যেসব অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র নিজেই তৈরি করছে বাংলাদেশ

আমাদের অনেকেরই ধারণা বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী শুধু বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানি করে। তবে আমাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বাংলাদেশ নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নতমানের অস্ত্র তৈরি ও টর্ট কিনে নিজ দেশে বিশ্বমানের অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার করে থাকে। গাজীপুরে অবস্থিত সিকিউরিটি মেশিন টুলস ম্যানুফ্যাক্চারিং ফ্যাক্টরি, বাংলাদেশ অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি বিভিন্ন মান ও ধরণের অস্ত্র তৈরি করে থাকে।

যদিও প্রথম দিকে চায়না ও রাশিয়ার তৈরি অস্ত্র বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীগুলো বেশি ব্যবহার করতো। তবে এখন বিপুল পরিমানে অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইতালি থেকে প্রযুক্তি নিয়ে নিজ দেশেই তৈরি করছে। যা দেশের বিভিন্ন ডিফেন্স ফোর্স ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশ অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে পাকিস্তান আমলে। তখন তৎকালীন সরকারের কিছু টর্ট ক্রয় করে চায়নার নিকট থেকে যা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ পায়। সেসময় মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের একে-৪৭ রাইফেলর চায়না কপি টাইপ-৫৬ তৈরি করতো যা টাইপ-৫৬ অ্যাসল্ট রাইফেল নামে পরিচিত ছিল। তাছাড়া পাকিস্তান আমলে পশ্চিম জার্মানির হেকলার অ্যন্ড কচ অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে জিথ্রি-এ৪ মডেলের অ্যাসল্ট রাইফেলের টর্ট কিনে নেয় বাংলাদেশ, পরবর্তীতে যা তৈরি করা হয়। এছাড়া্ ব্যারেটার-৯২ ও চায়না নরিসকো কোম্পানির হ্যান্ডগান, মর্টার, ম্যানপ্যাড, মাইন, গ্রেনেড এবং কিছু ওয়্যার ফেয়ার ভেহিকেল তৈরি করে। আশা করা যাচ্ছে শীঘ্রই আমরা অস্ত্রের রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছি। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে যুদ্ধ বিমান তৈরিরও ঘোষণা দিয়েছেন।

আজ আমরা পাঠকদের জানাবো বাংলাদেশে কি কি সামরিক অস্ত্র তৈরি করছে। তো পাঠক চলুন জেনে নেওয়া যাক আমাদের দেশে কি কি সামরিক অস্ত্র তৈরি হচ্ছে_

১) বিডি-০৮ অ্যাসল্ট রাইফেল

চীনের সহায়তায় এটি বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় বানানো হয়। হাফ কিলোমিটারের অধিক দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে এটি আঘাত হানতে পারে। এই রাইফেলে সুইডেনের অত্যাধুনিক ক্যালোমিটার সাইট যুক্ত করা হয়েছে। যা এর লক্ষভেদ ক্ষমতা্ বৃদ্ধি করেছে। ভবিষ্যতে এতে দেশে তৈরি ক্যালোমিটার সাইট লাগানোর কাজ চলছে।

২) মেশিন গান

বিদেশ থেকে প্রযুক্তি কিনে বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় কয়েকটি মডেলের অত্যাধুনিক মেশিনগান বানানো হয়। এদের মাধ্যে বিডি-০৮ লাইট মেশিনগান, বিডি-১৪ মেশিনগান উল্লেখযোগ্য।

৩) আর্জেস-৮৪ গ্রেনেড

ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়া থেকে প্রযুক্তি কিনে বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় এই মডেলের গ্রেনেড বানানো হয়। এটা মান ও কার্যক্ষমতা প্রায় উন্নত বিশ্বের তৈরি গ্রেনেডের সমান।

৪) সাঁজোয়া যান

বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) জাপানি ইসুজু কোম্পানির প্রযুক্তি কিনে হুবহু একই ডিজাইনের আরমিনা বেলিয়ান মিলিটারি ট্রাক বানানো হয়। এছাড়াও আরও কয়েকটি মডেলের গাড়ি যেমন- মিৎসুবিশি পাজেরো, মিতসুবিশি ল্যান্সার, ল্যান্ড রোভার রিফাইন্ডার ইত্যাদি মডেলের গাড়ি বাংলাদেশেই অ্যাসেম্বল করা হয়।

৫) মর্টার ও কামানের গোলা

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রায় ৩৫০টিরও বেশি টাওয়েট কামান রয়েছে। এছাড়া মর্টার আছে প্রচুর। এগুলোর জন্য বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় ৬১ মিলিমিটার, ৮১মিলিমিটার ও ১০৫ মিলিমিটারের গোলা বানানো হয়।

৬) টহল জাহাজ

বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের জন্য বাংলাদেশে কয়েক মডেলের টহল জাহাজ তৈরি করে। এছাড়া স্পিডবোর্ড, গানবোট, সাবমেরিন ট্যাগবোটও বানানো হয়। পদ্মা ক্লাস ওপিভি, এটা বাংলাদেশের তৈরি প্রথম আধুনিক যুদ্ধজাহাজ। অস্ত্র হিসেবে এতে বিমানবিধ্বংসী ও ছোট জাহাজ বিধ্বংসী কামান আছে। শুনলে অবাক হবেন যে, মায়ানমারের বানানো ফ্রিগেটের চেয়ে বাংলাদেশের তৈরি এই ছোট পেট্রোল জাহাজগুলো অধিক গভীর সাগরে টহল দিতে পারে। এছাড়া যুদ্ধ অবস্থায় এতে মিসাইল যুক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে।

