আপডেট : ১ মে, ২০১৬ ০৮:২৬

পরিকল্পনার অভাবে যুবশক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ

বিডিটাইমস ডেস্ক
পরিকল্পনার অভাবে যুবশক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ

দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বয়স ১৫ থেকে ৫৪ বছরের সীমায়, যাদের কর্মশক্তি কাজে লাগিয়ে সহজেই উন্নতির উচ্চপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বাংলাদেশ। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে এই বিপুল পরিমাণ তরুণ ও যুবশক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। কাজের জোগান না থাকায় তারুণ্য শক্তির অপচয় ঘটছে, দক্ষতা না থাকায় কর্মজীবীদের উৎপাদনক্ষমতাও প্রায় শূন্যের কোঠায়। তাদের দক্ষ করে তোলার বিষয়ে এত দিন সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যদিও সম্প্রতি মানবসম্পদ উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছে সরকার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্যে প্রথম বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার বোনাসকাল নজরে আসে। ওই শুমারির তথ্য মতে, মোট জনশক্তির ১৮.৮ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছর। ৩৭.৬ শতাংশের বয়স ২৫ থেকে ৫৪ বছর। সে হিসাবে দেশের ৯ কোটিরও বেশি মানুষের বয়স এখন ১৫ থেকে ৫৪ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ ১৬ কোটি মানুষের বয়সের মধ্যমা সূচক মাত্র ২৬ বছর। বাংলাদেশের জনসংখ্যার এ বোনাসকাল আগামী ৩০-৪০ বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রতিবেদনে অবশ্য কর্মক্ষম হিসেবে ৬৪ বছর পর্যন্ত বিবেচনা করা হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছর। এরা দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৬৬ শতাংশ। দেশের ৪৯ শতাংশ মানুষের বয়স এখন ২৪ বছরের নিচে। সংস্থাটির মতে, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১২ কোটি ৯৮ লাখে (জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ) পৌঁছাবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপুল এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। উচ্চতর প্রবৃদ্ধির পথে উত্তরণের জন্য বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। না হলে বিপুল জনগোষ্ঠীর শ্রমশক্তি সম্পদের বদলে দেশের জন্য বোঝা হয়ে দেখা দেবে।

বাংলাদেশে মানবসম্পদ উন্নয়নে ১৯৮১ সালে একবার সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জনশক্তিকে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে ভারত, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের এগিয়ে যাওয়ার চিত্র থেকে ২০১১ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল (এনএইচআরডিএফ)’ গঠনের উদ্যোগ নেয়। সেটিও গত পাঁচ বছর পড়ে ছিল অবহেলায়। অবশেষে গত ফেব্রুয়ারি থেকে মানবসম্পদ উন্নয়নে জোরালো মনোযোগ দিয়েছে সরকার। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বড় বরাদ্দ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। জানা যায়, অবহেলায় পড়ে থাকা তহবিল গঠনের উদ্যোগটি সচল হয়েছে। তহবিলের আওতায় নতুন চাকরিতে প্রবেশকারীদের দক্ষতা উন্নয়নে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে। বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরি প্রাপ্তিতে সহায়তা করা হবে। কর্মরতদের দক্ষতা বাড়াতেও কাজ করবে এই তহবিল। দরিদ্রদের প্রশিক্ষণে উত্সাহী করতে থাকবে প্রশিক্ষণ ভাতা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মালয়েশিয়া জনশক্তির দক্ষতা উন্নয়নে ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন’ নামে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করেছে ১৯৫৭ সালে। দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রমবাজার উন্নয়ন ও বিশ্লেষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে এ মন্ত্রণালয়। সুনির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়নে ১৯৯৩ সালে হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (এইচআরডিএফ) গঠন করেছে মালয়েশিয়া। শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে দক্ষ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে ১৯৮৫ সালে ভারতও গঠন করেছে একই ধরনের মন্ত্রণালয়। ২০০৯ সালে দেশটি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন তহবিলও গঠন করেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন তাদের জনসংখ্যার বোনাসকাল কাজে লাগাতে পারেনি। ফলে একসময় বেশি জনশক্তিই দেশটির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তখন বাধ্য হয়ে এক সন্তান নীতি গ্রহণ করে তারা। তবে ২০০০ ও ২০০৮ সালে মন্দায় পড়ার পর দেশটি মানবসম্পদ উন্নয়নে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করে দেশের জনশক্তিকে দক্ষ করে তোলায় মনোযোগ দিয়েছে। এক সন্তান নীতি থেকেও বের হয়ে এসেছে।

