কাশ্মীর নিয়ে কেন এত পক্ষপাত? বেলুচিস্তানের দিকেও নজর দিন

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন

গত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫(এ) ধারা বিলুপ্ত করে কাশ্মীরিদের দেওয়া বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে নিয়েছে ভারত সরকার। ৩৭০ ধারাটি ভারতের সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর। বিগত ৭০ বছররের অধিক সময় ধরে এই ধারার আওতায় স্বায়ত্তশাসনের সুবিধা ভোগ করে আসছিল কাশ্মীরিরা। ৩৭০ অনুচ্ছেদের কারণে জম্মু ও কাশ্মীর অন্য যেকোনো ভারতীয় রাজ্যের চেয়ে বেশি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতো। এই ধারা বলে ভারতীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল। এছাড়া পররাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়াদি, প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগ বাদে অন্যান্য সব ক্ষেত্রে স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও দিয়েছিল এই বিশেষ ধারা।

কাশ্মীরে ভারতীয় অন্যান্য রাজ্য প্রদেশের মানুষ সম্পত্তি কিনতে পারত না। ভারতীয় হবার পরও কাশ্মীরিদের অন্য রাজ্যের কেউ বিয়ে করতে পারত না। সরকারী চাকরি সমস্ত ভারতীয়দের জন্য উন্মক্ত হলেও কেবল কাশ্মীরিদের অধিকার ছিলো কাশ্মীরের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার। একই কথা খাটে রাজনীতির ক্ষমতায়নের বেলাতেও। এই সুযোগে  গুটিকয়েক কাশ্মীরি পরিবারই যুগের পর যুগ ধরে নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে ওই অঞ্চলের রাজনীতি।

৩৭০ ধারা বাতিলের পর কাশ্মীরের রাস্তায় ভারতীয় সেনাদের সতর্ক প্রহরা

ভারতের জন্য যেটি ছিলো সবচেয়ে মাথাব্যথার কারণ সেটি  হচ্ছে কাশ্মীরে পাকিস্তানের সাহায্যপুষ্ট জঙ্গি সঙগঠনগুলোর উত্থান। যা এ অঞ্চলজুড়ে সন্ত্রাসবাদ বিস্তারে ভুমিকা রেখে এসেছে কয়েক যুগ ধরে । ‘বিচ্ছিন্ন কাশ্মীরের’ পুরো ফায়দা নিয়েছিলো পাকিস্তান। ধর্মীয় পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে মুসলিম দরদী সেজে পাকিস্তান সেখানে গোয়েন্দা তৎপরতা চালাতো। ইসলামিক জিহাদী গ্রুপগুলোকে মদত দিয়ে কাশ্মীরকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ‘দারুল ইসলাম’ কায়েম করার জন্য তরুণদের মজগ ধোলাই করতে সক্ষম হয়েছিলো।

পাকিস্তান উপমহাদেশের একটি বিষফোঁড়া। তার কাজই উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে জঙ্গিবাদকে উস্কে দেওয়া। কাশ্মীর, ভারত কিংবা বাংলাদেশ যেখানেই হোক না কেন পাকিস্তান সবসময়ই উগ্রপন্থাকে মদত দিয়ে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির চেষ্টা করে। এমনকি ৯/১১ এর টুইনটাওয়ার হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মোহম্মদকে পাকিস্তান থেকেই আটক করে যুক্তরাষ্ট্র। আর ওসামা বিন লাদেন মার্কিন নেভি সিলের অভিযানে নিহত হওয়ার আগে পর্যন্ত ছিলেন পাকিস্তানেই।

পাকিস্তান-ভারতের মধ্যকার এই নতুন সংঘাতের আশু প্রেক্ষাপট হচ্ছে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলায় এক আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪০ জন সৈন্যের নিহত হওয়ার ঘটনা। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মুহাম্মদ এই হামলা চালায়। জইশ-ই-মুহাম্মদ ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর, বিশেষত গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে বলে অভিযোগ আছে। এই সংগঠনের নেতা মাসুদ আজহার পাকিস্তানে বসবাস করেন এবং অভিযোগ সত্ত্বেও তাঁকে কখনোই পাকিস্তানের সরকার বিচারের মুখোমুখি করেনি।

