পারমাণবিক বোমা নয়; ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অস্ত্র জঙ্গিবাদ ও মাদক

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন


ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫(এ) ধারা বিলুপ্ত করে কাশ্মীরকে ভারতের অঙ্গিভূত করে নেওয়ায় পর থেকে যুদ্ধের হুমকি দিয়ে আসছে পাকিস্তান। তবে অর্থনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষমতা নেই পাকিস্তানের। গত ২ সেপ্টেম্বর পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাঁর আগের অবস্থান থেকে সরে এসে ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায় না তার দেশ্, এমনকি এতদিন পাকিস্তান পরমাণু বোমা ব্যবহারের যে হুমকি দিয়ে আসছিল সেখান থেকেও সরে এসেছেন ইমরান, সুর নরম করে বলেছেন পাকিস্তান আগে পরমাণু হামলা করবে না।

ভারতের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর শক্তি, সাহস কোনটা না থাকলেও অপকৌশলে পিছিয়ে নেই উপমহাদেশের ‘বিষফোঁড়া’ এই দেশটি। কাশ্মীর উপত্যাকায় জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ভারতকে শিক্ষা দিতে চায় পাকিস্তান। এ জন্য হেন কোন অপকৌশল নেই যেটা দেশটি অবলম্বন করছে না। শুধু কাশ্মীর কিংবা ভারত নয়, উপমহাদেশের অন্যান্য দেশেও জঙ্গিবাদকে উস্কেদিয়ে নিজের ফায়দা হাসিলের চেষ্টা পাকিস্তান করছে সেই জন্মলগ্ন থেকে, যা এখনও চলমান।

কাশ্মীর, ভারত কিংবা বাংলাদেশ যেখানেই হোক না কেন পাকিস্তান সব সময়ই উগ্রপন্থাকে মদদ দিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করে। এমনকি ৯/১১ এর টুইন টাওয়ার হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মোহম্মদকে পাকিস্তান থেকেই আটক করে যুক্তরাষ্ট্র। আর ওসামা বিন লাদেন মার্কিন নেভি সিলের অভিযানে নিহত হওয়ার আগে পর্যন্ত ছিলেন পাকিস্তানেই। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জঙ্গিগোষ্ঠি আরসাকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেশ পুরোনো।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলায় এক ভয়াবহ আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪০ জন জওয়ান নিহত হয়। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মুহাম্মদ এই হামলা চালায়। জইশ-ই-মুহাম্মদ ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর, বিশেষত গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে বলে অভিযোগ আছে। এই সংগঠনের নেতা মাসুদ আজহার পাকিস্তানে বসবাস করেন এবং অভিযোগ সত্ত্বেও তাঁকে কখনোই পাকিস্তানের সরকার বিচারের মুখোমুখি করেনি। ২০০১ সাল থেকে ভারতে একাধিক জঙ্গি হামলার জন্য জইশ-ই-মুহাম্মদ ও পাকিস্তানভিত্তিক আরেকটি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবাকে ভারত দায়ী করে।

ভারতের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং ভারতশাসিত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক কালে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিদের উপস্থিতির চেষ্টা ভারতকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। পাকিস্তানের মদদে জঙ্গি গোষ্টিগুলো ভারত সীমান্তে অবৈধ মাদক বাণিজ্যের নেটওয়ার্কও গড়ে তুলেছে। ভারতবিরোধী তৎপরতা চালানো জঙ্গি সংগঠনগুলির মধ্যে রয়েছে হরকাতুল মুজাহিদীন, জয়েশ-ই-মহম্মদ, লস্কর-ই-তইবা।

জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, তাদের দিয়ে কৌশলগত স্বার্থ উদ্ধার এবং এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বহাল রাখার জন্য পাকিস্তান অবশ্যই দায়ী। গত ১৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রযটার্সে ‘অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ক ধ্বংশ করে দিয়েছে ভারত’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়েছে –মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান রোধে পাকিস্তানের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছে ভারত সরকার। কারণ এই রুটটি জঙ্গিরা মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের কাজে ব্যবহার করছিল।

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা তদন্ত সংস্থার অনুসন্ধানে দেখা গেছে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলির প্রায় সবকটির সঙ্গে জঙ্গিদের সংযোগ রয়েছে। কাশ্মীরের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনে যে পাকিস্তানের হাত আছে সেটার প্রমান পাওয়া যায় রয়টার্সে গত ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে। সেখানে বলা হচ্ছে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে পাকিস্তানি সেনাদের আভিযান চালানোর আহবান জানিয়েছেন এক জঙ্গি নেতা। তিনি বলছেন, নয়াদিল্লি কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহার করায় সেখানকার মুসলমানদের সুরক্ষায় জাতিসংঘ যদি শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরণে ব্যর্থ হয় তাহলে পাকিস্তানের উচিত অবিলম্বে কাশ্মীরে সেনা পাঠানো। কাশ্মীরে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক ডজনেরও বেশি জঙ্গি গ্রুপের জোটের নেতা সৈয়দ সালাহউদ্দিন এই অঞ্চলটির জনগণকে সামরিকভাবে সহায়তা করার জন্য ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরে প্রবেশ করার জন্য প্রথম ইসলামী পারমাণবিক শক্তি সম্পন্ন দেশ পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আহবান করেছেন।

