শিবিরের ‘খপ্পরে’ অস্তিত্ব সংকটে ছাত্রলীগ!

টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও জনসমর্থিত দল আওয়ামী লীগের জন্য প্রধান মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলটির ছাত্রসংগঠন ‘ছাত্রলীগ’। নানা চক্রান্তের শিকার হয়ে একের পর এক বিতর্কের জন্ম দিয়ে চলেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এই ছাত্রসংগঠনটি।প্রধানমন্ত্রী ও ছাত্রলীগের সাংগঠনিক অভিভাবক শেখ হাসিনা বারবার ছাত্রলীগের পদস্থলনে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এরপর ছাত্রলীগের কার্যক্রম অনুসন্ধানের ও পর্যবেক্ষণে আওয়ামী লীগের একাধিক কমিটি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার নিজস্ব টিম দিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ছাত্রলীগের কার্যক্রম মনিটরিং ও পর্যালোচনা করেছে। তবে কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না বিতর্কিত কর্মকাণ্ড।

ছাত্রলীগের ব্যাপারে এসব কমিটি ও গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধান ও রিপোর্ট পর্যালোচনা করে যে ফলাফল দেখা যাচ্ছে সেটা অত্যন্ত ভয়াবহ। রিপোর্ট বলছে ছাত্রলীগকে গিলে ফেলেছে মৌলবাদি ও সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রশিবির।

বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রশিবিরের কার্যক্রমগুলো আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে যায়। এই সময়ে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে দলে দলে ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করে। এমনকি ভিভিন্ন কৌশলে তারা ছাত্রলীগের পদ-পদবীও দখল করে নেয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, বিশেষ করে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০১২ এর পর থেকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ছাত্রলীগে যোগদান করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, ছাত্রশিবিরের পরিচয় গোপন রেখে নতুন শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ হিসেবে যোগদান করানো হয়েছে।’

এই অনুপ্রবেশকারীরাই পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অপকর্ম করে ছাত্রলীগের ইমেজ নষ্ট করে সরকারকে বিপদে ফেলতে চাইছে। সম্প্রতি বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে মারার ঘটনায় উত্তাল সারাদেশ। বিভিন্ন মহল থেকে ব্যাপক সমালোচনার তীর ধেয়ে আসছে ছাত্রলীগের দিকে। অনেকে তো ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধের দাবিও তুলছেন। আর এ সবই ঘটছে একটা পরিকল্পিত নীলনকশা অনুসারে। সেটা হচ্ছে ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্ণিত করে নিষিদ্ধ করা বা কম হলেও সন্ত্রাসী সংগঠনের তকমা দিয়ে শিবিরের পর্যায়ে নামিয়ে আনা। আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের অন্তত তিন জনের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতার তথ্য-প্রমান পেয়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। এরা হলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন।

২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই মারা গেছেন ৩৯ জন। অপরদিকে ছাত্রলীগের হাতে প্রাণ গেছে ১৫ জনের। যে ৩৯ জন ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারা গেছে তাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে এগুলোর পেছনে ছিল ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশকারীরা। অপরদিকে ছাত্রলীগের হাতে যে ১৫ জনের প্রাণহানী হয়েছে সেখানেও দেখা গেছে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের কেউই ছাত্রলীগের প্রকৃত নেতাকর্মী নন। তারা বিভিন্ন সময়ে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল থেকে ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করে অপকর্মগুলো ঘটিয়েছে।

২০০৯ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীন কোন্দলের শিকার হন ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষার্থী আবুল কালাম আজাদ। তাকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। পরে এ নিয়ে গঠিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, ছাত্রশিবির থেকে আসা কিছু লোকজন এই ঘটনা ঘটিয়েছে।

২০১০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নসরুল্লাহ নাসিম হত্যাকাণ্ডের পেছনেও ছাত্রশিবির থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী ছাত্রলীগ কর্মীরা ছিল বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী নিজেও ছাত্রলীগের বিগত কমিটি গঠনের পরে ছাত্রলীগের এই অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এই সময়ে দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আনুষ্ঠঅনিকভাবে এটাও বলেছিলেন যে, ছাত্রলীগের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছাত্রশিবির অনুপ্রবেশ করেছে ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর ছাত্রশিবির দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের কর্মীদের ছাত্রলীগে প্রেরণ করে। এবং নিজেদের সংগঠন গুটিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যে থেকে বিভিন্ন অপকর্ম করার জন্য দলীয় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা তাদের সন্তানদের ও ডেডিকেটেড শিবিরকর্মীদের ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ ঘটায়। এ সমস্ত অনুপ্রবেশকারীদের মূল কাজ হলো ছাত্রলীগ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থেকে ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম পরিচালনা করা ও সময়-সুযোগ বুঝে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে ছাত্রলীগ ও সরকারকে বেকায়দায় ফেলা।

এ বিষয়টি স্বীকার করে আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেছেন, ‘কাউকে মেরে ফেলা, রগ কাটার মতো বিষয়গুলো শিবিরের সংষ্কৃতি। এগুলো ছাত্রলীগের সংষ্কৃতি নয়। কাজেই এ ধরণের সংষ্কৃতি ছাত্রলীগে আমদানি হওয়াটা একটি বিস্ময়কর ব্যাপার।’

ছাত্রলীগের বিগত কমিটিতে প্রথম ছাত্রশিবিরের অনুপ্রবেশের ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। শোভন-রাব্বানীর কমিটি যখন হয় তখন এদের বাদ দেওয়ার কথা থাকলেও দলে তারা এত শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করেছিল যে বাদ দেওয়া সম্ভবপর হয়নি। এখনও ছাত্রশিবিরের একটা বড় অংশ ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দলের নেতৃত্বে আছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শুধু শিবির নয়, ছাত্রদলেরও একটা বড় অংশ ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করে ২০১৪-১৫ সালে। এরাও ছাত্রলীগের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে বিভিন্ন অপকর্ম ঘটাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ছাত্রলীগের শিবিরকরণের যে পরিকল্পিত নীলনকশা সেটা যদি এখনই ভেস্তে দেওয়া না হয় তাহলে ছাত্রলীগের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

One thought on “শিবিরের ‘খপ্পরে’ অস্তিত্ব সংকটে ছাত্রলীগ!

  1. বর্ণালী ইসলামিক মিডিয়া

    - Edit

    Reply

    বেটা নিজের দোষ অন্যের উপর দাও। ছাত্র শিবিরের একটি কর্মিও ছাত্র লীগে যাবে না। জীবন থাকতে তাদের মুখ থেকে একটি বারের জন্য জয় বাংলা জয় বংগ বন্ধু শ্লোগান আসবেনা। বেটা মিথ্যা কথা আর কত বলবা। তোদের একদিন বিচার হবে ইনশাআল্লাহ

মন্তব্য