আপডেট : ২১ জুলাই, ২০১৯ ১২:২৫

বাংলাদেশের ‘অভিশাপ’ ফারাক্কা বাঁধের অজানা অধ্যায়

অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশের ‘অভিশাপ’ ফারাক্কা বাঁধের অজানা অধ্যায়

বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা বাঁধ অবস্থিত। ১৯৬১ সালে গঙ্গা নদীর উপর এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং নির্মাণ সম্পন্ন হয় ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। এর দৈর্ঘ্য ২.২৪ কিলোমিটার, এটি শুধুমাত্র একটি বাঁধ নয় এই অবকাঠামোটি সড়ক ও রেল যোগাযোগ সেতু হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে কলকাতা বন্দরের কাছে হুগলি নদীতে পলি জমা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এই পলি ধুয়ে পরিষ্কার করার জন্য ফারাক্কা বাঁধ তৈরি করা হয়। শুষ্ক মওসুমে (জানুয়ারি থেকে জুন) ফারাক্কা বাঁধ গঙ্গার ৪০,০০০ ঘনফুট/সে (১,১০০ মি৩/সে) জল হুগলি নদীর অভিমুখে চালিত করে। প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তৎকালিন সোভিয়েত রাশিয়ার সহায়তায় হিন্দুস্তান কনস্ট্রাকশন কোম্পানি বাঁধটি তৈরি করে। বাঁধটিতে মোট ১০৯টি গেট রয়েছে। ফারাক্কা সুপার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জল এই বাঁধ থেকেই সরবরাহ করা হয়।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বহুল আলোচিত বিষয় ফারাক্কা বাঁধের অজানা অধ্যায় আজ জানাবো বিডিটাইমস৩৬৫ এর পাঠকদের।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর গঙ্গার পানি বন্টন নিয়ে ভারতের সাথে আলোচনা শুরু করে। ১৯৭৪ সালের ১৬ ই মে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানি বন্টন বিষয়ে আলোচনা করেন। এই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত হয় যে উভয় দেশ একটি চুক্তিতে আসার আগে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করবে না। যদিও বাঁধের একটি অংশ পরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৫ সালে মাত্র ১০ দিনের জন্য ভারতকে গঙ্গা নদী থেকে ৩১০ থেকে ৪৫০ কিউসেক পানি অপসারণ করার অনুমতি দেয়, কিন্তু ভারত ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত গঙ্গা নদী হতে ১১৩০ কিউসেক পানি অপসারণ করে পশ্চিমবঙ্গের ভাগরথি-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করে।

বাংলাদেশের সাথে করা ভারতের এ ধরনের অন্যায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আলোচনা করা হলেও বিষয়টি ভারত খুব একটা পরোয়া করেনি। ২৬ নভেম্বর ১৯৭৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ভারতকে বাংলাদেশের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই বিষয়টির সুরাহার করার নির্দেশ দিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। কয়েকবার বৈঠকের পর উভয় দেশ ৫ নভেম্বর ১৯৭৭ সালে একটি চুক্তি করে। চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ ও ভারত পরবর্তি পাঁচ বছরের (১৯৭৮-৮২) জন্য শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি ভাগ করে নেবে। ১৯৮২ এর অক্টোবরে উভয় দেশ ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে পানি বন্টনের একটি স্বল্পমেয়াদী চুক্তি করে। নভেম্বর ১৯৮৫ সালে আরও তিন (১৯৮৬-৮৮) বছরের জন্য পানি বন্টনের চুক্তি হয়। কিন্তু একটি দীর্ঘ চুক্তির অভাবে বাংলাদেশ তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য গঙ্গার পানি ব্যবহারে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারেনি। কোনো চুক্তি না থাকায় ১৯৮৯ সালের শুষ্ক মৌসুম থেকে ভারত একতরফা প্রচুর পরিমাণ পানি গঙ্গা থেকে সরিয়ে নেয়, ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশর নদ-নদীতে পানি প্রবাহের চরম অবনতি ঘটে। ১৯৯২ সালের মে মাসে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের এক বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এই আশ্বাস দিয়েছিলেন যে ভারত বাংলাদেশকে সমান পরিমাণ পানি দেবার ব্যাপারে সম্ভাব্য সকল কিছু করবে। ফলে এরপর দুই দেশের মধ্যে কোন মন্ত্রী বা সচিব পর্যায়ে বৈঠক হয়নি। ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রীজ অঞ্চলে মাত্র ২৬১ কিউসেক পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়, যেখানে ফারাক্কা-পূর্ব সময়ে একই অঞ্চলে ১৯৮০ কিউসেক পানি প্রবাহিত হত। ১৯৯৩ সালের মে মাসে যখন উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীরা আবার মিলিত হন, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশেকে দেওয়া তার কথা রাখতে ব্যর্থ হন। অবশেষে, ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়া ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  ঐতাইহাসিক গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি সই করেন।

