আপডেট : ২১ এপ্রিল, ২০১৬ ১২:৪৫

গ্রেফতার অভিযানে দুদক;আত্মগোপনে আসামিরা

অনলাইন ডেস্ক
গ্রেফতার অভিযানে  দুদক;আত্মগোপনে আসামিরা

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা নিজস্ব মামলা রয়েছে প্রায় ৩ হাজার। এর বাইরে আদালত, থানা ও বিভিন্ন দফতর থেকে প্রায় ১৫ হাজারের মতো মামলা রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি দমন সংস্থাটিতে তদন্তের জন্য এসেছে।

দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব মামলায় আসামি প্রায় ২০ হাজার। এর মধ্যে জামিনের বাইরে আছেন প্রায় ৮ হাজার আসামি। এসব আসামিদের বেশিরভাগ দুদকের গ্রেফতার এড়াতে গা ঢাকা দিয়েছেন।

দুদকের চলমান গ্রেফতার অভিযানে অনেক আসামিকে তাদের নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাচ্ছেন না দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তারা। গ্রেফতার অভিযানে থাকা কয়েকজন তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।

মামলার তদন্তকারী দুদক কর্মকর্তারা মনে করছেন, সাম্প্রতিক গ্রেফতার অভিযানের খবরে অনেক আসামিই পালিয়েছেন। তবে এর মধ্যেও বিভিন্ন কৌশলে আসামিদের গ্রেফতার করছেন দুদকের কর্মকর্তারা। কোনো ঘটনায় এককভাবে, কোনোটায় পুলিশের সহযোগিতায়।

গত ১৪ মার্চ ইকবাল মাহমুদ দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেওয়ার পরই দীর্ঘদিন পর গ্রেফতার অভিযান শুরু হয় সংস্থাটিতে। অভিযানে নেমে প্রায় প্রত্যেকদিন আসামি গ্রেফতার করে আবার আলোচনায় আসে দীর্ঘদিন ধরে মন্থর গতিতে চলা দুদক।

ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন গত ২৭ মার্চ থেকে শুরু করে এ গ্রেফতার অভিযান। ওইদিন রাতভর অভিযান চালিয়ে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ৪ হেভিওয়েট আসামিকে গ্রেফতার করে দুদক। ‌এরপর তাদের রিমান্ডে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দুদকের হাতে গ্রেফতার হওয়া বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ওই আসামিরা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

২৭ মার্চ রাত থেকে শুরু হওয়া গ্রেফতার অভিযানে গত বুধবার (২০ এপ্রিল) পর্যন্ত ৫২ জন আসামিকে গ্রেফতার করেছে দুদক।

গ্রেফতার অভিযানের সঙ্গে জড়িত দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তারা উদ্ধৃত না হওয়ার শর্তে বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, অনেক আসামি গ্রেফতার এড়াতে পলাতক রয়েছেন।

দুদকের সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল বুধবার বিকেলে বাংলানিউজকে বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের এখতিয়ার অনুযায়ী আসামিদের গ্রেফতার করছেন।

একটি মামলায় তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মন্তব্য করা ঠিক হবে না, আসামি পলাতক বা পলাতক না। কারণ তদন্ত শেষে দুদক চার্জশিট দেয়। চার্জশিটের একটি কলামে রয়েছে যেখানে লেখা থাকে আসামি কার তত্ত্বাবধানে। তদন্ত শেষে কর্মকর্তা লেখেন, আসামি জামিনে না পলাতক’।

চলতি সপ্তাহে একাধিক গ্রেফতার অভিযানে থাকা একজন উপ-পরিচালক বাংলানিউজকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক গ্রেফতার অভিযানের খবর পেয়ে অনেক আসামি পলাতক রয়েছেন। তবে পলাতক থাকলেও বিভিন্ন কৌশলে আসামিরা গ্রেফতার হচ্ছেন’।

আসামি গ্রেফতারে তার অভিযানের সফলতা ‘ফিফটি ফিফটি’ বলেও মন্তব্য তার। এমন মন্তব্য আরও কয়েকজন কর্মকর্তার।

এদিকে সাম্প্রতিক গ্রেফতার অভিযানে নেমে দুদকের কর্মকর্তারা অনেক তিক্ততার কথাও জানিয়েছেন। বলেছেন, গ্রেফতারে দুদকের লোকবল সংকট থাকায় অনেক জায়গায় পুলিশের সহযোগিতা নিচ্ছেন।

