আপডেট : ১৭ এপ্রিল, ২০১৬ ০৮:২৫

চার নেতা মতাদর্শে গড়ে তুলছে নেটওয়ার্ক; পলাতক ৩০

বিডিটাইমস ডেস্ক
চার নেতা মতাদর্শে গড়ে তুলছে নেটওয়ার্ক; পলাতক ৩০

নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) হত্যাকারী দল বা স্লিপার সেলের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এসব স্লিপার সেলের প্রধানদের পরিকল্পনায়ই গত তিন বছরে ৯ জন ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক ও প্রকাশক খুন হয়েছেন। কিন্তু এসব দল গঠনকারীদের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরিকল্পনাকারীরা গা-ঢাকা দিলেও বেশ কয়েকজন হত্যাকারী এরই মধ্যে ধরা পড়েছে। সংগঠনের কাঠামো না থাকায় গ্রেপ্তারদের মাধ্যমে পরিকল্পনাকারী পর্যন্ত পৌঁছতে পারছে না তদন্তকারীরা।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে এবিটির চার নেতা মতাদর্শের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছেন। তাঁরা হলেন—বর্তমানে এবিটিপ্রধান ভারতের নাগরিক তামিম আল আদনানী; প্রথম হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী রেদোয়ানুল আজাদ রানা (বিদেশে পলাতক); মালয়েশিয়ায় থাকা সংগঠক তেহজীব করিম এবং দেশেই পালিয়ে থাকা সামরিক শাখার প্রধান মেজর (বহিষ্কৃত) সৈয়দ মো. জিয়াউল হক। এই চারজনসহ ৩০ জন পলাতক আছেন, যাঁরা স্লিপার সেল বা হত্যাকারী দল গঠন করছেন। আরো কিছু পলাতক সদস্য আছেন, যাঁদের নাম জানা যায়নি। এবিটির হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এবিটির প্রথম স্লিপার সেলটি গঠন করেন রেদোয়ানুল আজাদ রানা। তিনি ‘কাট আউট’ পদ্ধতিতে কয়েকটি দল গঠন করেছেন। পরে তামিম আল আদনানীও কয়েকটি দল গঠন করেছেন। আবার অনলাইনে যোগাযোগ ও তথ্য পেয়ে স্বেচ্ছায় কেউ কেউ দল গঠন করে নিচ্ছেন। এ ধরনের কথিত আদর্শ দীক্ষা দিয়েছেন এবিটির নেতা রাহমানী ও এজাজ। রানা, আদনানী, তেহজীব করিম, জিয়া এবং গ্রেপ্তার আবুল বাশার, তৌহিদুর ও সাদেক মিঠু কথিত আদর্শ ছড়িয়ে দিয়েছেন। ওই কর্মকর্তা আরো জানান, স্লিপার সেলের সদস্যদের মধ্য থেকে ২৬ জনের নাম জানা গেছে, যাঁরা এখনো অধরা। তাঁরা হলেন—রেদোয়ানুল আজাদ রানা, তামিম আল আদনানী, আবদুল করিম ওরফে জাবের, রেজওয়ান শরীফ, রমজান ওরফে সিয়াম, নাঈমি, আবদুল্লাহ ওরফে আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব ওরফে বড়ভাই, মাওলানা জুনায়েদ আহমেদ ওরফে তাহের, মাসুম ওরফে ইকবাল হাদি, শরীফ, আবরার, আলী আজাদ, নাইম, সাইফুল, আমিনুল, জাহিদ, শিকদার, কাওসার, কামাল, নবীর হোসেন, ফাহিম, মানিক, সায়েম, সৌরভ সালেহ, আসলাম ও জাহাঙ্গীর।

