণীগুলো মারা গিয়েছিল। তারা মূলত সাব অরবিটাল পর্যন্ত গিয়েছিলো – যাকে পুরোপুরি ‘স্পেস মিশন’ বলা যায় না” ।

সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ মহাকাশ মিশনে গিয়ে মানব সভ্যতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিল লাইকা নামের সেই কুকুরটি।
১৯৫৭ সাল, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়া পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম মহাকাশযান স্পুটনিক-১ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করে। এরপরই রুশ বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, মহাকাশে পৃথিবী থেকে কোনো প্রাণীকে পাঠানো যায় কিনা। এই ইচ্ছা বাস্তবায়ন করার জন্য তারা মরিয়া হয়ে ওঠে, যার খেসারত জীবন দিয়ে দিতে হয়েছিল লাইকাকে।

স্পেসে গিয়েছিলো বলে ভাবছেন “লাইকা” খুব স্পেশাল কুকুর? একদম না। সাধারন আট দশটা কুকুরের মত লাইকাও একটি রাস্তার কুকুর ছিলো । লাইকা একটি রাশিয়ান শব্দ – যার অর্থ “ঘেউ ঘেউ করে এমন প্রানী”।

কুকুরদের মহাশূন্যে পাঠাবার কাজ প্রথম শুরু করে সোভিয়েতরা। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা মোট ৫৭টি কুকুর মহাকাশে পাঠিয়েছেন। এদের মধ্যে কয়েকটি কুকুর একাধিকবার মহাকাশ ভ্রমণ করেছে। মস্কোর এই বেওয়ারিশ কুকুরটি মহাবিশ্বে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করা প্রথম জীবন্ত প্রাণী। তবে দুঃখের ব্যাপার হলো, লাইকাকে ফেরত আনবার কোনো পরিকল্পনা সোভিয়েতদের ছিল না। লাইকা ছাড়া বাকী কুকুরদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিলো ।


রুশ বিজ্ঞানীরা তাড়াহুড়ো করে মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে তৈরি করে ফেলে তাদের দ্বিতীয় স্পেসক্রাফট স্পুটনিক-২, এটা ডিজাইন করা হয়েছিল শুধুই একটি কুকুরের জন্য। স্পুটনিক-২ এর প্রধানত তিনটি জিনিস ছিল; অক্সিজেন জেনারেটর, কার্বন ডাইঅক্সাইড অবজারভার এবং কুকুরটির কেবিন ঠান্ডা রাখার জন্য একটি ফ্যান। এছাড়া ছিল তার জন্য সাতদিন বেঁচে থাকার মতো কিছু খাবার এবং তার প্রস্রাব ও বিষ্ঠার জন্য একটি ব্যাগ। স্পুটনিক-২ এর কেবিনটা এতই ছোট ছিল যে কুকুরটা যে একটু নড়াচড়া করবে সে সুযোগও ছিলনা।


স্পেসক্রাফট স্পুটনিক-২ তৈরি করে ফেলার পর রুশ বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন ছিল শুধুই একটি কুকুর, আর তারা জেনেশুনে রাস্তার একটা কুকুরকেই বেছে নেয় কারন রাস্তার কুকুরদের ঘরে পোষা কুকুরদের তুলনায় খারাপ পরিবেশে থাকার অভ্যাস বেশি যা তাদের অভিযানের জন্য বেশি উপযুক্ত। তাই তারা খুঁজে নিয়েছিল মস্কোর রাস্তায় বেওয়ারিশভাবে ঘুরে বাড়ানো লাইকা নামের সেই কুকুরটিকে।


কিন্তু রাস্তা থেকে তুলে আনার পরই শান্ত স্বভাবের লাইকার জীবনে নেমে আসে দুর্যোগ। মুক্ত লাইকাকে পরাধীনতার শিকল পড়িয়ে দিনের পর দিন নিষ্ঠুরভাবে ট্রেনিং দেয়া হয় মহাকাশে পাঠানোর জন্য। যেহেতু স্পুটনিক-২ একটি ছোট আকৃতির স্পেসক্রাফট, তাই লাইকাকে একটি ছোট খাঁচার মধ্যে ২০ দিন আটকে রাখা হয় যাতে সে স্পেসক্রাফটের ছোট্ট কেবিনে আবদ্ধ থাকতে পারে। সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা কুকুরটির স্বাভাবিক খাবারদাবারও বদলে ফেলেছিল৷