২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামায় জঙ্গিদের আত্মঘাতী বোমা হামলার ছবি

২০০১ সাল থেকে ভারতে একাধিক জঙ্গি হামলার জন্য জইশ-ই-মুহাম্মদ ও পাকিস্তানভিত্তিক আরেকটি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবাকে ভারত দায়ী করে। ভারতের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং ভারতশাসিত কাশ্মীরে সাম্প্রতিককালে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিদের উপস্থিতির চেষ্টা ভারতকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। পাকিস্তানের মদদে জঙ্গি গোষ্টিগুলো ভারত সীমান্তে অবৈধ বাণিজ্য নেটওয়ার্কও গড়ে তুলেছে। ভারতবিরোধী তৎপরতা চালানো জঙ্গি সংগঠনগুলির মধ্যে রয়েছে হরকাতুল মুজাহিদীন, জয়েশ-ই-মহম্মদ, লস্কর-ই-তইবা। জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, তাদের দিয়ে কৌশলগত স্বার্থ উদ্ধার এবং এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বহাল রাখার জন্য পাকিস্তান অবশ্যই দায়ী।

নরেন্দ্র মোদীর সরকার সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত করে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতের অন্তর্ভূক্ত করে নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বাংলাদেশে আন্দোলন হচ্ছে। কাশ্মীরিরা মুসলিম ভাই, এই যুক্তিতে আমাদের দেশে অনেকে ফেসবুকে পোষ্ট দিচ্ছেন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্য এদেশের মানুষ কথা বললেও সেসব কথার অনেক অংশ জুড়ে আছে কেবল ভারত বিরোধীতা এবং পাকিস্তানের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন! তবে কাশ্মীরের সাধারণ জনগন কিন্তু পাকিস্তানের প্রদেশ হতে চায় না। তাঁরা চায় আজাদী। কিন্তু বাঙালীরা অতি আবেগী, ফলে কাশ্মীরের আজাদীর জন্য দরদ দেখাতে গিয়ে বারবার পাকিস্তানকেই প্রমোট করে বেড়াচ্ছে। কাশ্মীরের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের সরব উপস্থিতি নিয়ে কেউ কিছু বললেই উন্মাদের মতো তেড়ে আসছেন তাঁরা। যিনি ই এ বিষয়ে কথা বলছেন তারে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে ভারতের দালাল হিসেবে।

৩৭০ ধারা বাতিলের প্রতিবাদে গত ১৬ আগস্ট জম্মুর রাস্তায় কাশ্মীরিদের বিক্ষোভ

অথচ কাশ্মীরের পাশেই বেলুচিস্তান, সেখানেও তো গত ৭০ বছরের অধিক সময় ধরে মুসলমানদেরকে নিধন করছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, সেগুলো নিয়ে কোন কথা হয় না। বাংলাদেশে শুধু কাশ্মীর ইস্যুটাকে সামনে নিয়ে আসা কেন? বেলুচিস্তান নিয়ে কেন কোন কথা বলে না বাংলাদেশের কাশ্মীর দরদীরা? কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে বিভিন্ন সময়ে ঢাকায় অনেক মিছিল-মিটিং, সমাবেশ হয়েছে, কাশ্মীরি মুসলিম ভাইদের জন্য কেঁদে বুক ভেসেছে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মানুষের, কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে বেলুচিস্তানের মুসলিম নীধন নিয়ে এরা কখনো টু শব্দটিও করেনি। অথচ একাত্তরে এই বেলুচিস্তানের মানুষরাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা  বলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সেখানে ছাত্ররা মিছিল করেছে। পাকিস্তানের দখলে থাকা আজাদ কাশ্মীর নিয়েও তাঁদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। চীনের দখলে থাকা কাশ্মীর (আকসাই চায়না) নিয়েও তাঁরা আজ পর্যন্ত একটি শব্দও খরচ করেনি। এর পেছনের রহস্য কী? রহস্য আসলে একটাই এদেশে পাকিস্তানের ছায়া আজ অবধি মুছে যায়নি। স্বাধীনতার পরে এতগুলো বছর কেটে গেল এখনো সুযোগ পেলে এই পাকিস্তানপন্থী অপশক্তিটি ভারতবিদ্বেষী প্রোপাগাণ্ডা ছড়াতে ব্যকুল হয়ে পড়ে।