এদিকে ইন্টারনেটে এবিটির বিভিন্ন ওয়েবপেজ চালু আছে, যেগুলো থেকে আনসার আল ইসলামের নামে প্রচার চলছে। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর এবিটি ইন্টারনেটে আল-কায়েদার প্রচারযন্ত্র গ্লোবাল ইসলামিক মিডিয়া ফ্রন্টের (জিআইএমএফ) অধিভুক্ত হয়েছে বলে খবর দিয়েছে জঙ্গি সংগঠনের তত্পরতা নজরদারি করা সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ। খবরে বলা হয়, এখন এবিটির প্রচারযন্ত্রের নাম হয়েছে ‘জিআইএমএফ বাংলা টিম’। যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টার কথা স্বীকার করলেও একীভূত হওয়ার ব্যাপারে তথ্য নেই বলেই দাবি করছে বাংলাদেশের তদন্তকারীরা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন এবিটির অনুসারী জঙ্গিরা স্বেচ্ছায় মোটিভেটেড হয়ে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কাজ করছে। হত্যাকারী বা স্লিপার সেল এভাবেই হচ্ছে। তাদের আদর্শিক জায়গা তৈরি হচ্ছে অনলাইন, বইসহ বিভিন্ন যোগাযোগ বা নেটওয়ার্কে।’ তিনি বলেন, ‘এবিটি এখন আনসার আল ইসলাম নাম ব্যবহার করছে। যোগাযোগের চেষ্টাও করছে। তবে কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।’

যেভাবে চলছে এবিটি : সূত্র জানায়, প্রথমে রিসার্চ সেন্টার ফর ইউনিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আরসিইউডি) নামে একটি এনজিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে এবিটি। ২০০২ সালে ধানমণ্ডির ৭ নম্বর সড়কের একটি বাসায় আরসিইউডি চালু করেন আব্দুর রশিদ চৌধুরী। ওই সময়ে এবিটি জর্দানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুসলেমীনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। তবে ২০০৮ সালেই এনজিওটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। আব্দুর রশিদ বর্তমানে ঢাকার গ্রীন রোডে বসবাস করেন। তাঁর জামাতা তেহজীব করিম ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যার পর থেকে মালয়েশিয়ায় রয়েছেন। তিনি মূলত ইন্টারনেটভিত্তিক এবিটির জঙ্গি ফোরামের নেতৃত্ব দেন। ব্লগারদের হত্যায় রানার পাশাপাশি তেহজীব করিম বড় ভূমিকা রাখছেন বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।

২০১১ সালের ডিসেম্বরে সেনা অভ্যুত্থানে প্ররোচনা চালিয়ে ব্যর্থ হওয়া মেজর (বহিষ্কৃত) সৈয়দ মো. জিয়াউল হক এবিটির সামরিক শাখার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি পাঁচ বছর ধরে পলাতক। গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে থেকে এবিটির স্লিপার সেল সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জিয়া। এ ছাড়া কারাগার থেকে বার্তা নিয়ে সংগঠন পরিচালনার অভিযোগে গত বছর রাহমানীর ভাই আবুল বাশারকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব।

সম্প্রতি এবিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন ভারতের নাগরিক তামিম আল আদনানী। তিনি মাঝেমধ্যে বাংলাদেশে আসেন। তাঁকে সহায়তা করছেন রাজশাহীর দুর্ধর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি নাজিমউদ্দিন। তিনি আগে জেএমবির অনুসারী এবং সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের অন্যতম সহযোগী ছিলেন।

পলাতকরাই হত্যার নেপথ্যে : তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবীতে খুন করা হয় ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে। গ্রেপ্তার ছয়জন জবানবন্দিতে জানান, মূল পরিকল্পনাকারী রেদোয়ানুল আজাদ রানা তাঁদের হত্যা করতে বলেন। তবে গত তিন বছরেও রানার হদিস মেলেনি। রানা বর্তমানে মালেশিয়ায় আছেন বলে দাবি করছে একটি সূত্র। আরেকটি সূত্র বলছে, সম্প্রতি ভারতে একটি বৈঠকে রানা অংশ নিয়েছেন।