এমনই নির্মম সব ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে লাইকাকে তৈরি করা হয়েছিল মহাকাশ অভিযানে পাঠানোর জন্য। যা আপাতদৃষ্টিতে ট্রেনিং মনে হলেও আসলে তা অসহায় লাইকার জন্য টর্চারের মতো ছিল।


লাইকা পৃথিবীকে ভ্রমন করেছিলো স্পুটনিক – ২ নামের একটি মহাকাশ যানে করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে স্পুটনিক – ২ মোটেও কোনো বড় মহাকাশ যান ছিলো না। এটিকে লাইকার আকৃতির থেকে সামান্য বড় আকারের বানানো হয়েছিলো। তখনও সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা জানতেন না যে; কি করে কোনো মহাকাশ যান কে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে হয়। ফলে তারা বুঝেই ছিলেন যে লাইকাকে আর পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যাবে না । নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও লাইকাকে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিলো ।

রাস্তা থেকে তুলে আনা লাইকা হয়ে গেলো পৃথিবীর সর্বপ্রথম সফল মহাকাশ চারী প্রানী। অভিযানের অনেক আগে থেকেই কুকুরদের প্রশিক্ষন পর্ব শুরু হয়ে যেত। একটি হাসিখুশি কুকুরকে পাকড়াও করে ছোট্ট একটি খাচাঁয় পুরে দিলে স্বভাবতই চিৎকার চেচামেচি শুরু করে দেবে।ধীরে ধীরে, ক্রমশ ছোট থেকে আরো ছোট খাঁচায় থাকবার অভ্যাস করানো হতো। মাঝে মধ্যে দীর্ঘদিন একা রেখে দেওয়া হতো, কখনো কখনো একনাগাড়ে পনেরো-বিশ দিনও রাখা হতো। বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে খাওয়ানো হত। পরিয়ে রাখা হতো বিশেষ স্পেসস্যুট। রকেটের গর্জনের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য আগে থেকেই এমন বিকট শব্দের সাথে অভ্যাস করানো হতো।

সবচেয়ে কষ্টকর ছিল সম্ভবত প্রবল বেগে খাপ খাওয়ানোর বিষয়টি। রকেট উৎক্ষেপণের সময় তীব্র গতিবেগের সাথে মানিয়ে নেবার জন্য কুকুরগুলোকে প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকা একটি খাচার মধ্যে বেঁধে দেওয়া হতো। খাঁচায় পাক খেতো তারা। চেষ্টা করে যেত জ্ঞান ধরে রাখতে। সোভিয়েতরা কুকুরগুলোকে ভরশূন্য পরিবেশে থাকবার প্রশিক্ষণও দিয়েছিল। জেট বিমান যদি প্রচণ্ড বেগে ওপরে ওঠে আচমকা আবার নীচে নামে, তাহলে কয়েক মুহুর্তের জন্য বিমানের ভেতরে ভরশূন্য পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কুকুরগুলোকে বিমানে চড়িয়ে এই অভিজ্ঞতারও স্বাদ দেওয়া হয়। লাইকার সাথেও ঠিক তাই করা হয়েছিলো।

১৯৫৭ সালের তিন নভেম্বর, স্পুটনিক-২ এ চড়ে কাজাখস্থানের বাইকনুর কসমোড্রোম থেকে লাইকা যাত্রা শুরু করে। সে সময়ে সবাই জানতো লাইকাকে বাঁচিয়ে ফেরত আনা সম্ভব হবে না। বিজ্ঞানীরা অবশ্য এদিকটায় খুব একটা গুরুত্ব দেননি। তার শরীর কে চেইন দিয়ে বেধে দেয়া হয়েছিলো, যেন বেশি নড়াচড়া করতে না পারে। একটি অক্সিজেনের ট্যাংক ,একটি কার্বন ডাই অক্সাইড অবজারভার আর লাইকাকে ঠান্ডা রাখার জন্য একটা ফ্যান ছিলো সেই মহাকাশ যানে।আর ছিলো কিছু খাবার, মোটামুটি সাতদিন খাবার মত। লাইকাকে মহাকাশ যানে উঠানোর আগে এক বিজ্ঞানী তার নাকে চুমু খান এবং শেষ বারের মতন তাকে বিদায় জানান।

