আপডেট : ১৮ মে, ২০২০ ১৫:৩৭

ইমরান খান নয়; পাকিস্তান চালায় ‘ছায়া সরকার’

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
ইমরান খান নয়; পাকিস্তান চালায় ‘ছায়া সরকার’
পাকিস্তান জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জুবায়ের মাহমুদ হায়াত (বাম দিক থেকে দ্বিতীয়) এবং পাকিস্তানি নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল জাফর মাহমুদ আব্বাসি এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া

২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে  প্রথমবারের মতো জনগনের ভোটে নির্বাচিত সরকারে হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর পর পাকিস্তানের জনগন ভেবেছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়  সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের যুগটি শেষ হয়েছে। যদিও দেশটির সিভিল সোসাইটি ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সন্দেহ করে আসছিল যে এটি আসলে লোক দেখানো। বাস্তবে হয়েছেও তাই। নির্বাচনের পর কিছু দিন যেতে না যেতেই বিষয়টি উম্মোচিত হওয়া শুরু করে। পাকিস্তানের সেনা প্রশাসন, সামরিক শাসনের দূর্নাম গোছাতেই একটি কাগুজে সিভিল সংসদ চেয়েছিল যেখানে তারা পছন্দের লোক বসিয়ে নেপথ্যে থেকে কাজ করে যাবে। বর্তমানে পাকিস্তানের প্রশাসনিক যে কোন পর্যায়ের শীর্ষ পদে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্তমান ও সাবেক সদস্যরা কাজ করছেন। সিভিল প্রশাসনের ব্যাক্তিরা আছেন শুধু নামে মাত্র।

বর্তমানে দেশটির প্রশাসনের ওপর সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি। আরও দৃঢ় ও সুসংহত। সেনাবাহিনী জাতীয় সুরক্ষা এবং বৈদেশিক নীতির প্রচলিত ক্ষেত্রের অনেক জায়গা দখল করে নিয়েছে। এছাড়াও অর্থ, বাণিজ্য, অভ্যন্তরীণসহ রাজ্য শাসনের অন্যান্য দিকগুলিতে তাদের নিয়ন্ত্রণকে আরও জোরদার করেছে। এমনকি রেলপথ, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিসি) এবং মিডিয়া পরিচালনার বিষয়টিও নিয়ন্ত্রণ করছে দেশটির সেনাবাহিনী। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির সবকিছু নিয়ন্ত্রনে নিতে সেনাবাহিনীর কুটনৈতিক চালের অংশ হিসেবেই বর্তমান ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-কে রাষ্ট্রিয় ক্ষমতায় বসানো হয়। তারা সেনাবাহিনীর আজ্ঞাবহের ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশটির মন্ত্রীসভা গঠনেও সেনাবাহিনীর ছায়া উপস্থিতি প্রমাণ পাওয়া যায়। অভ্যন্তরীণ, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, রেলপথ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মূল জায়াগাগুলোতেও এমন সব লোকদের বসানো হয়েছে যাদের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এদের মধ্যে আছেন অর্থ উপদেষ্টা আবদুল হাফিজ শেখ; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার ইজাজ শাহ; বাণিজ্য বিষয়ক উপদেষ্টা আবদুল রাজাক দাউদ; প্রতিরক্ষা উত্পাদনমন্ত্রী জুবাইদা জালাল; রেলমন্ত্রী শেখ রশিদ; এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ক উপদেষ্টা ইশরাত হুসেন।

সম্প্রতি করোনা মোকাবেলায় ব্যর্থতা নিয়ে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে বেশ উত্তেজনাকার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় দেশটির প্রভাবশালি সংবাদ মাধ্যম জং এর প্রধান নির্বাহী মীর শাকিল-উর-রেহমান এর মধ্যে। করোনা মোকাবেলায় চরম ব্যর্থতার অভিযোগে ইমরান সরকারের বিরুদ্ধে প্রচুর লেখালেখি হয় দেশটির মূলধারার গনমাধ্যম জং এ। এ ঘটনার পরপরই তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ফেরদৌস আশিক আওয়ানকে পদচ্যুত করে তারস্থলে  সেনাবাহিনী জনসংযোগ এর প্রাক্তন মহাপরিচালক জেনারেল (অব:) অসীম সলিম বাজওয়াকে নিয়োগ দেওয়া হয়। মজার ব্যপার হচ্ছে এই ফেরদৌস আশিক আওয়ান সিভিলিয়ান হলেও তার মনোনয়ন দিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। বিরাজমান অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে তথ্য পরিচালনা ও  নিয়ন্ত্রণ করতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।  সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে সিপিসি কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসাবে লেঃ জেনারেল বাজওয়ার নেতৃত্বাধীন চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের অধীনে কৌশলগত প্রকল্পগুলি নিয়ন্ত্রণ করছেন।

