আপডেট : ১২ নভেম্বর, ২০১৬ ০৯:৩৬

ভাড়াটিয়ার তথ্য অবস্থান শনাক্ত হবে কোড নম্বরে

অনলাইন ডেস্ক
ভাড়াটিয়ার তথ্য অবস্থান শনাক্ত হবে কোড নম্বরে

রাজধানীতে বসবাস করা এক কোটি ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ করে সেসব সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিআইএমএস) সফটওয়্যারে সংরক্ষণের কার্যক্রম চলছে। এতে প্রযুক্তির মাধ্যমে ভাড়াটিয়ার তথ্য ও অবস্থান একটি কোডে শনাক্ত করা হবে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ওই সফটওয়্যারে প্রায় চার লাখ ফরমের তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে। ডিএমপির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, রাজধানীর ৪৯ থানা এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত ২১ লাখ ভাড়াটিয়া পরিবারের তথ্য ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে প্রায় এক কোটি নাগরিকের তথ্য রয়েছে। এখন সিআইএমএস সফটওয়্যারে ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংরক্ষণ কার্যক্রম চলছে। পরবর্তী সময়ে একটি কোড নম্বর বা ভিন্ন কোনো উপায়ে ভাড়াটিয়াদের শনাক্ত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নগর সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে বাড়ির মালিকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভাড়াটিয়াদের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ সব তথ্য থাকে। নতুন ভাড়াটিয়াকে নগর সরকার একটি কোড নম্বর দেয়। পরবর্তী সময়ে বাসা বদল করলে তার কোড নম্বরই হয় ভাড়াটিয়া হিসেবে তার পরিচয়। এ ধরনের পদ্ধতি চালুর চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।

এদিকে সচেতনতার অভাবে এখনো অনেক ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণ করেনি। তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন এবং পরবর্তী সময়ে দুই দফায় সময় বাড়ানো হলেও এই কাজে গতি আসেনি। সর্বশেষ প্রতিটি থানাকে চলতি বছরের মধ্যেই সব ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ করার সময়সীমা দিয়েছে ডিএমপি। কয়েকটি থানা ঘুরে দেখা গেছে, বছরের শেষ সময়ে ফের ভাড়াটিয়া তথ্য সংগ্রহ কাজে বেশ গতি এসেছে।

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, ঢাকার বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা তথ্য দিয়ে ডাটাবেইস তৈরি করা হচ্ছে। ডাটাবেইসে প্রত্যেক ভাড়াটিয়ার জন্য একটি কোড নম্বর থাকবে। এতে কেউ কোনো অপরাধ করলে তাকে দ্রুত শনাক্তসহ আইনের আওতায় আনা যাবে।

ডিএমপি কমিশনার আরো বলেন, ‘জঙ্গিবাদ নির্মূলের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ভাড়াটিয়া ও মালিকদের তথ্য সংগ্রহ করে উন্নতমানের ডাটাবেইস তৈরি হচ্ছে। ভোটার তালিকা তৈরি করতে শত কোটি টাকা খরচ হলেও এই নগরীর বিশাল জনসংখ্যার তথ্য সংগ্রহে একটি টাকাও খরচ হবে না। ইনশা আল্লাহ আগামী এক বছরের মধ্যে সব ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালার তথ্য ডাটাবেইসে সংগ্রহ করে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দিতে পারব।’

জানতে চাইলে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রায় ২১ লাখ তথ্য ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে। একটি ভাড়াটিয়া পরিবারে চার-পাঁচজন বা তারও বেশি সদস্য থাকে। ফলে এক কোটির মতো ভাড়াটিয়ার তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। সিআইএমএস সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। এতে এখন পর্যন্ত প্রায় চার লাখ ফরমের তথ্য, অর্থাৎ ১৫ লাখেরও বেশি ভাড়াটিয়ার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’

কৃষ্ণপদ রায় আরো বলেন, ‘উন্নত বিশ্বে সিটি গভর্নমেন্ট ভাড়াটিয়া তথ্য সংগ্রহ করে কোড নম্বরের মাধ্যমে তা সংরক্ষণ করে। এখানে সেই ব্যবস্থা নেই। পুলিশের কাজের প্রয়োজনে তেমন কোনো পদ্ধতিতে আমরা সংরক্ষণ করব। মূল কথা হচ্ছে, ভাড়াটিয়াদের তথ্য এবং অবস্থান শনাক্ত করা। যেন কেউ অপরাধ করে পালিয়ে থাকতে না পারে। একইভাবে অপরাধের শিকার হলেও তার পরিচয় দ্রুত বের করে তাকে সহায়তা দেওয়া যাবে।’

ডিএমপি সূত্র জানায়, রাজধানীতে জঙ্গিসহ অপরাধী শনাক্তের কাজ সহজ করতে গত জানুয়ারি মাস থেকে পুলিশ বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে। এ নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হলেও আশানুরূপ তথ্য পাওয়া যায়নি। ফেব্রুয়ারি মাসে কয়েকটি বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার হওয়ার পর তাদের সম্পর্কে তথ্য না থাকার বিষয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে ডিএমপি। এর পরপরই তথ্যগুলো থানায় দিতে সময় বেঁধে দেয় ডিএমপি। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ১৫ মার্চের মধ্যে ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফরম পূরণ করে পার্শ্ববর্তী থানায় জমা দেওয়ার অনুরোধ জানান। ওই সময় তিনি বলেন, যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধন ফরম জমা দেবে না তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এরপরই পুলিশের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে রিট করা হয়। পরে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রিটটি খারিজ করে দেন। ডিএমপি দুই দফা সময় বাড়িয়ে ৩০ এপ্রিল তথ্য সংগ্রহের দিন নির্ধারণ করে। ওই সময় পর্যন্ত ১৮ লাখ ভাড়াটিয়ার তথ্য ফরম পূরণ করা সম্ভব হয়। পরবর্তী সময়ে ডিএমপি সদর দপ্তরের তাগিদে আরো তিন লাখ ফরম পূরণ করে জমা দিয়েছেন ৪৯ থানার ওসিরা। এসব তথ্য সংরক্ষণে গত ১ সেপ্টেম্বর সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিআইএমএস) নামে একটি সফটওয়্যার চালু করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, খিলগাঁও থানা এলাকায় পুলিশের ছয়টি দল (বিট) রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অফিসারের মাধ্যমে ৭০ হাজারের বেশি তথ্য ফরম বিতরণ করা হয়। চারটি কম্পিউটারের মাধ্যমে থানার তিন পরিদর্শকসহ একজন এসআই এবং ছয়জন এএসআই তথ্য সংগ্রহে কাজ করছেন। সিআইএমএস উদ্বোধনের পর থেকে গতকাল পর্যন্ত প্রায় ছয় হাজার তথ্য কম্পিউটারে সংরক্ষণ করেছেন তাঁরা। খিলগাঁও থানার ওসি কাজী মাইনুল ইসলাম বলেন, তথ্য সংরক্ষণ করতে গিয়ে কিছু তথ্য ফরম অসম্পূর্ণ পাওয়া গেছে। কিন্তু কোনো ভুল তথ্য এখন পর্যন্ত আমরা পাইনি। অসম্পূর্ণ তথ্য সংশ্লিষ্ট বিটের অফিসারের মাধ্যমে পুনরায় সংগ্রহ করা হচ্ছে।’

পল্টন থানা এলাকায় মোট পাঁচটি বিট রয়েছে। ফরম বিতরণ করা হয় ১৮ হাজার ৩১০টি এবং পাওয়া গেছে ১৭ হাজার ৯২০টি। দুটি কম্পিউটারের মাধ্যমে দুজন এএসআই ও তিনজন কনস্টেবল এ তথ্য সংরক্ষণে কাজ করছেন। ইতিমধ্যে চার হাজারের মতো তথ্য কম্পিউটারে সংরক্ষণ করেছেন। ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, দৈনন্দিন কাজের মতোই ফরম সংগ্রহ এবং ডাটা এন্ট্রির কাজ চলছে।

খিলক্ষেত থানার ওসি শহিদুল হক বলেন, ‘এই থানায় ৫০ হাজার ভাড়াটিয়া তথ্য পূরণ করা হয়েছে। এখনো কাজ চলছে। এই তথ্যের মাধ্যমেই গত ২৭ মে গৃহবধূ হত্যার আসামিকে শনাক্ত করা গেছে।’ ওসি জানান, খিলক্ষেতের ব্যাপারীপাড়ার বাসা থেকে শিউলি বেগম নামে এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর স্বামী মাইনুদ্দিন যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে হত্যা করে পালিয়ে যায়। প্রথমে মাইনুদ্দিনকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। তবে পরবর্তী সময়ে ভাড়াটিয়া ফরমের মাধ্যমে পুলিশের হাতে এসেছে ওই আসামির নাম-ঠিকানা।

সূত্র: কালের কন্ঠ

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/রাসেল

উপরে