১৯৯৬ সালে হওয়া ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তিতে পানি বন্টনের বিষয়টি স্পষ্ট করে বল থাকলেও তাও ঠিক মতো মানছে না ভারন। প্রতিটি চুক্তির পর ভারত অন্যায় ভাবে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে। নদী বা কোন প্রবাহমান জলরাশির পানি পরিমাপের একক হল কিউবিক ফিট/ সেকেন্ড, যাকে সংক্ষেপে বলা হয় কিউসেক। ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা চুক্তি অনুযায়ী নদীতে ৭০ হাজার কিউসেক পানি থাকলে উভয় দেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক, আর ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি পানি থাকলে ৪০ হাজার কিউসেক পাবে ভারত বাকিটা পাবে বাংলাদেশ। অথচ ভারত খেয়ালখুশিমতো বাঁধ থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পানি অপসারণ ও বন্ধের ফলে শুষ্ক মৌসুমে তীব্র খরার কবলে পড়ছে বাংলাদেশ। আবার বর্ষা মৌসুমে প্রচন্ড বন্যার কবলে পড়ছে বাংলাদেশ। ফারাক্কা বাঁধ কেন্দ্রিক ভারতের এই স্বেচ্ছাচারিতার ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত নিজেও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের আগে দুই দেশের নদী বিশেষজ্ঞরা এর বিরোধিতা করে বলেন, গঙ্গা বা পদ্মার মতো বিশাল নদীর গতি বাঁধ দিয়ে বিঘ্নিত করলে নদীর উজান এবং ভাটি উভয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হতে পারে। এ ধরণের নেতিবাচক অভিমত সত্ত্বেও ভারত সরকার ফারাক্কায় গঙ্গার উপর বাঁধ নির্মাণ ও হুগলী-ভাগরথীতে সংযোগ দেয়ার জন্য প্রায় ৪০ কি.মি লম্বা ফিডার খাল খননের পরিকল্পনা ও কাজ শুরু করে। অপরিণামদর্শী এই প্রকল্প বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিহার রাজ্যের ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনে। ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশ অংশের পদ্মা পরিণত হয়েছে এক খন্ড মরুভূমিতে। পানি অপসারণের ফলে পদ্মা নাব্যতা হারিয়েছে আড়াই হাজার কিলোমিটার নদীপথ সেইসাথে ৪৯ টি শাখা নদীর অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলীন হয়েছে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু পর।

গত চার দশকে গঙ্গা অববাহিকায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। গঙ্গার উজানে বিহার উত্তরপ্রদেশ এবং মাটিতে সুন্দরবন পর্যন্ত পরিবেশ বিপর্যয়ের চিত্র আজ সুস্পষ্ট। গঙ্গার উজানে বিপুল পরিমাণ পলি জমার ফল স্বরূপ বন্যা দেখা দিচ্ছে ভারতের বিহার সহ উত্তর প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায়। অন্যদিকে গ্রীষ্ম মৌসুমে পানি আটকে রাখার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ক্ষতির শিকার হচ্ছে ভাটি অঞ্চলে বাংলাদেশ। ফারাক্কা বাঁধের ফলে প্রতিবছর শুধুমাত্র বিহারেই ২০ লক্ষ মানুষ হুমকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশে আসা গঙ্গা বাহিত পলির পরিমাণ দুই বিলিয়ন টন থেকে এক বিলিয়ন টনে এসে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে মেঘনা মোহনায় অবস্থিত উপকূলীয় চর অঞ্চলের গঠন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এই ধারা চলমান থাকলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমি গঠন এবং ভূমি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বিপর্যস্ত হয়ে যাবে।