কর্মক্ষম মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সরকার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি বাড়াচ্ছে। কিন্তু এ শিক্ষা দিয়ে উন্নয়ন হবে না। শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। শিক্ষিতরা যাতে সত্যিকার অর্থে দক্ষ হয়ে ওঠে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০ লাখ শ্রমিক বিদেশে গিয়ে বছরে মাত্র ১৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। অথচ অল্প কিছু দক্ষ জনবল অন্য দেশ থেকে বাংলাদেশে এসে বছরে পাঁচ-ছয় বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে। তাই সরকারকে দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে নজর দিতে হবে।

হোসেন জিল্লুর রহমান আরো বলেন, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই বেশি। দক্ষ করে তুলতে পারলে তারা শুধু দেশের ভেতরে উৎপাদন বৃদ্ধিতে নয়, বিদেশে গিয়েও এখনকার চেয়ে অনেক বেশি রেমিট্যান্স আয় করতে পারবে।

ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, বেকারত্ব দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু কারখানাগুলোতে দক্ষ মিড লেবেল ম্যানেজমেন্ট পাওয়া যাচ্ছে না। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা থেকে লোক এনে নিয়োগ দিতে হচ্ছে। দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশের শ্রমিকদের উৎপাদনক্ষমতা ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ভারতের শ্রমিকের চেয়েও অনেক কম। তাই সরকারের উচিত, দেশের কর্মক্ষম মানুষকে উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা। না হলে জনসংখ্যার বোনাসকাল বিফলে যাবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, সরকার মানবসম্পদ উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। জনসংখ্যার বোনাসকাল ব্যবহার করে সরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ না করেও দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সরকার এ কৌশল নিয়েছে। যেসব বিনিয়োগ রয়েছে, তার গুণগত মান রক্ষা করে সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে। এ জন্য জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে হবে। সরকার এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সব ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে।

তবে জানা যায়, বাংলাদেশে মানবসম্পদ উন্নয়নে আলাদা কোনো মন্ত্রণালয় গঠনের পরিকল্পনা নেই সরকারের। ২০১১ সালে জাতীয় উন্নয়ন দক্ষতা নীতি প্রণয়ন করেছে সরকার, যার আওতায় অর্থ বিভাগের অধীন জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই তহবিলটি কম্পানি আইনের অধীনে নিবন্ধিত হবে এবং সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও ভারতীয় তহবিলের মতো বেসরকারি অংশগ্রহণে পরিচালিত হবে। অর্থসচিব পদাধিকারবলে তহবিল পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান হবেন। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি খাত থেকে পাঁচজন করে সদস্য থাকবেন। শুরুতে সরকারের অর্থ ও বেসরকারি খাতের অনুদান নিয়ে তহবিল পরিচালিত হবে। তবে তহবিল কার্যক্রম শুরুর পাঁচ বছর পর বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর এ তহবিলের আওতায় চার্জ আরোপ করা হবে। চার্জ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয়ের অর্থ সহায়তা হিসেবে দেবে এ তহবিল।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি এ তহবিল গঠন নিয়ে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে কর্মশালার আয়োজন করে সরকার। সেখানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের সচিব ছাড়াও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কান্ট্রি ডিরেক্টর কাজুহিকো হিগুচি, সুইজারল্যান্ডের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বিয়েইট এলসেইসর, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রতিনিধি ভ্লাদিমির গাসকভ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। কর্মশালায় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল প্রতিষ্ঠায় এডিবি সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বক্তারা বলেন, বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে দক্ষতা উন্নয়নে এ ধরনের তহবিল রয়েছে। দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম নিশ্চিতভাবেই শ্রমিকের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশেরও দ্রুত জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগী হওয়া জরুরি।

অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে খাতওয়ারি অ্যাপ্রোচ চালুর জন্য একটি সমন্বিত অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা দরকার। বর্তমানে ২২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ দক্ষতা উন্নয়ন-সংক্রান্ত কার্যক্রম পৃথকভাবে পরিচালনা করছে। চলতি বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। তবে একক মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত না হওয়ায় এ কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন সম্ভব হচ্ছে না। বেসরকারি খাতের নেওয়া দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্পদের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তাই দক্ষতা উন্নয়নে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ ও নিরবচ্ছিন্ন অর্থায়ন নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র-কালের কণ্ঠ

জেডএম

উপরে