আপডেট : ৮ জুলাই, ২০২০ ১২:২৯

করোনা প্রতিরোধের বিষয়গুলো নিয়ে কেন এত বিতর্ক চলছে?

অনলাইন ডেস্ক
করোনা প্রতিরোধের বিষয়গুলো নিয়ে কেন এত বিতর্ক চলছে?

চলতি বছরের প্রথম দিকে চীনের পর ইউরোপে যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছিল, তখন থেকেই এই রোগের নানা চিকিৎসা এবং প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, খোদ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাও তাদের নানা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে।

এক সময় সংস্থাটি যেক্ষেত্রে ঘোরতর বিরোধিতা করেছে, তার কিছুদিন পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। মার্ক ব্যবহার থেকে হাইড্রক্সিক্লোরকুইন - বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ বিতর্ক হয়েছে।

মাস্ক ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই যে বিসয়টি নিয়ে অনেক বিতর্ক তৈরি হয় সেটি হচ্ছে, মাস্ক পরার প্রয়োজন আছে কি না।

শুরু থেকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই বিষয়ে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে যে শুধু মাত্র দুই ধরণের মানুষের জন্য মাস্ক পরা আবশ্যক।

যারা অসুস্থ এবং যাদের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিয়েছে।
যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের দেখাশোনা করছেন।
এর বাইরে কারো জন্য মাস্ক পরার খুব বেশী প্রয়োজনীয় নয় বলে জানিয়েছে ডব্লিউএইচও।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশ শুরুতে মাস্ক পরার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। বাংলাদেশেও ছিল একই অবস্থা। অথচ চীন, জাপান, হংকং, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম শুরু থেকেই মাস্ক পরিধান করার পক্ষে ছিল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাস্ক বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য নিয়ে হাজির হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এপ্রিল মাসের চার তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ড. মাইকলে জে রায়ান বলেন, মাস্ক পরাটা খারাপ আইডিয়া নয়। তবে মাস্ক পরলেও সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং সামাজিক দুরত্ব অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।

রায়ান তখন বলেন, "আমরা কোন কোন ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে দেখতে পাচ্ছি যে বাসায় তৈরি কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার করা এই রোগের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত উপায় হতে পারে।"

ইউরোপের বিভিন্ন দেশ জনসমাগমে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনও এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশে এখন মাস্ক ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাসার বাইরে মাস্ক ব্যবহার না করলে জেল জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোশতাক হোসেন বলেন, সোয়াইন ফ্লুর সময় দেখা গিয়েছিল যে মাস্ক সবার জন্য ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।

সে অভিজ্ঞতা থেকে কোভিড১৯-এর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সবাার জন্য মাস্ক নয়। কিন্তু প্যানডেমিক পরিস্থিতিতে মাস্ক ব্যবহার করার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মোশতাক হোসেন।

মৃতদেহ দাফন নিয়ে বিতর্ক

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে তার মৃতদেহ দাফনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। পৃথিবীজুড়েই এ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।

যারা দাফন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকেন, তারা পার্সোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) পরিধান করে।

বাংলাদেশের রোগত্বত্ত, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের পক্ষ থেকে শুরু থেকে বলা হয়েছিল যে মৃতদেহ থেকে করোনাভাইরাস অন্যদের মাঝে সংক্রমিত হতে পারে।

সংস্থাটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এএসএম আলমগীর ২৯শে মার্চ বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "আইইডিসিআর এর প্রশিক্ষিত লোকজনই লাশের গোসল করিয়ে দেবে। এরপর লাশ কাফনের কাপড়ে জড়িয়ে বিশেষভাবে প্যাকেট করবে, যেন ভেতরের কোন ভাইরাস বাইরে সংক্রমিত না হয়। মৃতদেহ বহনকারী সেই ব্যাগটি কাউকে খুলতে দেয়া হবে না।"

অথচ দুই মাস পরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার তিন ঘণ্টা পর ওই মৃতদেহে আর ভাইরাসটির কোন কার্যকারিতা থাকে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. নাসিমা সুলতানা।

ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, সংস্থাটি বলেছে যে, এখনো পর্যন্ত এটা প্রমাণিত হয়নি যে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে সুস্থ কোন ব্যক্তির মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়ায়।

অথচ মৃতদেহ দফন নিয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশের সমাজে অমানবিক পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে তাকে সমাহিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে স্থানীয় মানুষজন।

নাসিমা সুলতানা কয়েকদিন আগে বলেন, যদিও মৃতদেহ থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি নেই তারপরও যেহেতু ভাইরাসটি নতুন, এর বিষয়ে খুব বেশি তথ্য জানা যাচ্ছে না এবং প্রতিনিয়তই ভাইরাসটি তার জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে চলেছে, তাই সাবধানতার অংশ হিসেবে দাফন ও সৎকারের সময় এই নির্দেশিকা মেনে চলতে বলা হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোশতাক হোসেন বলেন,ইবোলার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল যে মৃতদেহ সৎকারের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি আছে। কোভিড১৯-এর ক্ষেত্রেও এটি মনে করা হয়েছিল।

হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ব্যবহার বিতর্ক

ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন কোভিড-১৯ চিকিৎসার ক্ষেত্রে কতটা কাজে লাগে সেটি নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়। বেশ কয়েকটি দেশ কোভিড১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ব্যবহার করলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে সতর্ক করে আসছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এই ঔষধ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুরুতে তীব্র আপত্তি তুললেও মাত্র দুদিন আগে সংস্থাটি হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন-এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে।

প্লাজমা থেরাপি বিতর্ক
করোনাভাইরাস রোগীদের প্লাজমা থেরাপি দেয়া নিয়ে বাংলাদেশে সম্প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। পৃথিবীর আরো কয়েকটি দেশেও কোভিড১৯ চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করছে।

অথচ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা শুধু পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পর্যায়ে এটিকে রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি অন্তর্বর্তীকালীন গাইডলাইন দিয়েছে। যাতে প্লাজমা থেরাপিকে 'ইনভেষ্টিগেশনাল থেরাপিউটিকস' বলা হয়েছে।

তাদের বক্তব্য, কোভিড ১৯-এর চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি সকল রোগীর উপর সন্দেহাতীতভাবে কাজ করে এমন কোন প্রমাণ নেই। তাই এটি চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বাংলাদেশের একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলেন, কোভিড১৯ একটি নতুন অভিজ্ঞতা। কোভিড১৯ এর পুরো বৈশিষ্ট্যগুলো এখনো বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি।

চৌধুরী বলেন, "এখন ট্রায়াল এন্ড এরর ভিত্তিতে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে একসময় যা বাতিল করে দেয়া হয়েছিল, এখন তা গ্রহণ করা হচ্ছে। আবার এমনও হতে পারে, এখন যা গ্রহণ করা হচ্ছে একসময় তা বাতিল হয়ে যেতে পারে। এটা ছাড়া তো কোন পথ নেই। ট্রায়াল এন্ড এরর চলতেই থাকবে। এভাবেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে।"-বিবিসি বাংলা

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/রাসেল

উপরে