আপডেট : ২ মে, ২০১৬ ১০:৩১

বেড়েছে বাংলাদেশের ভূখন্ড, বাড়ছে স্বপ্ন ও সম্ভাবনা!

অনলাইন ডেস্ক
বেড়েছে বাংলাদেশের ভূখন্ড, বাড়ছে স্বপ্ন ও সম্ভাবনা!
লাল চিন্হিত অংশগুলোতে জেগেছে নতুন চর

গত চার দশকে কয়েক হাজার বর্গ কিলোমিটার নতুন জমি যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। এখনো কোনো জরিপ না হওয়ায় সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে খালি চোখে এ ভূখণ্ডের পরিমাণ বিশাল। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন জমি ইতিমধ্যে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের দশ ভাগের এক ভাগ ছাড়িয়েছে।

বঙ্গোপসাগর ও বিভিন্ন নদীতে জেগে ওঠা চর ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে স্থায়ী ভূখণ্ডে। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কক্সবাজার, পটুয়াখালী, ফেনী ও ভোলাতেই তৈরি হয়েছে আনুমানিক ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার নতুন জমি। ১৪৮ বর্গ কিলোমিটারের সন্দ্বীপ ঘিরে নতুন জমি তৈরি হয়েছে এর দ্বিগুণ। আর শুধু মেঘনার উপকূলে গত দেড় দশকে জেগে ওঠা ৪০টি স্থায়ী চরে পাওয়া গেছে প্রায় ২ হাজার বর্গ কিলোমিটার জমি। মেঘনার পাড় ঘিরে সৃষ্টি হওয়া আরও ৭৫টি চর অচিরেই পেতে যাচ্ছে স্থায়ী রূপ। সে হিসেবে আগামী দুই দশকে বর্তমান বাংলাদেশের অর্ধেক পরিমাণ নতুন জমি পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এসব জমি শুধু দেশের ভূখণ্ডের পরিমাণই বাড়াচ্ছে না, এর মাধ্যমে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। পূরণ হয়েছে স্বপ্ন। বিদেশি বিনিয়োগের জন্য যখন দেশে একসঙ্গে বৃহদাকারের জমি পাওয়া প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিল, তখন নতুন এ জমি সেই চাহিদা পূরণ করেছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ফেনীর নতুন জমিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে মিরসরাই ও ফেনীতে অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের কাজও শুরু হয়েছে। বন বিভাগ থেকে নতুন জমিতে নেওয়া হয়েছে বনায়নের প্রকল্প। শুধু সরকারি পর্যায়ে নয়, স্বপ্ন পূরণ হয়েছে প্রান্তিক মানুষেরও। বসতিহীন মানুষ নতুন করে বেঁধেছে ঘর। ভূমিহীন কৃষক এসব বিস্তীর্ণ জমিতে শুরু করেছে কৃষিকাজ। সরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) ২০০৮ সালে করা সমীক্ষায় বলা হয়, ভাঙনের চেয়ে জেগে ওঠার পরিমাণ বেশি হওয়ায় ১৯৭৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশ নতুন ৫৯৭ বর্গ কিলোমিটার জমি পেয়েছে। এই সময়ে ১ হাজার ৪৫ বর্গ কিলোমিটার জমি ভাঙনের শিকার হলেও জেগে উঠেছে ১ হাজার ৬৪২ বর্গ কিলোমিটার। পরে ২০১৩ সালে সরকারি সংস্থা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ থেকে ২০১০ পর্যন্ত বিভিন্ন উপকূলীয় ৫ হাজার ৪৭১ বর্গ কিলোমিটার নতুন জমি জেগে উঠেছে। এর বেশির ভাগই ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে শ্রেণিকরণ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যেই নোয়াখালী জেলা ঘিরে জেগে ওঠা নিঝুম দ্বীপ, চরকবিরা, চরআলীম, সাগরিয়া, উচখালী, নিউ ডালচর, কেরিং চরসহ প্রায় ৫ হাজার বর্গ কিলোমিটারের নতুন ভূমি শ্রেণিকরণের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এখন সন্দ্বীপকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করতে উরিরচরে একটি ক্রসড্যাম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে জেগে ওঠা চরগুলোকেও সংযুক্ত করা সম্ভব হবে। জানা যায়, নতুন জমির এই সুফল পাওয়া যাচ্ছে সত্তরের দশক থেকে বিভিন্ন ধরনের ক্রসড্যাম বা আড়াআড়ি বাঁধ তৈরির মাধ্যমে। বিশ্বের একমাত্র বদ্বীপ রাষ্ট্র নেদারল্যান্ডসের সহায়তায় তখন থেকেই ক্রসড্যাম তৈরি এবং চর জেগে ওঠার পর সেটিকে স্থায়ী ভূখণ্ডে পরিণত করতে কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড, বন বিভাগ, ভূমি মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ আরও কয়েকটি সরকারি দফতর। এ ক্ষেত্রে প্রথমে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে উপকূলের পানি নিমগ্ন অংশকে ঘিরে ফেলা হয়। পরে পানি শূন্য হলে একটি নতুন জমি হিসেবে দেখা যায়। পাশাপাশি ক্রসড্যামের কারণে মোহনায় জমে পলি মাটি। সেটিও নতুন ভূখণ্ডের সৃষ্টি করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ প্রক্রিয়ায় জমি উদ্ধার করা হয়ে থাকে। নেদারল্যান্ডস তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ ভূখণ্ড এই উপায়েই সংগ্রহ করেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স, সানফ্রান্সিসকো, অস্ট্রেলিয়ার পার্থ, মেক্সিকো সিটি, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন, দক্ষিণ চীন, হংকং, ম্যাকাও, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, টোকিও, বাহরাইনসহ বিশ্বের আরও অনেক দেশ সমুদ্র উপকূলে ভূমি উদ্ধার করেছে। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ১৯৫৭ সালে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ভোলা অঞ্চলে প্রথম ক্রসড্যাম দিয়ে ২১ হাজার হেক্টর নতুন ভূমি উদ্ধার করা হয়। সে সময় এ ড্যামের মাধ্যমে নোয়াখালীতে রামগতি নামক এলাকাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। আবার ১৯৬৫ সালে ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ আরও একটি ক্রসড্যাম তৈরি করে সোনাপুর রেলস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয় চরজব্বার নামক এলাকাকে। এতে উদ্ধার করা হয় প্রায় ৭৯ হাজার হেক্টর নতুন ভূমি। এরই ধারাবাহিকতায় সন্দ্বীপের চারদিকে জেগে উঠেছে দ্বীপটির দ্বিগুণ নতুন জমি। বিশেষত দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের আজিমপুর এলাকা থেকে উত্তর-পশ্চিম কোণের দীর্ঘাপাড় ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় জেগেছে নতুন ভূমি। ফলে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, নোয়াখালী ও হাতিয়ার দূরত্ব দিন দিন কমছে। আবার উত্তর-পশ্চিম অংশে থাকা উড়িরচরের দক্ষিণে জেগে উঠেছে আরও প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ লক্ষ্মীচর ও ভবের চর। নতুন ভূমি জেগেছে সন্দ্বীপের পূর্ব প্রান্তেও। এ দ্বীপের উত্তরেও জেগে উঠেছে কয়েক হাজার হেক্টর নতুন ভূমি। একইভাবে নতুন ভূমি জেগে উঠেছে খুলনার সুন্দরবন এলাকা ঘিরেও।

উপরে