আপডেট : ১৯ মে, ২০১৬ ০৭:৫৯

অর্পিত সম্পত্তি হয়রানিতে বীরশ্রেষ্ঠর পরিবারও

বিডিটাইমস ডেস্ক
অর্পিত সম্পত্তি হয়রানিতে বীরশ্রেষ্ঠর পরিবারও

দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন মতিউর রহমান। অসীম সাহসিকতার জন্য তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি দেওয়া হয়েছে। এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের মহিমা শুনিয়ে শিশু-কিশোরদের দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত করা হয়। সেই মতিউরের স্ত্রী মিলি রহমান কর্মকর্তাদের খামখেয়ালির শিকার হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। গত দুই বছরে তিনি ৩২ দফা সচিবালয়ে গিয়েছেন। গাজীপুর জেলা প্রশাসনে ধর্না দিয়েছেন এর চেয়েও বেশি সংখ্যকবার। 

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন অনুযায়ী যেসব সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সরকার লিজ দিচ্ছে সেসব ‘ক’ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত। আর যেসব সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই কিন্তু অর্পিত সেগুলো ‘খ’ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত। মিলি রহমানের পিতা মনিরুজ্জামান খানসহ মোট পাঁচজন মিলে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার কৌচাকুরিতে আট একর জমি কেনেন। মিলি রহমানের আটজন ভাইবোন উত্তরাধিকার সূত্রে এ জমির মালিক হন। আর্থিক কারণে এ জমির ১ দশমিক ৩৫ একর বিক্রি করে দেন তাঁরা। এই জমির নামজারি করতে গেলে ক্রেতাকে জানানো হয় নামজারি হবে না। কারণ হিসেবে বলা হয়, এ জমি অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তফসিলভুক্ত। আকাশ ভেঙে পড়ে মিলি রহমানের মাথার ওপর। তাঁরা বুঝতেই পারছেন না হালনাগাদ খাজনা পরিশোধ করা জমি কিভাবে অর্পিত সম্পত্তি হয়। তাও আবার ‘ক’ তফসিলভুক্ত। যে তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে শুধু অর্পিত হলেই চলবে না, সরকারের দখলে থাকতে হবে এবং সরকার কর্তৃক লিজ দেওয়া হতে হবে। এসব শর্তের কোনোটিই পূরণ না হওয়ায় মিলি রহমান ভেবেছেন কোনো একটা ভুলে হয়তো এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি শুরু করেন নেপথ্য কারণ খুঁজতে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করলেই হয়তো  বিষয়টির নিষ্পত্তি করা যাবে। তিনি ছুটলেন গাজীপুরে। দেখা করলেন তৎকালীন ডিসি মো. নুরুল ইসলামের সঙ্গে। সেখানে জটিলতা সমাধানের পথ পেলেন না। গাজীপুর ঘুরে ক্লান্ত হয়ে তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন। এখন যিনি মন্ত্রিপরিষদের সচিব হয়ে প্রশাসন চালাচ্ছেন, সেই মোহাম্মদ শফিউল আলমের সঙ্গে দেখা করেছেন তিনি যখন ভূমিসচিব ছিলেন। এ ছাড়া সরকারের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। এসব দৌড়াদৌড়ির ফল হচ্ছে শুধুই আশ্বাস। কেউ সমস্যার সমাধান করে দিতে পারলেন না।

ওপর মহলের তৎপরতার কারণে গাজীপুরের তৎকালীন ডিসি মো. নুরুল ইসলাম ২০১৪ সালের ১৯ আগস্ট ভূমি মন্ত্রণালয়কে জানান, বাস্তবে ভূমি আবেদনকারীর দখলে রয়েছে। সরকার লিজ দিয়েছে বা লিজ গ্রহীতার কাছ থেকে লিজের টাকা নিয়েছে এমন কোনো তথ্য গাজীপুরে নেই। তবে এই জমির মাত্র শূন্য দশমিক ৮৪৫০ একর ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আর অবশিষ্ট ৮ দশমিক ১১৫ একর জমি নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার অনেক পর ‘ক’ তফসিলে অন্তর্ভুক্তির জন্য গাজীপুর জেলা প্রশাসন থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিসের ভিত্তিতে এ জমি ‘ক’ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এর ব্যাখ্যায় গাজীপুরের তৎকালীন ডিসি মন্ত্রণালয়কে জানান, ভিপি মিস কেস রেজিস্টার অনুযায়ী ৮ দশমিক ৯৬ একর জমি অর্পিত সম্পত্তির বাদ পড়ার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনে ৮ দশমিক ১১৫ একর জমি রেকর্ড অনুসারে নিষ্পত্তি করে দেওয়ার মতামত দেওয়া হয়। মিলি রহমান জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ৮ দশমিক ১১৫ একর জমির মালিকানা নিষ্পত্তি করে দেওয়ার আবেদন জানান ভূমি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব বরাবর। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ২ জুন  ভূমি মন্ত্রণালয় বাদ পড়া সম্পত্তি ‘ক’ তফসিলভুক্ত না করার নির্দেশ দেয়। ভূমি মন্ত্রণালয় নিষ্পত্তি করে দিলেও এবার শুরু হয় ভূমি কর্মকর্তাদের হয়রানি। সীমানা নির্ধারণের প্রশ্ন এলে জেলার সার্ভেয়ার নানা টালবাহানা করেন। একপর্যায়ে গাজীপুর থেকে জানতে চাওয়া হয় তারা কী করবে তা ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নেই। এই চিঠির অনুলিপি চাইলে গাজীপুর ডিসি অফিস থেকে মিলি রহমানকে কোনো সহায়তা করা হয়নি। মিলি রহমান আবার সচিবালয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেন। মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে বলা হয়, ‘ফাইল ওপরে গেছে, নিচে নামলে জানানো হবে।’ সেই ফাইল আজও নিচে নামেনি। কারণ মিলি রহমানকে কিছু জানানো হয়নি। 

গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের অসহযোগিতার কারণ হচ্ছে তত দিনে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নুরুল ইসলাম পদোন্নতি পেয়ে গাজীপুর থেকে বদলি হয়ে গেছেন। আর ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমও পদোন্নতি পেয়ে মন্ত্রিপরিষদের সচিব হয়েছেন। তাঁরা দুজন চলে যাওয়ার পর এই দুই অফিস থেকে কোনো সহায়তা পাননি মিলি রহমান।

মিলি রহমান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। এসব হয়রানির বিষয়ে তিনি বলেন, “‘ক’ তালিকার অর্পিত সম্পত্তি হতে হলে সরকারের দখলে থাকতে হবে। আমাদের সম্পত্তি তো আমাদের দখলে রয়েছে। তাহলে এই সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তফসিলভুক্ত হলো কিভাবে? যাই হোক, এই সংকটের সুরাহা দরকার। অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মতো আমরাও হয়রানির শিকার হচ্ছি।”

শুধু মিলি রহমান নন, এমন সংকট নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে আরো অনেকেই। সুনন্দন কুমার বণিকের ১০ শতাংশ জমি ‘ক’ ও ‘খ’ উভয় তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি ধামরাই তহশিল অফিস এবং ঢাকা ডিসি অফিস ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। সুনন্দন কুমার বণিকবলেন, “মতিউর রহমানের স্ত্রীর যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আমাদের মতো আমজনতার অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। উত্তরাধিকার সূত্রে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার ভারিলিয়া মৌজায় ১০ শতাংশ জমি আমরা পেয়েছি। আমার দাদার নামে এ জমি রেকর্ড হয়েছে সিএস পর্চায়। এসএ পর্চায় এ জমির মালিক আমার বাবা। আরএস পর্চায়ও আমরা মালিক। বর্তমান সরকার অর্পিত সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার আইন করলে আমরা আশাবাদী হয়ে উঠি। আমাদের জমি প্রথমে ‘খ’ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যথাযথ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছি। মামলায় আমরা জিতে যাই। এরপর নামজারি করতে ধামরাই তফসিল অফিসে যাই। তখন ধামরাই তহশিল অফিস জানায়, এটা ‘ক’ তফসিলেও অন্তর্ভুক্ত। এটা কিভাবে সম্ভব? একই জমি ‘ক’ ও ‘খ’ উভয় তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয় কিভাবে? আমরা ভূমি অফিসে গেলে কর্মকর্তারা এটা সেটা বলে ফিরিয়ে দেন।”  

গাজীপুরের মাখন চন্দ্র বর্মণ হয়রানির প্রতিকার পেতে হাজির হয়েছিলেন ভূমিমন্ত্রীর দপ্তরে। তিনি জানান, তাঁর পিতা কখনো ভারতে বসবাস করেননি। এ দেশে থাকা অবস্থায় তিনি মারা গেছেন। তাঁদের জন্মনিবন্ধন, ভোটার তালিকা, ওয়ারিশ সনদ সব কিছুই রয়েছে। তার পরও তাঁদের এক একর জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর সম্পত্তিও ‘খ’ তফসিলে ছিল। মামলায় জেতার পর তাঁর জমিটি ‘ক’ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মাখন চন্দ্র বর্মণ ভূমিমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, যাঁরা সরকারি চিন্তা-চেতনার সরাসরি বিরুদ্ধাচরণ করেন তাঁরা কিভাবে সরকারি চাকরি করেন। সরকার চায় বৈধ মালিকদের হয়রানি লাঘব করতে। আর ভূমি প্রশাসনের মারপ্যাঁচে বৈধ মালিকরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এভাবে তো চলতে পারে না। তিনি বলেন, ‘এ জন্য তো আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করিনি।’

 ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, সরকার অর্পিত সম্পত্তি-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় সুরাহা করার জন্য দফায় দফায় নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু উদ্যোগগুলো বাস্তব রূপ পায় না। উল্টো এসব উদ্যোগে সংশ্লিষ্টদের হয়রানি বেড়েছে। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন সংশোধন করার জন্য এ পর্যন্ত ছয় দফা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিবারই মন্ত্রিসভা বৈঠক থেকে আইনটি ফেরত আসে। মন্ত্রীদের তীব্র বাধার কারণে আইনটি সংশোধন করা যাচ্ছে না। কিন্তু কোনো মন্ত্রীই বুঝতে পারছেন না এই আইনটি সংশোধন করা সম্ভব না হলে মাঠপর্যায়ে অর্পিত সম্পত্তির যে সংকট তা সুরাহা করা যাবে না। কাজেই আইনটি সংশোধন করা জরুরি।

ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ বলেন, ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বছর মন্ত্রিসভা বৈঠক থেকে ফেরত আসার পরদিনই আমরা আইনটি সংশোধন করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমি যত দূর জানি আইন মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।’

সূত্র-কালের কণ্ঠ

জেডএম

উপরে