ভারতীয় বিজ্ঞানীর হাত ধরে যেভাবে পরমাণু বোমা পেল পাকিস্তান

আমরা সবাই জানি পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর একটি দেশ। দেশটির পারমাণবিক বোমার জনক ভারতীয় বিজ্ঞানী আব্দুল কাদির খান। কিন্তু পাকিস্তান কিভাবে ভারতীয় বিজ্ঞানীর হাত ধরে বিশ্বের অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হয়ে উঠলো সেই ইতিহাস হয়তো আমরা অনেকেই জানি না। আজ আমরা পাঠকদের জানাবো পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে ওঠার সেই অজানা ইতিহাস। তো চলুন জেনে নিই__

পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তিধর উপরে ওঠার ইতিহাস

পাকিস্তানের পরমাণু বোমার জনক ডক্টর আব্দুল কাদির খান। পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে ওঠার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আব্দুল কাদির খান। তিনি ১ এপ্রিল ১৯৩৬ সালে ভারতের ভূপালের জন্মগ্রহণ করেন। ভূপাল তখন নবাব শাসিত ব্রিটিশ ভারতের একটি করদ রাজ্য ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর আব্দুল কাদির খান তার বাবা-মায়ের সাথে চলে আসেন পাকিস্তানের করাচিতে। ভূপালে তার পরিবারের সুবিশাল সম্পত্তি লুট হয়। তিনি করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূবিদ্যা বিভাগে পড়াশোনা করেন। তিনি বিভিন্ন ধাতুর নিয়ে বিশেষভাবে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য প্রথমে পশ্চিম জার্মানিতে ও পরে নেদারল্যান্ডে যান। তিনি নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত ডেলফট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি ডেলফট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন ধাতুবিদ্যা, বিশেষভাবে ইউরোনিয়াম নিয়ে। সেখানে গবেষণা করতে গিয়ে ডক্টর কাদির ইউরোনিয়ামের সাথে পরমাণুবোমা তৈরি কথা চিন্তা করেন। এসময় ডেলফট বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অধ্যাপক পরমাণু বোমা তৈরি করতে চাচ্ছিলেন। ইউরোনিয়াম গবেষণায় সাফল্যের কারণে কাদির খান ডেলফট বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পান এবং গবেষণা করে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন। এসময় তিনি ইউরোনিয়াম নিয়ে একটি বই লিখেন যা যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করে। বইটি তিনি ডাচ ভাষায় লিখেছিলেন, পরে তা অনূদিত হয় জার্মান ও ইংরেজি ভাষায়।

আব্দুল কাদির খান নেদারল্যান্ডের ডেলফট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের বিখ্যাত গবেষকদের সঙ্গে ইউরোনিয়াম নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার টিম পরমাণু বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করে, নেদারল্যান্ডস সরকারের কাছে পরমাণু বোমা তৈরির অনুমতি চায়। তবে সরকার তাদের সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে নেদারল্যান্ডসকে প্যারা-নিউক্লিয়ার রাষ্ট্রে পরিণত করে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের কাছে পাকিস্তান পরাজিত হওয়ার পর ডক্টর আব্দুল কাদির খান নিজ উদ্যোগে পাকিস্তানে ফিরে এসে তৎকালিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে পারমাণবিক বোমা বানানোর অনুমতি চায়। প্রেসিডেন্ট ভুট্রোর অনুমতি নিয়ে কাদির খান পাকিস্তানে পরমাণু বোমা তৈরির কাজ শুরু করেন। এসময় নেদারল্যান্ডসের গবেষকরাও তাঁকে সাহায্য করেন। ডেলফট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর তাঁকে পারমাণবিক প্রযুক্তি দিয়েছিলেন, কারণ কাদির খান ছিলের তাঁর অনেক কাছের প্রিয় একজন ছাত্র।

জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রথমে কাদির খানের কথায় বিশ্বাস করেননি, তবে পাকিস্তানের পরমাণু বোমার প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবে পরে ভুট্টো কাদির খানকে পরমাণু বোমার তৈরির কাজের অনুমতি দেন।

পাকিস্তান ১৯৭২ সালে করাচি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট প্রজেক্টের মাধ্যমে পারমাণবিক বোমা তৈরির কার্যক্রম শুরু করে। সেখানে কাদির খান ও আরও কয়েকজন পাকিস্তানি বিজ্ঞানী মিলে তৈরি করেন পাকিস্তানের প্রথম পরমাণু বোমা।

পাকিস্তান যে পরমাণু বোমা বানাতে সক্ষম হয়েছে, একথা পাকিস্তান সরকার খুব গোপনে রাখে। তারা এতটাই গোপন রেখেছিল যে বোমা তৈরি হওয়ার আট বছর পর সিআইএ সেটা টের পায়, কিন্তু তখন করার কিছুই ছিল না। ভারত-ইসরাইলকে ভারতের মাটি ব্যবহার করতে দিয়ে পাকিস্তানের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর ধ্বংসের চেষ্টা চালায়। পাকিস্তান সেটা গোয়েন্দা সূত্রে জানতে পেরে দিল্লি ও তেলআবিবে পারমাণবিক হামলার হুমকি দিলে ইসরাইল হামলা না্ করে ফিরে যায়। এরপর শক্তির জানান দিতে পাকিস্তান মরুভূমিতে পাঁচটি পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শক্তি প্রদর্শন করে। এর একদিন আগে ভারত একটি