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল করেছে ‘আজাদ কাশ্মীরের’ দাবীতে। বায়তুল মোকাররমে বিক্ষোভ হয়েছে। এটা খুবই স্বাভাবিক। তারা বলেছে কাশ্মীরিরা তাদের ভাই, এই ভাইদের উপর ভারত জুলুম করছে- তারা এর প্রতিবাদ করছে…। কাশ্মীরিদের ভাই বলছে কারণ তারা মুসলমান। শুধু মুসলমান বলে কথা নয়। মানবতাবাদী প্রতিটি মানুষই এটাকে সমর্থন করবে না । কিন্তু অস্বাভাবিক লাগে তখনই যখন পাশাপাশি দেশ পাকিস্তানের বেলুচিস্তানেও তো মুসলমানদের নির্যাতন করছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সেখানকার অবস্থা তো আরও ভয়াবহ। সেসব নিয়ে এদেশে কোন কথা হয় না। প্রশ্ন হচ্ছে সেখানকার মুসলমান কি ‘ভাই’ না? বেলুচিস্তানের মুসলিম নির্যাতন নিয়ে কেন কোন কথা বলছে না? বেলুচিস্তানে পাক সেনাদের নিপীড়নে যাঁরা নির্বিকার তারাই আবার কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবীতে মুখর!

কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে গত ৬ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল

কাশ্মীরের অবস্থা কখনই বেলুচিস্তানের চেয়ে খারাপ ছিলো না। বেলুচিস্তানের মতো নির্যাতন-নিপীড়ন কাশ্মীরে কখনই হয়নি বরং ভারতের অনন্য রাজ্যের তুলনায় অধিক সুযোগ-সুবিধা জম্মু-কাশ্মীরের জনগণ এতদিন ভোগ করে এসেছে। কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। কাজেই সেখানকার স্থানীয় শাসনতন্ত্র এই মুসলমানদের নিয়েই গঠিত হত। চাকরিতে তাদের একক প্রাধান্য ছিল।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হাতে প্রতিনিয়ত গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বেলুচিস্তানের বাসিন্দারা। বেলুচিস্তানের মানবাধিকার কাউন্সিলের এক গোপন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালের প্রথম ৬ মাসে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ৩৭১ জন গুম ও অন্তত ১৫৮ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। ২০১১ সাল থেকে শত শত বেলুচিস্তানের বাসিন্দাদের গুমের মাধ্যমের খুন করা হয়েছে। পাকিস্তানি নিরপত্তা বাহিনী প্রতিনিয়ত বেলুচিস্তানের বাসিন্দাদের নারী ও শিশুদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই অঞ্চলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বহুল উপস্থিতি ও কড়া নজরদারি রয়েছে। দীর্ঘদিন পাক সেনাদের নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার বেলুচরা সম্প্রতি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে ভারতের সহায়তা কামনা করেছেন। তবে বেলুচদের স্বাধীনতার আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখে আসছে পাকিস্তান। [তথ্য সূত্র: দ্য নিউ আরব, হিন্দুস্তান টাইমস]

পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছে বেলুচিস্তানের হাজারা সম্প্রদায়ের নারী ও শিশুরা

বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের বেলুচরাই এখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। কারণ অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত বেলুচ নবপ্রজন্ম ৭০ বছরের অধিক সময় ধরে চলমান বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। স্বাধিকারের আন্দোলনকে বর্তমানে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আন্দোলনে পরিণত করেছে এই তরুণ প্রজন্মই। এ ছাড়া বেলুচিস্তানের মুক্তিসংগ্রামে শামিল হয়েছে কমপক্ষে ১২ টি রাজনৈতিক দল। বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ), বেলুচ রিপাবলিকান আর্মি (বিআরএ), বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্ট, ইউনাইটেড বেলুচ আর্মি (ইউবিএ), লস্কর-ই-বেলুচিস্তান (এল-ই-বি), বেলুচিস্তান লিবারেশন ইউনাইটেড ফ্রন্ট অন্যতম।

