সোমালিয়ান জলদস্যুরা যেভাবে বড় বড় জাহাজ ছিনতাই করে (ভিডিও)

আরব সাগর আর লোহিত সাগরের ঠিক মাঝামাঝি এলাকায় আফ্রিকার যে দেশটি শিংয়ের মতো বাঁকা সেটি সোমালিয়া। দেশের মানচিত্র দেখতে সিংহের মত হওয়ার কারণে সোমালিয়াকে হর্ন অফ আফ্রিকা বা আফ্রিকার সিং বলা হয়।

বিগত শতাব্দীর ৯০ দশকের শুরুতে সোমালিয়ার সামরিক স্বৈরশাসক মোহাম্মদ সাঈদ বারির সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে ভয়ানক গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ফলশ্রুতিতে পরবর্তী দশকে সোমালিয়া উপকূলে আধুনিক জলদস্যুতার জন্ম নেয়। সোমালিয়া সমুদ্র উপকূল ভাগের জলদস্যুতার ঘটনা বিশ্ব বাণিজ্য ও এর নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। জাতিসংঘ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর হস্তক্ষেপ সত্বেও সোমালিয়ান জলদস্যুদের থামানো যায়নি।

সোমালিয়ান জলদস্যুদের উত্থান হয়েছিল অসাধারণ এক প্রতিরোধ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে জলদস্যুতা পরিণত হয় সোমালিয়ার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতে। আফ্রিকার সমগ্র পূর্ব উপকূল থেকে শুরু করে আরব সাগর ও মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশি জুড়ে গড়ে উঠেছিল তাদের দুর্দমনীয় আধিপত্য। পণ্যবাহী জাহাজের আতঙ্ক সোমালিয়ার কুখ্যাত জলদস্যুরা বিশাল বিশাল জাহাজ ছিনতাই করেছে সামান্য স্পিডবোট ব্যবহার করে। আজ আমরা পাঠকদের জানাবো সোমালিয়ান জলদস্যুরা সমুদ্রের মাঝখানে কিভাবে বড় বড় জাহাজ ছিনতাই করে। তো চলুন জেনে নেওয়া যাক__

এশিয়ার দেশগুলো ইউরোপের সাথে বাণিজ্য করতে চাইলে ভারত মহাসাগর ও আরব সাগর দিয়ে সুয়েজ খাল অতিক্রম করেই কেবল ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানো সম্ভব। আর এই পথে চলা জাহাজগুলোকে সোমালিয়া উপকূল অতিক্রম করতেই হয়, আর তাই জলদস্যুদের এড়িয়ে বাণিজ্য জাহাজগুলি পরিচালনা করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আরব সাগর ও লোহিত সাগর ব্যবহার করে তাদের জন্য এই রুটটি হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদসংকুল জলপথ।

১৯৯১ সালের পর থেকে এই এলাকায় জলদস্যুতা শুরু হলেও ২০০৫ সাল থেকে মূলত সোমালিয় জলদস্যুরা বৃহৎ পরিসরে সংঘবদ্ধ আক্রমণ শুরু করে। এ সময় থেকেই তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার শুরু করে। মোবাইল ফোন, স্যাটেলাইট ফোন, জিপিএস, সোলার সিস্টেম, আধুনিক স্পিডবোট, অ্যাসল্ট রাইফেল, শটগান, গ্রেনেড লঞ্চারসহ অত্যাধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে তারা আক্রমণ চালায়।

সোমালিয়ান জলদস্যুদের নিয়ে তৈরি ‘ক্যাপটেন ফিলিপস’ ছবির দৃশ্য।

গভীর সমুদ্রে দস্যুবৃত্তির ক্ষেত্রে তারা একটি মাদারশিপ থেকে অভিযান পরিচালনা করে। আর বড় জাহাজগুলোর কাছে পৌঁছাতে তারা দ্রুতগতির ছোট ছোট মোটর চালিত নৌকা বা স্পিডবোট ব্যবহার করে। আক্রমণকারী এসব স্পিডবোটে ভারী অস্ত্র ও স্যাটেলাইট ইকুইপমেন্টের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি থাকে নৌকার ইঞ্জিনের জ্বালানি। কারণ কখনো কখনো টানা ২-৩ দিন পর্যন্ত তাদের টার্গেটের পেছনে ধাওয়া করতে হয়। আক্রমণের সময় হিসেবে জলদস্যুরা সাধারণত রাত বা ভোরের সময়টা বেছে নেয়। আক্রমণকারী স্পীডবোট অতিরিক্ত ছোট হওয়ায় বড় জাহাজগুলো রাডারে তা সহজে ধরা পড়ে না।

জলদস্যুরা সাধারণত জাহাজের পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে। দস্যুদের নৌযানগুলোকে জাহাজের দিকে আসতে দেখলে নাবিকরা গরম পানি স্প্রে করে আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তাদের ঠেকানো খুব সহজ নয়। এক মাথায় হুক লাগানো লম্বা মই বা দড়ি বেয়ে তারা দ্রুত জাহাজে উঠে যায়। জলদস্যুরা জাহাজে উঠে সকলকে জিম্মি করে ফেলে। এ কাজগুলো তারা এত দ্রুত করে যে, জাহাজের ক্রুরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

জলদস্যুরা মুক্তিপণ আদায় করে ইউএস ডলার বিলের মাধ্যমে। মুক্তিপণের অর্থ ডেলিভার করার জন্য তা বস্তায় ভরে হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দেয়া হয়। যদিও মুক্তিপণ আদায়ের লক্ষ্যে জলদস্যুরা বন্দীদের জীবিত রাখে, তবুও তাদের কাছে বন্দী অবস্থায় এ পর্যন্ত ৬০ জনের বেশি নাবিক মারা গিয়েছে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

মন্তব্য