আসামি গ্রেফতারের পর দুদকে রাখার ব্যবস্থা না থাকায় থানায় পাঠাতে হচ্ছে। অভিযানের জন্য শক্তিশালী আলাদা ফোর্স গঠনেরও দাবি জানান তারা। সেই সঙ্গে আসামি ধরতে আলাদা ট্র্যাকার মেশিনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন দুদকের কর্মকর্তারা।

এদিকে গত মঙ্গল ও বুধবার দু’দিনেই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ের মোট ২৩ জনকে গ্রেফতার করেছে দুদক।

গত ২৭ মার্চ শুরুর দিনে রাতভর অভিযান চালিয়ে বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতির মামলায় তিনজন ব্যবসায়ী ও ব্যাংকটির একজন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে দুদক।

গ্রেফতারকৃত চার ব্যক্তি হলেন- ব্যবসায়ী সৈয়দ হাসিবুল গণি, মো. আকবর হোসেন ও ফয়েজুন নবী চৌধুরী এবং বেসিক ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ইকরামুল বারী।

একই মামলায় গত ৫ এপ্রিল ব্যাংকটির মহাব্যবস্থাপক জয়নাল আবেদীন চৌধুরীকে গ্রেফতার করে সংস্থাটি।

এদিকে দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তারা পৃথকভাবে আসামিদের তালিকা তৈরি করেছেন। সে তালিকায় রয়েছেন বিভিন্ন মামলায় জামিন না নিয়ে পলাতক আসামিরা।

এর মধ্যে রয়েছেন ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিনিয়র কর্মকর্তা, ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎকারী ব্যবসায়ী, সেবা সংস্থার প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, এলজিইডি, রাজউকের প্রকৌশলী, বিদ্যুৎ, তিতাস, ওয়াসাসহ সেবা খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংকের ঋণ গ্রহীতা, অর্থ আত্মসাৎকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন এজাহারভুক্ত আসামি।

সূত্র মতে, আলোচিত বেসিক ব্যাংকের ৫৬টি মামলায় আসামি ১৫৬ জন। তাদের মধ্যে আছেন ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামসহ ১৭ জন কর্মকর্তা। ৮২ জন ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং ১১ জন সার্ভেয়ার।

এর মধ্যে মাত্র তিনজন ঋণগ্রহীতা এবং পাঁচজন বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি ১৪৮ জনকে গ্রেফতারের লক্ষ্যে তাদের গতিবিধি কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এজাহারভুক্ত কোনো আসামি যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন- সেজন্য ৫৬টি মামলার আসামিদের নাম-ঠিকানা ও মামলার তথ্য উল্লেখ করে ইমিগ্রেশনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন ৬ তদন্ত কর্মকর্তা।

জানা গেছে, সম্ভাব্য অভিযানে জোর চেষ্টা চালানো হবে বেসিক ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে গ্রেফতারের। ইতোমধ্যে তার যশোরের কাজীপাড়ার বাসা এবং ধানমণ্ডির এফ-১, ২ গ্রিন কর্নার রোডের বাসায় একাধিকবার অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতারে ব্যর্থ হয় দুদক টিম।

গ্রেফতারের চেষ্টা করা হবে আলোচিত এ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সাবেক ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) এ মোনায়েম খান, উপ-ব্যবস্থাপক এসএম জাহিদ, ডিএমডি কনক কুমার পুরকায়স্থ, রিলেশন্সশিপ ম্যানেজার পলাশ কুমার দাসগুপ্ত, এজিএম আবদুস সাত্তার খান, সাবেক জিএম মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, সাবেক এজিএম আবদুস সবুর, ডিজিএম কোরবান আলী, সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মঞ্জুর মোর্শেদ ও সাবেক জিএম গোলাম ফারুক খানকে।

এ বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত এসব মামলায় ডিএমডি ফজলুস সোবহান, মো. সেলিম, জিএম শিপার আহমেদ, জিএম জয়নাল আবেদীন চৌধুরী, ইকরামুল বারীকে গ্রেফতার করা হয়।

ঋণ গ্রহীতা হিসেবে গত ২৮ মার্চ গ্রেফতার করা হয় এমারেল্ড অটো ব্রিকফিল্ডসহ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মালিক সৈয়দ হাসিবুল গণি গালিব, মেসার্স ফারসি ইন্টারন্যাশনালের মালিক ফয়জুন্নবী চৌধুরী, এশিয়ান শিপিং বিডির মালিক আকবর হোসেনকে।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির আসামি ছাড়াও শিগগিরই একাধিক হেভিওয়েট ব্যক্তি গ্রেফতার হতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দেন দুদকের পদস্থ এক কর্মকর্তা।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/এমএইচ

উপরে