গত বছরের ৩০ মার্চ রাজধানীর বেগুনবাড়ীতে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর হিজড়া ও এলাকাবাসী মিলে জিকরুল্লাহ ও আরিফুল ইসলাম নামে দুজনকে আটক করে। যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে সাইফুল নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তবে পরিকল্পনাকারী আবদুল্লাহ ওরফে আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব ওরফে বড়ভাই এবং মাওলানা জুনায়েদ আহমেদ ওরফে তাহেরকে খুঁজে পায়নি ডিবি। তদন্তে এবিটি সদস্য মাসুম ওরফে ইকবাল হাদি, শরীফ ও আবরারের নামও উঠে এসেছে। মামলটির তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা, ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘চার্জশিট দেওয়ার আগে কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করতে পারিনি। পরে আরো তথ্য পেয়েছি। দুই বড়ভাইকে ধরার চেষ্টা চলছে।’

গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় অভিজিেক হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এই মামলায় সন্দেহভাজন ব্লগার ফারাবী, এবিটি সদস্য তৌহিদুর রহমান, সাদেক আলী মিঠু ও আমিনুল মল্লিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হত্যায় জড়িতরা এখনো অধরা। মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা ডিবির উপকমিশনার (ডিসি) মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ‘সাতজনকে আমরা শনাক্ত করেছি। এদের ধরতে পারলে অনেক ঘটনার রহস্য বের হবে।’ সূত্র জানায়, এই খুনে প্রত্যক্ষ জড়িত দুজনের নাম জানা গেছে। তারা হলো রমজান ওরফে সিয়াম ও নাঈমি। জুলহাস বিশ্বাস ও জাফরান আল হাসান অনলাইনে দায় স্বীকারের বার্তা দিয়েছে, দুজনকেই গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব।

গত বছরের ১২ মে সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২৮ আগস্ট সিলেটের কানাইঘাট থেকে ব্লগার মান্নান রাহী ও তাঁর ছোট ভাই মোহাইমিন নোমানকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। রাহী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ২ সেপ্টেম্বর জালালাবাদ টুকেরবাজার থেকে আবুল খায়ের নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সূত্র জানায়, খুনে চারজন প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়। পরিকল্পনায় আরো দু-তিনজন ছিল। তবে পরিকল্পনাকারীর ব্যাপারে কিছুই জানায়নি সিআইডি। বিশেষ পুলিশ সুপার মির্জা আব্দুল্লাহ-হেল বাকী বলেন, ‘আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পরে সবই জানা যাবে।’

গত বছরের ৭ আগস্ট রাজধানীর গোড়ানে ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিলয়কে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। এ মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ডিবির ডিসি মাহবুব আলম জানান, সন্দেহভাজন এবিটির সদস্য সাদ আল নাহিন, মাসুদ রানা, কাউসার হোসেন ও কামাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডে চারজন অংশ নেয়।

গত বছরের ৩০ অক্টোবর আজিজ সুপারমার্কেটে নিজ কার্যালয়ে জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়। একই দিন লালমাটিয়ায় প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে ঢুকে এর কর্ণধার আহমেদুর রশিদ চৌধুরী টুটুল, কবি তারেক রহিম ও লেখক রণদীপম বসুকেও কোপানো হয়। একযোগে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা  কেউই ধরা পড়েনি।

সর্বশেষ গত ৬ এপ্রিল রাজধানীর সূত্রাপুরে হত্যা করা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও সিলেটের গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী নাজিমুদ্দিন সামাদকে। তিনি ফেসবুকে ধর্মান্ধতা নিয়ে লেখালেখি করতেন। ব্লগার খুনের সঙ্গে জড়িত এবিটির সদস্যরাই নাজিমকে খুন করেছে বলে ধারণা তদন্তকারীদের।

সূত্র-কালের কণ্ঠ

জেডএম

উপরে