এই বাঁধের কারণে একসময় প্রমত্ত পদ্মার এখন মুমূর্ষু অবস্থা। এ অঞ্চলের সবুজ শ্যামল বাংলা হয়তো অচিরেই মরুভূমিতে পরিণত হবে। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি অপসারণের ফলে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, বয়ন শিল্প, নৌ-পরিবহন, পানি সরবরাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক লোকসান হচ্ছে। আর্থিক মূল্যে প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতির পরিমান প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার।

পদ্মার পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের উত্তর অববাহিকায় রাজশাহী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভূগর্ভস্থ পানির প্রথম স্তর ৮-১০ ফুট জায়গা বিশেষে ১৫ ফুট নীচে নেমে গেছে। মৌসুমী বৃষ্টি এই স্তরের পানির অভাব পূরণ করতে পারছে না। পানি প্রবাহের এমন করুণ অবস্থা থেকে সৃষ্টি হয় মরুকরণ প্রক্রিয়া। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে মাটির আর্দ্রতা কমে গেছে ৩৫ শতাংশ। আর্দ্রতার অভাবে দিনের নিম্নতম ও উচ্চতম তাপমাত্রার তারতম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের গড়াই নদী এখন এই মরুকরণ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ ভাবে বিলুপ্ত। প্রবাহ কমে যাওয়ায় অধিকাংশ নদীর নাব্যতা কমে গেছে, ফলে বাংলাদেশের প্রায় বড় মাপের বন্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এছাড়া মিঠা পানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় কৃষিক্ষেত্রে এর ভয়াবহ প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যার ফলে খুলনা অঞ্চলের মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। মাটির আর্দ্রতা হ্রাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও মিঠাপানির অপ্রাপ্ততার জন্য মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। গঙ্গার অনিয়ন্ত্রিত পানি প্রবাহের কারণে এলাকার প্রায় দুই শতাধিক মাছের প্রজাতি ও ১৮ প্রজাতির চিংড়ি হুমকির সম্মুখীন। মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ার ফলে কয়েক হাজার জেলে বেকার হয়ে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ৩২০ কিলোমিটার এর বেশি নৌপথ নৌ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি ভারতেও ফারাক্কার বিরুদ্ধে জনমত জোরালো হচ্ছে, কারণ ফারাক্কা এখন সুবিধার চেয়ে অসুবিধায় বেশি ঘটাচ্ছে। যে কলকাতা বন্দর টিকিয়ে রাখতে এই বাঁধ দেওয়া হয়েছিল বাঁধ নির্মাণের ৪৩ বছর পরও কলকাতা বন্দরকে বাঁচানো যায়নি। এমনকি কলকাতা বন্দর সচল রাখতে বর্তমানে যে পরিমাণ ড্রেজিং করতে হয় ফারাক্কা বাঁধ চালু করার আগে ও এতটা ড্রেজিং দরকার হতো না।

বাঁধ নির্মাণের আগে স্থানীয় অধিবাসীদের বলা হয়েছিল ফারাক্কা চালু হলে গঙ্গায় আর বন্যা হবে না, কিন্তু অতীতের তুলনায় ভয়াবহ বন্যা দেখা গেছে শুধুমাত্র বাঁধের কারণে। বছর বছর বন্যার বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার প্রেক্ষিতে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ফারাক্কা ব্যারেজ ভেঙে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়ন কর্মীরা বলছেন বাঁধটি না ভেঙে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা অক্ষুন্ন রেখেই বাঁধের গেট গুলো অপসারণ করা সম্ভব। নদীতে এ ধরনের বাঁধের ফলে যদি লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি হয় সে ক্ষেত্রে তা তুলে ফেলার একাধিক উদাহরণ ইউরোপ-আমেরিকার রয়েছে। তাই বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশের জন্য অভিশাপ স্বরূপ এই ফারাক্কা বাঁধ অবিলম্বে সরিয়ে ফেলাই হবে সকলের জন্য মঙ্গল কর।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে