আপডেট : ২৭ অক্টোবর, ২০২০ ১২:৫৪

‘অপারেশন গুলমার্গ’ কাশ্মীরে পাকিস্তানের নৃশংসতা

অনলাইন ডেস্ক
‘অপারেশন গুলমার্গ’ কাশ্মীরে পাকিস্তানের নৃশংসতা

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণে ১৯৪৭ সালে রাজা শাসিত কাশ্মীরে যে লাখ লাখ হিন্দু, শিখ ও মুসলমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, জীবন দিয়ে হানাদারদের পরাজিত করেছেন, তাদের স্মরণে ২২ অক্টোবর জম্মু ও কাশ্মীরে ‘কালো দিবস’ পালন করুন। এই ডাক দিয়েছে জম্মু-কাশ্মীর ইউনিটি ফাউন্ডেশন।

এদিকে দিবসটি উপলক্ষে ঢাকায় বেশকিছু বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় শাহবাগ জাতীয় যাদুঘরের সামনে। ১৯৪৭ সালে কাশ্মীরে পাকিস্তানী বাহিনী যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল তা উঠে এসেছে আলোকচিত্রে। ওই হত্যাযজ্ঞের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দেওয়া কোড নাম ছিল ‘অপারেশন গুলমার্গ’ । ২২ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রদর্শনীটি দর্শকদের জন্য উম্মুক্ত ছিল।

একইসঙে প্রদর্শিত হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে নির্মম হত্যাযজ্ঞের আলোকচিত্র। মহান মুক্তিযুদ্ধে  একই পাকিস্তান বাহিনীর হাতে বাংলাদেশের ত্রিশ লাখ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিল। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের কোড নাম দিয়েছিল  ‘অপারেশন সার্চলাইট’

ট্রিবিউন নিউজ সার্ভিস জানায়, ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবরের পাকিস্তানি ওই আগ্রাসনকে অনেকে কাশ্মীরি উপজাতীয়দের আক্রমণ বলে বর্ণনা করে।

ইউনিটি ফাউন্ডেশন ‘উপজাতীয় হামলা নয়-পাকিস্তানের সামরিক আক্রমণ’ শীর্ষক সেমিনার করে চলেছে। ২২ অক্টোবর জম্মু প্রেস ক্লাবে হবে সপ্তম সেমিনার।

জম্মু-কাশ্মীর ইউনিটি ফাউন্ডেশন সভাপতি অজত জামওয়াল বলেন, সেমিনারে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতার চিত্র তুলে ধরা হবে। এটা এখন খুব দরকার। কারণ পাকিস্তান এখনো সন্ত্রাসী পাঠিয়ে কাশ্মীরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইছে। সন্ত্রাসীরা এখানে ‘সিভিল কারফিউ’ জারি করছে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত করছে।

জামওয়াল বলেন, পাকিস্তান ১৯৪৭, ১৯৬৫ আর ১৯৯৯ সালে সন্ত্রাসী ঢুকিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরে গোলযোগ সৃষ্টি করেছে। এখনো দেশটি ‘জিহাদ’-এর নামে উপজাতীয়দের জড়ো করছে। তার সৈন্যদের উসকানি দিচ্ছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সম্প্রতি জাতিসংঘে যে ভাষণ দিলেন তাতেও ধরা পড়েছে যে, ৭২ বছরেও পাকিস্তানের আগ্রাসী মানসিকতা একটুও বদলায়নি।

কাশ্মীর উপত্যকায় যারা রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করছে, শান্তি নষ্ট করছে, তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য রাজ্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানায় ইউনিটি ফাউন্ডেশন।

১৯৪৭-এর ২২ অক্টোবর পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের উপজাতি মিলিশিয়াকে জম্মু ও কাশ্মীরে ঢুকিয়ে দিয়ে শুরু করে ‘অপারেশন গুলমার্গ’। পুরোটাই পাকিস্তানি সরকারের মদদে পাক-ফৌজদের নেতৃত্বে পাকিস্তানি জনজাতিদের মাধ্যমে কাশ্মীর দখলের লড়াই। মুজাফফরাবাদ, ডমেল ও উড়ি দখলের পর তারা ২৬ অক্টোবর পৌঁছায় বারামুলা। পাকিস্তানি সেনা কর্তাদের নেতৃত্বাধীন দুর্বৃত্তরা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে বারামুলাকে। তাদের সেই নৃশংসতার কাহিনি শুনে ৭৩ বছর পরও মানুষ চমকে ওঠে। বারামুলায় পাকিস্তান কী সর্বনাশা অত্যাচার চালিয়েছিল তার বর্ণনা রবার্ট ট্রামবুল ১০ নভেম্বর নিউইয়র্ক টাইমসে তুলে ধরেছিলেন।

বারামুলার যাবতীয় সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ভারতীয় সেনারা সেখানে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত সেখানকার তরুণীদের ধর্ষণ করেছিল হানাদাররা। গোটা শহরটাকেই প্রায় মানবশূন্য করে তুলেছিল তারা। ছোট্ট শহরটির প্রায় ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করে পাক-সেনার হাতে গড়া উপজাতি জঙ্গিরা। হানাদারদের হাতে প্রাণ হারান শহরের মানুষদের পাশাপাশি ইউরোপীয় চার নাগরিকও। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ আর্মি অফিসার কর্নেল ডিক ও তার গর্ভবতী স্ত্রীকেও হত্যা করে কাশ্মীর দখলের লোভে উন্মাদ হামলাবাজরা। মাহসুদ উপজাতিদের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পায়নি গির্জাও। ২৬ অক্টোবর জোসেফের ফ্রান্সিসকান কনভেন্টের ভিতরে ঢুকে তারা লুটপাট চালায়। হাসপাতাল ও চার্চকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। চারজন নান ছাড়াও কর্নেল ডিক ও তার স্ত্রীকে হত্যা করে হানাদাররা। ৩৫০ জন স্থানীয় হিন্দুকে একটি ঘরের ভিতর ঢুকিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। বারামুলা আক্রান্তের ২৪ ঘণ্টা পরই ভারতীয় সেনা পৌঁছায় শহরে। কিন্তু তার আগেই শহরটির ১৪ হাজারের জনবসতি কমে দাঁড়ায় ১ হাজারে। পাকিস্তানি হানাদাররা শহরটাকেই জনমানবশূন্য করে তোলে। এপির ফটোগ্রাফার ম্যাক্স ডসপটের বর্ণনা অনুযায়ী, ২ নভেম্বর ২০টির বেশি গ্রাম তিনি জ্বলতে দেখেছেন। বারামুলা থেকে ২০ মাইল দূরে শ্রীনগরে বসেও সেই ভয়ঙ্কর আগুন দেখা গেছে। হানাদাররা ব্যাপক সন্ত্রাস ও ধ্বংসপ্রক্রিয়া চালাতে চালাতেই শ্রীনগরের উদ্দেশে অগ্রসর হতে থাকে। সেই ধ্বংসের ১০ দিন লন্ডনের ডেইলি এক্সপ্রেস কাগজের সিডনি স্মিথ বারামুলা হাসপাতালেই ছিলেন। তিনিও পাকিস্তানি হানাদারদের নিয়ে নিজের প্রতিবেদনে ধ্বংসের ছবি তুলে ধরেন।

উপরে