কার্যত বেলুচিস্তানে গৃহযুদ্ধ নয়; গণহত্যা চালাচ্ছে পাকিস্তান। ১৯৪৮ সাল থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রতিদিনই নিরীহ বেলুচদের হত্যা করে আসছে। ২০০৩ থেকে গাওদর গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের পরপরই সেনাবাহিনী হামলা ও নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে ‘কসাই’-খ্যাত টিক্কা খানও একসময় বেলুচিস্তানে নিরীহ মানুষদের হত্যাযজ্ঞে নিয়োজিত ছিলেন। বেলুচিস্তানে তার ওই কুখ্যাতির কারণেই তাকে ১৯৭১ সালে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। ১৯৭১ সালে বেলুচিস্তানের মুক্তিকামী মানুষ বাংলাদেশে পাক সেনাদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন। তারাও সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন দিয়েছিল।

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে পাক সেনাদের হাতে নিহত কয়েকজন বেলুচ স্বাধীনতাকামী

পৃথিবীর কোনও সংবাদমাধ্যমকেই বেলুচিস্তানে প্রবেশ করার অনুমতি দেয় না পাকিস্তান সরকার। এ কারণে এই ব্যাপক গণহত্যার খবর বাইরের বিশ্বে যায় না। যেটুকু যায় তাও আবার ঘটনা ঘটে যাওয়ার অনেক দিন পর। এ কারণে এসব সংবাদ বিশ্ব মিডিয়ায় তেমন একটা গুরুত্ব পায় না। প্রতিদিনই বেলুচিস্তানের কোনও না কোনও জায়গায় সেনা অভিযান চলছে। তারা নিরীহ মানুষকে মারছে, নয়তো তুলে নিয়ে যাচ্ছে। গত ১৬ বছরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে এক লাখ ৪০ হাজার নিরীহ বেলুচ নিহত হয়েছে। আর গুম হয়েছে ২৩ হাজারের বেশি ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী। রেহাই পাচ্ছে না নারীরাও। আগামী প্রজন্মের বৃদ্ধি রোধ করার জন্য নারী ও শিশুদেরও হত্যা করা হচ্ছে। বেলুচ নারীদের ওপর চালানো হচ্ছে পাশবিক নির্যাতন। পাকিস্তানি সেনারা সেখানে ‘ধরো, হত্যা করো আর গুম করো’- এই নীতিতে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিদিনই এ অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় গণকবরের সন্ধান মিলছে। আর তাতে পাওয়া যাচ্ছে ‘নিখোঁজ’ বেলুচদের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ। হাজার হাজার মুক্তিকামী বেলুচ রয়েছে যাদের প্রত্যেকের পরিবারের কেউ না কেউ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে খুন বা গুম হয়েছে।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ২৯ স্বাধীনতাকামী বেলুচ নেতাকর্মীকে এভাবেই গুলি করে ফেলে রাখে পাক সেনারা

২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর বিবিসি উর্দু বিভাগ থেকে প্রচারিত এক সংবাদে জানা যায়, বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটা, কালাত, খুজদার, মাকারানসহ বিভিন্ন এলাকায় গত ছয় বছরে বেশ কটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে এবং সেগুলোতে এক হাজার গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পাওয়া গেছে। নিহতদের স্বজনরা বিবিসিকে জানিয়েছে, এদের সবাই সেনাবাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর দীর্ঘদিন নিখোঁজ ছিল।

গত ৭০ বছরেরও অধিক সময় ধরে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায় বেলুচিস্তান অবহেলিত। ১৯৪৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বেলুচিস্তানের পার্লামেন্ট পাকিস্তানের সঙ্গে একত্রিতকরণের বিরোধিতা করে। কিন্তু ১৫ এপ্রিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রদেশটি জবরদখল করে। পাকিস্তানের সমগ্র ভূখণ্ডের ৪৬ ভাগ বেলুচিস্তানে। সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও এর জনসংখ্যা পাকিস্তানে সবচেয়ে কম।

