আপডেট : ২১ মে, ২০১৬ ১৩:২৭

ঘুর্ণিঝড়ে আগে ও পরে করণীয়

জানা অজানা
ঘুর্ণিঝড়ে আগে ও পরে করণীয়

প্রায় প্রতিবছর বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে যায় ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের ঘূর্ণিঝড়। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে আমাদেরকে প্রলয়ংকরী এসব ঘূর্ণিঝড়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।  ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত সহায়-সম্বল হীনেরা পুণরায় ঘুরে দাড়াতে পারলেও প্রিয়জন হারারা ফিরে পায়না তাদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে। তবে আমরা চাইলে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুলাংশে হ্রাস করতে পারি।

ঘূর্ণিঝড় কী?

বিজ্ঞানমতে, ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, প্রচন্ড ঘূর্ণি বাতাস ও বৃষ্টি সম্বলিত আবহাওয়ার একটি নিম্নচাপ প্রক্রিয়া যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে তাকে ঘূর্ণিঝড় বলে। এই ঝড়ের একটি লক্ষণীয় দিক হচ্ছে – এটি যখন সৃষ্টি হয় তখন থেকে এটি গোল বাতাসের কুন্ডলী পাকিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। ঘুরতে ঘুরতে এটি অগ্রসর হয় বলে এর নামকরণ করা হয়েছে ঘূর্ণিঝড়। এটি উষ্ণ কেন্দ্রীয় লঘুচাপ, যার চারিদিকে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস উত্তর গোলার্ধের ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে প্রচন্ডভাবে ঘুরতে থাকে। হালকা বাতাস এ হালকা মেঘ দিয়ে ঘুর্ণিঝড়ের কেন্দ্র ‘আয়ন’ নামে পরিচিত। কেন্দ্র থেকে কেন্দ্রের চারিদিকে ঘুর্ণয়মান বাতাসের গতি ঘন্টায় ৬২ থেকে ১১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

সংকেত:

ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত কোনো পূর্বাভাস পেলে সাথে সাথে উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন ধরনের বিপদ সংকেত ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন -

*দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত নম্বর-১ (সমুদ্রে প্রবাহিত বাতাস ঝড়ে রুপান্তর হচ্ছে।)
*দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত নম্বর-২ (সমুদ্রে ঝড় উঠেছে)
*স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর-৩ (বন্দর দমকা হাওয়ার সম্মুখীন হতে পারে)
*স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর-৪ (বন্দরে ঝড় আঘাত আনার সম্ভাবনা রয়েছে)

বিপদ সংকেত নম্বর-৫ (বন্দর ঝড় হ্ওয়া বইছে এবং ঝড় উপকুলের বন্দর দিয়ে অতিক্রম করতে পারে)

বিপদ সংকেত নম্বর-৬ (বন্দর সমূহতে ছোট বা মাঝারি হাওয়া বিরাজ করছে এবং সমুদ্র বন্দর দিয়ে ঝড় অতিক্রম করার আশঙ্কা করা হচ্ছে)

বিপদ সংকেত নম্বর-৭ (বন্দরের উপরে বা নিকটে প্রত্যাশিত ছোট বা মাঝারি হাওয়ার তীব্রতা বিরাজ করা শুরু করেছে)

মহাবিপদ সংকেত নম্বর-৮ (উপকুলের বন্দর সমূহতে তীব্র ঝড় আঘাত হানতে যাচ্ছে)

মহাবিপদ সংকেত নম্বর-৯ (তীব্র ঝড় হাওয়া উপকুলের বন্দর গুলোতে বইতে শুরু করেছে)

মহাবিপদ সংকেত নম্বর-১০ (বন্দরের উপর বা নিকট দিয়ে অতিক্রমকারী তীব্র গতি সম্পন্ন ঝড়ের কারণে বন্দরে তীব্র ঝড়হাওয়া বিরাজ করছে)

মহাবিপদ সংকেত নম্বর-১১ (আবহাওয়া সতর্ক কেন্দ্রের সাথে সকল প্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হ্ওয়ার ফলে প্রবল ঘুর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে)

ঘূর্ণিঝড়ের আগে করণীয়:

সর্বপ্রথম যে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে সেটি হলো, বসত বাড়ির আশেপাশে এবং রাস্তায় নারিকেল গাছ, কলাগাছ, বাঁশ, তাল, কড়ই ও অন্যান্য শক্ত গাছপালা লাগাতে। এসব গাছ ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বেগ কমাতে সাহায্য করে।

দ্বিতীয়ত যথাসম্ভব উঁচু স্থানে শক্ত করে ঘর তৈরি করুন। পাকা ভিত্তির ওপর লোহার বা কাঠের পিলার এবং ফ্রেম দিয়ে তার উপর ছাউনি দিন। ছাউনিতে টিন ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ, ঝড়ের সময় টিন উড়ে মানুষ ও গবাদি পশুকে হতাহত করতে পারে। তবে ০.৫ মিমি পুরুত্ব বিশিষ্ট টিন ও জেহুক ব্যবহার করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে সেটি হলো অতিমাত্রায় উদ্বিগ্ন না হয়ে সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করতে হবে। সাহসিকতার সাথে যেকোনো ধরনের বিপদ মোকাবেলা করা অনেকটা সহজ হয়ে যায়।

চতুর্থত বয়স্ক, মহিলা ও শিশুদেরকে আগেভাগেই নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিতে হবে। তারপর গবাদি পশুগুলোকে যথাসম্ভব উচু জায়গায়, আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।

পঞ্চমত প্রয়োজনীয় কিছু দ্রব্যসামগ্রী যেমন—ডাল, চাল, দেশলাই, শুকনো কাঠ, পানি ফিটকিরি, চিনি, নিয়মিত ব্যবহূত ওষুধ, বইপত্র, ব্যান্ডেজ, তুলা, ওরস্যালাইন ইত্যাদি পানি নিরোধন পলিথিন ব্যাগে ভরে গর্তে রেখে ঢাকনা দিয়ে পুঁতে রাখুন।

ষষ্ঠত টিউবওয়েলের মাথা খুলে পৃথকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং টিউবওয়েলের খোলা মুখ পলিথিন দিয়ে ভালভাবে আটকে রাখতে হবে যাতে ময়লা বা লবণাক্ত পানি টিউবওয়েলের মধ্যে প্রবেশ না করতে পারে।

সপ্তমত দুর্যোগের মুখে পতিত হলে শক্ত গাছের সঙ্গে কয়েক গোছা লম্বা মোটা শক্ত রশি বেঁধে রাখুন। রশি ধরে অথবা রশির সঙ্গে নিজেকে বেঁধে রাখুন যাতে প্রবল ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আপনাকে উড়িয়ে নিতে না পারে।

ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে করণীয়:

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব শেষ হয়ে গেছে ভেবে বসত বাড়িতে ফেরার জন্য তড়িঘড়ি না করে ভালো করে জেনেশুনে ধীরে সুস্থে ফিরতে হবে। বিশেষত শিশুদেরকে এসময় বাইরে বের না করাই ভালো। এসময় বাতাসে বিভিন্ন রোগের জীবাণু মিশে থাকে।

ঘূর্ণিঝড় শেষ হয়ে গেলে সর্বপ্রথম সম্মিলিতভাবে ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্তদের উদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে।

অতপর, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাড়ায় যোগাযোগ মাধ্যমের বেহাল দশা। তাই সকলে সম্মিলিতভাবে রাস্তার উপর পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলতে হবে।

ত্রাণের প্রতি যতটা সম্ভব নির্ভরতা কমিয়ে নিজে নিজেই ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করা ভালো। এ সময় দ্রুত উত্পাদনশীল ধান ও শাক-সবজির জন্য জমি প্রস্তুত করুন, বীজ সংগ্রহ করুন এবং কৃষিকাজ শুরু করুন, যাতে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ফসল ঘরে আসে।

পুকুর বা নদীর পানি ফুটিয়ে পান করতে হবে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় বৃষ্টির পানি ধরে রাখলে।

সর্বোপরি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবকে ভুলে গিয়ে নতুন করে ঘুরে দাড়াতে হবে।

বিডিটাইমস৩৬৫/এএ  

উপরে