গত ১৪ জুলাই বিজনেস ইনসাইডারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে জঙ্গিবাদের প্রসারে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানে লিপ্ত পাকিস্তান ভিত্তিক খালিস্তান জঙ্গিরা। গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে লেখা হয়- পাকিস্তান খালিস্তানপন্থী শিখ সন্ত্রাসীদের উসকে দিতে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি রুটে মাদক ও অস্ত্রের চোরাচালান বৃদ্ধি করেছে। পাঞ্জাবে জঙ্গিবাদের প্রসারে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান থেকে প্রাপ্ত অর্থ সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে। খালিস্তান কমান্ডো ফোর্স ও সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রধান পারমজিৎ সিং পাঞ্জওয়ার ১৯৯৪ সাল থেকে পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থান করছেন। তাঁর স্ত্রী এবং দুই ছেলে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে থাকেন।

সাম্প্রতিক মাসগুলিতে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা এবং ভারতের কোস্ট গার্ড কর্তৃক পাকিস্তান থেকে সরবরাহ করা বিপুল পরিমাণ মাদকের চোরাচালান আটকের পর জানা যায় পাকিস্তান প্রতিবেশী দেশগুলি, বিশেষত শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপকে ব্যবহার করে ভারতে মাদক ঢোকানোর চেষ্টা করছে। এমনকি ভারতে মাদক চোরাচালানে পাকিস্তানি সন্ত্রাসীরা ড্রোন ও সামরিক জাহাজ ব্যবহার করছে, এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য দ্য ইকোনমিক টাইমসের ১৪ জুলাই ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে।

বাংলাদেশ ও ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের জাল টাকা তৈরি, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ইত্যাদির বিস্তারে পাকিস্তানের ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পেছনে মদদ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জঙ্গীগোষ্ঠীকেও মদদ দিয়ে থাকে পাকিস্তান। মিয়ানমারের রহিঙ্গা উগ্রবাদিদের সঙ্গেও পাকিস্তানের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সূত্রে জানা যায় মিয়ানমারের মংডুতে সেনা চৌকিতে যে হামলা চালানো হয়েছিল এর পেছনেও কলকাঠি নেড়েছে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংগঠন আইএসআই । বাংলাদেশকে অস্থীতিশিল করতে সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওই হামলা চালানো হয়েছিল পাকিস্তানে প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত রহিঙ্গা উগ্রবাদীদের দিয়ে। ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নির্বিচারে রহিঙ্গা নিধনে লিপ্ত হয়। আর যারা বেচে যায় তারা দলে দলে পালিয়ে আসে বাংলাদেশে। এখন বিশ লাখেরও অধিক রহিঙ্গা উদ্বাস্তর চাপ এখন বাংলাদেশের ঘাড়ে। তাদের হাত দিয়ে এখনও ইয়াবা ঢুকছে বাংলাদেশ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কক্সবাজারের বনভূমি। বেড়েছে অপরাধ।


দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সন্ত্রাস ও জঙ্গীগোষ্ঠীকে পাকিস্তান মদদ দিয়ে আসছে। আল কায়েদা, লস্কর-ই-তৈয়বা, জইশ-ই-মোহাম্মদসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পেছনে রয়েছে পাকিস্তানের মদদ। আর পাকিস্তানের কারণেই ভারত, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানে জঙ্গীবাদের ঝুঁকি বাড়ছে। ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের পাঠানকোট বিমানবন্দরে হামলা, পুলওয়ামা জঙ্গি হামলাসহ বারতে সংগঠিত অধিকাংশ জঙ্গি হামলার পেছনে পাকিস্তানের মদদ আছে। পাঠানকোট হামলাকারীরা পাকিস্তানের একটি বিমান ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল বলেও দাবি করেছে ভারত। জইশ-ই-মোহাম্মদের জঙ্গীরা পাকিস্তান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এ হামলা চালায় বলে জানিয়েছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক সংবাদ বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়ায় তৎপর জিহাদীগোষ্ঠী আইএসসহ বিশ্বের বিভিন্ন জিহাদীগোষ্ঠীর উত্থানের জন্য পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার হাত রয়েছে। শুধু তাই নয়, দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ বিস্তার মাদক চোরাচালান এবং এ থেকে উপার্জিত অর্থ জঙ্গিবাদের প্রসারে বিনিয়োগ দেশটির পরমানু বোমার চাইতে কম উদ্বেগজনক নয়।

মন্তব্য