৭) ল্যান্ডিং ক্রাফট

Warship Made In Bangladesh দেশে তৈরি আর্মির সামরিক জলযান Homemade Bangladesh Army LCT

শত্রু দেশে নানা রকম সাঁজোয়াযান, সেনা ও অস্ত্র মোতায়েনের জন্য ল্যান্ডিং ক্রাফট এর জুড়ি নেই। বাংলাদেশ কয়েক মডেলের ল্যান্ডিং ক্রাফট তৈরি করে। তার মধ্যে রয়েছে হাতিয়া ক্লাস ল্যান্ডিং ক্রাফট সবচেয়ে উন্নত। এছাড়াও সেনাবাহিনীর জন্য বানানো আমাদের বিশেষ ল্যান্ডিং ক্রাফটটিতে হেলিকপ্টার ল্যান্ডিংয়েরও ব্যবস্থা রয়েছে।

৮) দুর্জয় ক্লাস এলপিসি

এগুলো বাংলাদেশের তৈরি সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ। আসলে এগুলো কর্ভেটোর মতো বড় ও উন্নত হলেও টেকনিকেল কারণে একে এলপিসি নামে ডাকা হয়। অস্ত্র হিসেবে এতে আছে একটি ৭৬ মিলিমিটার জাহাজবিধ্বংসী কামান, দুটি ২০ মিলিমিটার বিমানবিধ্বংসী কামান, ১২টা এন্টি সাবমেরিন রকেট লাঞ্চার এবং চারটি এন্টিশিপ মিসাইল। অনেক দেশের কর্ভেটোও এত শক্তিশালী নয়।

৯) দুর্গম ক্লাস যুদ্ধজাহাজ

এটি মূলত দুর্জয় ক্লাস যুদ্ধজাহাজের এন্টি সাবমেরিন ভার্সন। শত্রু সাবমেরিন খুঁজে বের করা ও তাকে চিরতরে সাগরে ডুবে দেওয়াই এর প্রধান কাজ। দুর্জয় ক্লাস জাহাজের মতো দুর্গম ক্লাস জাহাজও অনেক গভীর সাগরে টহল দেওয়ার মতো করে ডিজাইন করা হয়েছে। অস্ত্র হিসেবে এতে আছে একটি ৭৬ মিলিমিটার জাহাজবিধ্বংসী কামান, দুটি ৩০ মিলিমিটার বিমানবিধ্বংসী কামান ও ৬টি টর্পেডো লাঞ্চার রয়েছে।

১০) বাস ড্রোন

এটি বিএসিএ’তে বানানো গোয়েন্দা ড্রোন। বাংলাদেশের বানানো কয়েক মডেলের ড্রোনের মধ্যে এটাই সবচেয়ে উন্নত ভার্সন।

১১) টাইপ-৯২ পিস্তল

চীন থেকে থেকে কিউএসজেড-৯২ সেমি অটোমেটিক পিস্তলের প্রযুক্তি কিনে বাংলাদেশ এই পিস্তল তৈরি করে। এতে দুই ধরণের বুলেট ইউজ করা যায়। এর ম্যাগজিনে ৯ মিলিমিটার এবং ১৫ মিলিমিটার অথবা ৫.৮ মিলিমিটারের ২০ রাউন্ড গুলি রাখা যায়।

১২) মডিফায়েড ভেহিকেলস

বাংলাদেশ নিজেই কিছু কিছু যুদ্ধযানের আধুনিকায়ন ঘটায়। যেমন- টাইপ-৬২ এলিবেটিকে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরীতে মডিফাই করে এলপিসি ও এসপিসি বানানো হয়েছে। এছাড়াও টাইপ-৫৯ ট্যাঙ্কের আধুনিকায়নের মাধ্যমে টাইপ-৭২ এর সমকক্ষ করা হয়েছে। এছাড়া টাইপ-৫৪ মডেলের ট্যাঙ্ককে মডিফাই করে আইএফবি বানানো হয়েছে।

১৩) বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট

বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় উন্নতমানের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট বানানো হয়। যা ৭.৬২ মিলিমিটার নেট ও বুলেটের বিপরীতে পরীক্ষিত। ছাড়া বেসরকারিভাবে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট বানানো শুরু হবে।

এসব সমরাস্ত্রগুলো বাংলাদেশ সামরিক কারখানায় বানানো হয়। এছাড়া আরও যেসব সমরাস্ত্র বানানোর পরিকল্পনা আছে এবং বানানোর প্রক্রিয়া চলছে তার মধ্যে আছে, ১৫৫ মিলিমিটার কামানের গোলা, ১২২ মিলিমিটার গাইডেড রকেট, ডব্লিউ এস-২২ বানানো হবে। বিমানবিধ্বংসী মিসাইল এফএন-১৬ বিপুল পরিমাণে বানানো হবে।স্বাধীনতা ক্লাস করভেট বানানো হবে, যা এই অঞ্চলের সবচেয়ে আধুনিক কর্ভেটের মাঝে অন্যতম। এছাড়া ২০২১ সালের মাঝে জেট ইঞ্জিন চালিত ট্রেইনার ও গ্রাউন্ড অ্যাটাক বিমান তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়াও ২০২২ সালের মধ্যে স্টেলথ ফ্রিগেট বানানো শুরু হবে। আর একটি খুশির খবর হলো বাংলাদেশ স্বল্প পাল্লঅর এন্টিশিপ মিসাইল প্রযুক্তিসহ কিনতে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে চায়না সি-৭০৪ মিসাইল কেনা হতে পারে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

মন্তব্য