হিটলারের ‘ইহুদী’ নিধনের অজানা রহস্য!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান চ্যান্সেলর এডলফ হিটলার প্রায় ৬০ লাখ ইহুদীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন এই ইতিহাস আমরা প্রায় সবাই জানি। কিন্তু হিটলার কেন ইহুদীদের ওপর এমন নির্মম হয়ে উঠেছিলেন সেই ইতিহাস আমরা অনেকেই জানি না। আজ পাঠকদের জানাবো হিললার কেন ইহুদীদের নির্মূল করতে চেয়েছিলেন সেই ইতিহাস। তো চলুন জেনে নেওয়া যাক__

হিটলার কেন ইহুদীদের নির্মূল করতে চেয়েছিলেন? কেনই বা নির্মমভাবে ৬০ লাখেরও বেশি ইহুদী হত্যা করেছিলেন- এ নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ৮০ বছর ধরে গবেষণা করে চলেছেন ইতিহাসবিদেরা। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে হিটলারের ইহুদী নিধন বা হলোকাস্টের বেশ কিছু চমকপ্রদ কারণ, সেগুলো হল__

১) কিশোর বয়সে হিটলার ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। অনেক অনেক ছবি আঁকতেন। তখন তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার। সে সময় হিটলার বাবা-মার সঙ্গে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে থাকতেন।  জানা যায়, হিলটারকে আর্ট কলেজ থেকে কয়েকবার প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছিল। কারণ আর্ট কলেজের রেকটর ছিলেন ইহুদী এবং ইহুদী ছাত্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল পুরো কলেজে।

২) হিটলারের মনে চূড়ান্ত ইহুদী বিদ্বেষের বীজ বপন হয়েছিল ১৯০৭ সালে, যখন তার মা ক্লারা একজন ইহুদী ডাক্তার এডওয়ার্ড ব্লোচ এর অধীনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সে সময় ইহুদী ডাক্তার হিটলারের মায়ের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেননি বলে অভিযোগ আছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে ইতিহাসবিদরা একমত হতে পারেননি।

৩) হিটলার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের পরাজয়ের কারণ হিসেবে একমাত্র ইহুদীদের দায়ী করতেন। ইহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা পরাজিত হয়েছিল এটা দৃড়ভাবে বিশ্বাস করতে হিটলার। এছাড়া হিটলার ৯ নভেম্বর ১৯১৮ সালে জার্মানির রাজতন্ত্রের  বিলোপ ইহুদীদের দ্বারা সংগঠিত হয়েছিল বলেও বিশ্বাস করতেন। তাছাড়া হিটলার লক্ষ্য করেন, জার্মান দেশে বসে ইহুদীরা জার্মানির ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা তিনি মেনে নিতে পারেননি।

৪) ইতিহাসবিদ ইয়াহুদ বাউয়ারের মতে, ইহুদী নিধন বা হলোকাস্টের মূল কারণ ছিল আদর্শগত, এর শেকড় হিটলারের কাল্পনিক অলীক জগত। হিটলার মনে করতেন যে, সমগ্র পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করতে একটি আন্তর্জাতিক ইহুদী চক্রান্ত চলছে। তাই ইহুদীদের নির্মূল করতে পারলেই তিনি বিশ্বজয় করতে পারবেন এমন একটি ধারণা তার মধ্যে কাজ করছিল।

৫) হিটলারের নাৎসীবাদের মূলনীতি ছিল- জার্মানদের ভাষা হবে জার্মান, তারা হবে আর্য রক্তের এবং তারা থাকবে সকল ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে মুক্ত। তাছাড়া হিটলারের মতে, জার্মানরা সুপিরিয়র জাতি, তাই ৱতাদের অধিকার রয়েছে বিশ্বকে শাসন করার, যে কিশ্ব হবে ইহুদীমুক্ত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার বাহিনীর ইহুদী নিধনযজ্ঞ

তবে ইহুদীদের প্রতি হিটলারের মনে যে প্রচন্ড ঘৃণা ও বিদ্বেষের জন্ম হয়েছিল তা কোন ধরণের উগ্র চিন্তা আ অন্যায়বোধ থেকে জন্ম লাভ করেনি বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন। কারণ হিটলার ইতিহাস সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন এবং তার তাঁর ইতিহাস জ্ঞানও ছিল প্রখর।

হিটলার জার্মানির ক্ষমতায় আসীন হন ১৯৩৩ সালে। এর আগেই তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মেইন ক্যাম্প’ এ ইহুদীদের জার্মান রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক জীবন থেকে তাড়ানোর আভাস দিয়েছিলেন। তবে তিনি যে ক্ষমতায় আসলে ইহুদীদর নিঃশেষ করে দিবেন সেটা অবশ্য লেখেননি।

১৯২২ সালের দিকে সাংবাদিক মেজর জুসেফ হেলকে নাকি হিটলার বলেছিলেন, ‘আমি যদি কোন দিন সত্যিই জার্মানির ক্ষমতায় যাই, তবে আমার প্রথম ও সব কিছুর আগের কাজ হবে ইহুদীদের শেষ করে দেওয়া।’

হিটলারের জান্মানির চ্যান্সেলর ও ত্রাণকর্তা হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে তার এন্টি সেমিটিজম বা ইহুদী বিরোধী প্রচারণা। হিটলার ক্ষমতায় আসার পরই জার্মানির সবপ্রান্তে ইহুদী বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, শুরু হয় তাদের বিরুদ্ধে হত্যা ও লুটতরাজ। হিটলার চেয়েছিলেন এভাবেই ইহুদীদের জার্মানি থেকে বিতাড়িত করবেন। কিন্তু কোন মানুষই নিজের জন্মস্থান ত্যাগ করতে চায় না। তাই ১৯৩৫ সালে হিটলার নতুন আইন চালু করলেন। তাতে দেশের নাগরিকদের দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা হলো-জেন্টিল আর জু। জেন্টিল অর্থাৎ জার্মান, তারাই খাঁটি আর্য রক্তের। আর জু হলো ইহুদীরা, তারা শুধুমাত্র জার্মান দেশে বসবাসকারী এদেশের নাগরিক নয়। প্রয়োজনে তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। এরপর চার্চ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ইহুদীদের চিহ্ণিত করার জন্য জন্ম রেকর্ড সরবরাহ করে, যা থেকে জানা যেত কে ইহুদী আর কে ইহুদী নয়। অর্থমন্ত্রণালয় ইহুদীদের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে, জার্মান প্রতিষ্ঠানগুলো সমস্ত ইহুদীদের চাকরিচূত্য করে এবং জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইহুদী ছাত্রদের ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায়। এরকম আরও অনেক নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে হিটলার সরকার।

এরমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু কলে ইহুদীদের চূড়ান্তভাবে নির্মূলের সুযোগ পেয়ে যান হিটলার, শুরু করেন হত্যা ও নিধনযজ্ঞ। জনসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ইহুদীপাড়া তথা ঘেটো গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। এছাড়া কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ও গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে ইহুদীদের হত্যা করেন হিটলার। সমগ্র জার্মানি ও জার্মানির দখলকৃত দেশসমুহে হিলটারের পরাজয়ের আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চলে এই ইহুদী নিধনযজ্ঞ।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

মন্তব্য