সরকারি বিধি ব্যবস্থায় বৈষম্য এবং দারিদ্র্যের কারণে ক্ষুব্ধ বেলুচিস্তানের মানুষ। বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বেলুচিস্তানের মানুষ খুবই দরিদ্র। মাত্র ২৫ ভাগ মানুষ সেখানে শিক্ষিত। অথচ পাকিস্তানে শিক্ষার হার শতকরা ৪৭ ভাগ। বেলুচিস্তানের বেকারত্বের হার ৩০ ভাগ। পাকিস্তানের এক তৃতীয়াংশ গ্যাসের মজুদ বেলুচিস্তানে কিন্তু সেখানে অল্প কয়েকটি শহরে বিদ্যুত্ সরবরাহ আছে।

বেলুচদের অভিযোগ, বেশিরভাগ পরমাণু পরীক্ষা বেলুচিস্তানে চালানো হয়। তাদের খনিজ সম্পদ ব্যবহূত হচ্ছে পুরো পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে, অথচ বেলুচরা থেকে যাচ্ছে অবহেলিত। এ বৈষম্যের সর্বশেষ নমুনা গোয়াদার বন্দর। প্রদেশটির হাজার হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে অথচ বেলুচদের সেখানে সম্পৃক্ত করা হয়নি। প্রথম থেকেই বৈষম্য চলছে এই প্রদেশটির ব্যাপারে। পাকিস্তানের চার প্রদেশের অন্যতম বেলুচিস্তানে স্বাধীনতার আগ্নেয়গিরির আগুন সেই সাতচল্লিশ সাল থেকেই জ্বলছে!

বেলুচিস্তানে চীনা অর্থায়নে নির্মিত গোয়াদার বন্দর

একসময়ের ব্রিটিশ-শাসিত কালাত, খারন, মারখান ও লাসবেলা নিয়েই মূলত গঠিত বেলুচিস্তান। ১৯৪৮ সালে ‘কালাত’ চুক্তির মাধ্যমে বেলুচিস্তানের শাসকরা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। চুক্তিতে কেবল প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি-ইসলামাবাদের হাতে থাকার কথা ছিল। বাকি বিষয়গুলি বেলুচিস্তানের শাসকদের উপর ন্যস্ত রাখা হয়। আটচল্লিশে জিন্নাহর সঙ্গে বেলুচিস্তানের শাসকদের যে চুক্তি হয়, তা পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী মানেনি। পাকিস্তানি শাসকেরা সেনাবাহিনী পাঠিয়ে আরও অঞ্চল দখল করে বেলুচিস্তান নামক প্রদেশটি তৈরি করে।

পাকিস্তানি শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতা বেলুচরা মেনে নেয়নি। স্বাধীনচেতা বেলুচরা আটচল্লিশ সালেই পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে বহুবার বেলুচদের স্বাধীনতার সংগ্রাম দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে। তাতেও কোনো ফল আসেনি। যতবারই স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়েছে ততবারই পাকিস্তানি সেনারা বেলুচদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। স্বাধীনতার দাবিতে বেলুচরা এপর্যন্ত প্রায় দশবার পাকিস্তানের শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রতিবারই বেলুচ স্বাধীনতাকামী জনগণের উপর নির্মম দমননীতি প্রয়োগ করেছে।

পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের শিকার কয়েকজন স্বাধীনতাকামী বেলুচ নেতা

ভারত বিরোধীতা থেকে ‘কাশ্মীর দরদী’ সেজে মায়া কান্না না করে বাংলাদেশী পাকিপ্রেমীদের আগে দীর্ঘ ৭০ বছরের অধিক সময় ধরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মম নিপীড়নের শিকার বেলুচিস্তানের মুসলিম ভাইদের দিকে নজর দেওয়া উচিত। তবেই বাংলাদেশিদের মুসলিম ভ্রাতৃত্বের দাবি হালে পানি পাবে।

লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মন্তব্য