করোনার এই দূর্যোগকালে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা বা লকডাউনের মত যে কোন সাধারণ বিষয়ও সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরপরই করোনার কারণে লকডাউন ঘোষনার বিষয়ে সামরিক বাহিনী এগিয়ে আসে সবার আগে। তারা লেকডাউন কার্যকরের পাশাপাশি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হামুদ-উজ জামানের নেতৃত্বে জাতীয় কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার (এনসিওসি) গঠন করে। জামান খান কোভিড-১৯ নীতি বাস্তবায়নের তদারকি করার জন্য, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী আসাদ উমরকে এনসিওতে অর্ন্তভূক্ত করলেও তিনি আসলে রয়েছে শুধু কাগজে কলমে। সব সিদ্ধান্ত আসছে সেনাবাহিনী থেকে।  

পাকিস্তানের সর্বাধিক জনবহুল এবং খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ পাঞ্জাব এবং বেলুচিস্তানের প্রদেশের প্রধান সচিব হিসেবে নিযুক্ত আছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। বেলুচিস্তানের মুখ্য সচিব ফাজিল আসগর একজন অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন। গত মাস অবধি পাঞ্জাবের মুখ্যসচিব ছিলেন প্রাক্তন আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা বিভাগের ডিজি মেজর (অব:) আজম সুলেমান খান। চিনি কেলেঙ্কারির তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পরে আজম খানকে সরিয়ে লেঃ জেনারেল হামেদ গুলকে পাঞ্জাবের মুখ্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

গিলগিত বালতিস্তান প্রদেশের বর্তমান মুখ্যসচিব মোহাম্মদ খুররাম আগা’ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এর সমাজকল্যাণের এজেন্ডার অংশ হিসাবে দরিদ্র পাকিস্তানীদের জন্য স্বল্প মূল্যে  ৫ মিলিয়ন আবাসন ইউনিট প্রকল্প ‘নয়া পাকিস্তান হাউজিং অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অথরিটির (ন্যপএইচডিএ) শীর্ষ দায়িত্বেও আছেন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা। প্রকল্পের ডেপুটি চেয়ারম্যনের দায়িত্বে আছেন মেজর জেনারেল (অব:) আমের আসলাম খান আর নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে আছেন ব্রিগেডিয়ার নাসির মনজুর মালিক।

অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর সদস্যরা দেশটির যেকোন গুরুত্বপূর্ণ সরকারী সংস্থাগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই যেমন পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ওয়াপদা); জাতীয় মহাসড়ক কর্তৃপক্ষ (এনএইচএ); সুই সাউদার্ন গ্যাস লিঃ (এসএসজিসিএল);  ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন (এফডাব্লুও); করাচি বন্দর ট্রাস্ট (কেপিটি); এবং বন্দর কাসিম কর্তৃপক্ষ (পিকিউএ) –এর শীর্ষ পদে আছেন দেশটির সাবেক সেনা কর্মকর্তারা।

পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে তার সশস্ত্র বাহিনীর এখতিয়ার তার জনগণ এবং সীমান্ত রক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই।  তারা দেশটির যে কোন বড় ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলোর সঙ্গেও জড়িত। শুধু তাই নয়; সেনাবাহিনীর স্বার্থের সঙ্গে জড়িত নয় এমন কাজগুলোর সঙ্গেও তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

সম্প্রতি পাকিস্তানের গনমাধ্যম ইংগিত দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত  সিন্ধুর গভর্নর ইমরান ইসমাইলকে সরিয়ে দেওয়া হবে। সেনাবাহিনীর নির্দেশে তার স্থলে বসানো হবে আইএসআ ‘র সাবেক ডিজি, লেঃ জেনারেল পাশাকে।

গত সাত দশকে রাজনীতি নিয়ে খেলতে গিয়ে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক কলাকৌশলে এবং আচরণে নিজেদের এতই দক্ষ করে তুলেছে যে কোন জন প্রশাসন তাদের আর্শিবাদ ছাড়া টিকতে পারবে না। আর ইমরান খান এটা বুঝতে পেরেছিলেন সবার আগে। সেকারণেই তিনি সেনাবাহিনীর আধিপাত্য মেনে নিয়েই তাদের কথামত দেশ পরিচালনা করছেন।

উপরে