পরমাণু বোমা ফাটিয়েছিল। আমেরিকাও অবশ্য ভারতকে পাকিস্তানের পরমাণু প্লান্টে হামলা না করতে সতর্ক করে, কারণ তখন আমেরিকা আর পাকিস্তান মিত্র ছিল। পাকিস্তান ১৯৯৮ সালের ২৮ মে বেলুচিস্তানে তার প্রথম পাঁচটি পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর ৩০ মে পাকিস্তান আবার দ্বিতীয় দফায় পরমাণু বোমার পরীক্ষা চালায়।

গুঞ্জন আছে পাকিস্তানকে পরমাণু বোমা তৈরি করার জন্য সর্বপ্রথম ৫০ কেজি ইউরোনিয়াম সরবরাহ করেছিলেন চীন। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ও চীনের প্রেসিডেন্ট মাওসেতুং এর মধ্যকার সমঝোতার ভিত্তিতে ১৯৮২ সালে ওই ইউরোনিয়াম সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি পাকিস্তানকে পরমাণু বোমা তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় নকশা ও সরঞ্জামাদি দিয়েও সাহায্য করেছিল চীন। পাকিস্তানের পরমাণু বিজ্ঞানী আব্দুল কাদির খানের একটি চিঠি ফাঁস হলে এ তথ্যগুলো বের হয়ে আসে। এমন খবর ২০১০ সালে প্রভাবশালী মার্কিন পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট প্রথম প্রচার করেছিল। সেই চিঠির বরাতে পত্রিকাটি আরও জানায় যে, ভারত পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা করার পরে ১৯৭৬ সালে ভুট্টো চীনের প্রেসিডেন্ট মাওসেতুং এর কাছে পরমাণু বোমা তৈরি করার ব্যাপারে সাহায্য চান। ভুট্টোর পরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের অনুরোধে চীনের প্রেসিডেন্ট মাওসেতুং ৫০ কেজি ইউরেনিয়াম সরবরাহ করে। ওয়াশিংটন পোস্টে ও ভারতের এ দাবিকে আবশ্য চীন ও পাকিস্তান প্রত্যাখ্যান করেছিল। পাকিস্তান বাইরের কোন দেশ থেকে পরমাণু প্রযুক্তিগত সাহায্য পেয়ে থাকলে সেটা পেয়েছিল একমাত্র নেদারল্যান্ডসের কাছ থেকে।

বর্তমানে পারমাণবিক বোমা বহনে সক্ষম বিভিন্ন দীর্ঘ, মাঝারি ও স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে পাকিস্তানের। ২০১২ সালে পাক নৌবাহিনী সাগরভিত্তিক পারমাণবিক শক্তি প্রতিষ্ঠা ও মোতায়েনের জন্য হেড কোয়ার্টার্স নেভাল ফোর্সেস স্ট্যাটেজিক কমান্ড প্রতিষ্ঠিত করে।

পাকিস্তান মূলত ভারতকে মোকাবেলা করার জন্য তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। আর ভারতের সমস্ত প্রদেশগুলো পাকিস্তানের মিসাইলের আওতায় রয়েছে। পাকিস্তান বিভিন্ন প্রকার ক্ষুদ্র পরমাণু বোমা তৈরি করেছে, এসব ক্ষুদ্রাকার পরমাণু বোমা একসাথে অনেক জায়গাজুড়ে নিক্ষেপ করা সম্ভব। যার ফলে বড় আকৃতির পরমাণু বোমার চেয়ে এর ধংসাত্মক ক্ষমতা হবে বিপুল। অন্যদিকে এসব ক্ষুদ্রাকার পরমাণু বোমা নির্মাণের খরচও পড়বে অনেক কম। তাই যুদ্ধে খরচের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।

তবে পাকিস্তানের পরমাণু বোমার জনক আব্দুল কাদির খান কখনোই তার যোগ্য মর্যাদা পাননি। পাকিস্তানের পরমাণু বোমার জনককে দেওয়া হয় জেল, মামলা, নিগ্রহ, অপবাদ আর গৃহবন্দীত্ব। কারণ আব্দুল কাদের খান নিজের মুখে স্বীকার করেছিলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম সকল মুসলিম দেশ পরমাণু প্রযুক্তি সমৃদ্ধ হোক। তাই পরমাণু প্রযুক্তি সরবরাহ করেছিলাম লিবিয়ার গাদ্দাফি এবং ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের মতো নেতাদের হাতে। তাদের হাতে যদি পরমাণু বোমা থাকতো তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার যে তাণ্ডব চালাচ্ছে, তা চালানোর সাহস তারা পেত না।’

শুধু তাই নয় আব্দুল কাদির খান আমেরিকাকে দমাতে উত্তর কোরিয়ার হাতেও পরমাণু প্রযুক্তি তুলে দিয়েছিল। বর্তমানে খুব গরিব দেশ হয়েও যারা আমেরিকাকে হুমকি-ধামকি দেয় তাদের মধ্যে উত্তর কোরিয়া প্রধান। এবং সেটাও তাদের সেই পরশানু প্রযুক্তির বলে বলিয়ান হয়ে।আর এই কারণে বর্তমানে আমেরিকার চোখে খারাপ পরমাণুবিজ্ঞানী আব্দুল কাদির খান। মোসাদের গুপ্তঘাতকের কিলিং লিস্টের শীর্ষে আব্দুল কাদের খানের নাম।

পাকিস্তান সরকার আব্দুল কাদির খানকে জেল থেকে মুক্তি দিলে ফ্রান্সসহ সকল ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ হৈহুল্লোড় শুরু করে দেয়। পরমাণু বোমার জনক আব্দুল কাদের খানকে যথাযোগ্য মর্যাদা পাকিস্তান কখনোই দিতে পারেনি।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

মন্তব্য