মহাকাশ যান উড়ে যায় লাইকাকে নিয়ে, সবকিছু ঠিকঠাকই ছিলো কিন্তু টেকনিশিয়ানদের সামান্য একটা ভুলের কারনে মহাকাশ যানের একটা অংশের সাহে রকেট টা অনেকক্ষন আটকে ছিলো।যার কারনে লাইকার ক্রবিনের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে।

আসলে মাত্র চার সপ্তাহ সময়ের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা স্পুটনিক- ২ মহাকাশ যান টি বানিয়ে ছিলেন; যা একটি মহাকাশ যান বানানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় ছিলো না। তাপের কারনে লাইকার হার্টবিট অনেক দ্রুত বাড়তে থাকে , ১০৩ থেকে বেড়ে সেটা ২৪০ এ পৌছে যায়। প্রচন্ড গরমে প্রায় তিন ঘন্টা সময় লাইকাকে তার জীবনের সাথে লড়াই করতে হয়, এতই গরম ছিলো যে লাইকার শরীরে লাগানো সেন্সরটই ৫ ঘন্টা পর নষ্ট হয়ে যায় , হার্টবিট মাপার যন্ত্রটি বন্ধ হয়ে যায় । এবং শেষ পর্যন্ত লাইকা মহাকাশেই মারা যায়। মৃত লাইকা নিয়ে আরও ১৬৫ দিন মহাকাশ যান টি মহাকাশে ছিলো। ১৪ ই এপ্রিল ১৯৫৮ সালে, পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করতে গিয়ে লাইকার মৃত দেহের সাথে মহাকাশ যান টিও পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

পরবর্তীতে যখন সোভিয়াত ভেঙে রাশিয়া হয় , তখন লাইকার একটি মূর্তি রাশিয়ার সেই স্থানে স্থাপন করা হয়, যেখানে লাইকাকে ট্রেনিং দেয়া হয়েছিলো । লাইকা ছাড়া প্রায় বাকী সব প্রানীকেই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন।মূলত লাইকা মারা যাবার পর তারা মহাকাশ থেকে কোনো কিছু ফিরিয়ে আনার কৌশল আবিস্কার করতে পেরেছিলেন।

দীর্ঘদিন পর্যন্ত সবার ধারণা ছিল লাইকা ছয় দিনের মতো বেঁচে ছিল। পরে অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়ায় দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই তাকে কৃত্রিমভাবে মেরে ফেলা হয়। অন্তত এটাই ছিল তখনকার সরকারি ভাষ্য। অনেকদিন পর, ২০০২ সালের গোপন নথি থেকে জানা যায়, লাইকা আসলে প্রচণ্ড তাপে পুড়ে মারা গিয়েছিল। উৎক্ষেপণের সাড়ে পাঁচ ঘন্টার মধ্যেই তার চেম্বারের তাপমাত্রা অত্যাধিক বেড়ে যাওয়ায় এই অবস্থা হয়।

লাইকার মত আরও এমন প্রানীকে দিয়ে চালানো বিভিন্ন অভিযানের ফলাফল হিসেবেই ১৯৬১ সালে প্রথম মানুষ হিসেবে ইউরি গ্যাগারিন মহাকাশে যান। সামান্য একটা কুকুর তার জীবন দিয়ে চিরকালের জন্য অমর হয়ে রয়েছে। আজকে যে মহাকাশ যানের এত অগ্রগতি , তারা শুরুটা কিন্তু হয়েছিলো লাইকার জীবন দিয়ে। আজকের বিজ্ঞান মানুষকে পৃথিবীর বাইরে বসবাসের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, মানুষ চাঁদে পদচিহ্ন এঁকেছে। একদিন হয়তো মঙ্গলগ্রহেও পৌঁছে যাবে পৃথিবীর মানুষ, কিন্তু মহাজাগতিক অগ্রযাত্রার ইতিহাসে লাইকার অবদানের কাছে বিজ্ঞান চিরকাল ঋণী থেকে যাবে।


বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

One thought on “কী ঘটেছিল মহাকাশে যাওয়া সেই কুকুরের ভাগ্যে?

মন্তব্য