আপডেট : ১৪ মে, ২০২০ ১৯:৫৬

সংখ্যালঘুদের রক্ষায় পাকিস্তানের ‘কাগুজে কমিশন’

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
সংখ্যালঘুদের রক্ষায় পাকিস্তানের ‘কাগুজে কমিশন’
পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। ছবি প্রতিকী

দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার পর্যবেক্ষক এবং পশ্চিমা মিডিয়ার চোখে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সবচেয়ে খারাপ দেশের তালিকায় পাকিস্তানের নাম ছিল সবার উপরে। গত ৫ মে এ কলঙ্ক মোচন করতে দেশটি সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার  জন্য একটি জাতীয় কমিশন গঠন করেছে । তবে এ কমিশন গঠন  ‘আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানের  ভাবমূর্তি উন্নয়নের ‘রুপক চেষ্টা’ যা কেবল ‘কাগজে কলমে’ এবং ‘মিথ্যা জনসংযোগ’ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।  

পাকিস্তানের সংসদের প্রাক্তন সদস্য ফারহানাজ ইস্পাহানি মতে, এবছরের ২৮ এপ্রিল ইউএস কমিশন ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম এর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় । এতে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় পাকিস্তানকে ব্যার্থ রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। এর পরপরই গত ৫ মে  পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় কমিশন গঠনের ঘোষনা আসে। ‍এর পর থেকে এই উদ্দেশ্যপূর্ণ ও ক্রুটিপূর্ণ কমিশন নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে নীজ দেশেই। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এই কমিশন গঠন এক ধরনের ধোঁকাবাজি হিসেবে আখ্যা দেয়। খ্রিস্টান সহ অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা সরকারের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন। সংখ্যালঘু অধিকার সম্পর্কিত পিপলস কমিশনের চেয়ারপারসন পিটার জ্যাকব সুপ্রিম কোর্টে কমিশনের বিরুদ্ধে রীট করারও ঘোষণা দিয়েছেন।

যদিও যুগের পর যুগ ধরে পাকিস্তান তার দেশের খ্রিস্টান, হিন্দু, শিখ এবং আহমদিদের ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি চরম অবহেলা প্রদর্শন করে আসছে। সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অধিকার ক্ষুন্ন হলেও রাষ্ট্রিয়ভাবে নেওয়া হয়নি কোন প্রতিকার।

 মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের ওই বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, "নিন্দনীয় ও আহমদিয়া বিরোধী আইনগুলির পদ্ধতিগত প্রয়োগ, এবং হিন্দু, খ্রিস্টান এবং শিখ সহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জোর করে ধর্মের বা বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করার বিষয়ে পাকিস্তান চরমভাবে ব্যার্থ হয়েছে"

ওয়াশিংটন এক্সামিনারে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ফারহানাজ ইস্পাহানি বলেন, সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘনকারী হিসাবে বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তানের নামের পাশে যে কলঙ্কের কালিমা জমা হচ্ছিল তা প্রশমিত করার জন্য পাকিস্তান এই কমিশন গঠন করেছে। যা শুধুই লোক দেখানো। সংবিধান থেকে শুরু করে পাকিস্তানের প্রচলিত আইনেও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্য স্পষ্ট।  পাকিস্তানী সমাজব্যবস্থার উঁচু  শ্রেণী এটি সমর্থন করে আসছে যুগের পর যুগ।

পাকিস্তানের মারাত্মক ব্লাসফেমি  আইনগুলি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে আসছে সংখ্যালঘুদের। বিশেষ করে হিন্দু এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে। চরমভাবে ধর্মীয় অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে তাদের। এই যেমন পাকিস্তানে কম বয়সী হিন্দু এবং খ্রিস্টান ছেলে মেয়েদের জোর করে ধর্মান্তরের খবর এখন সাধারণ ঘটনা। এমনকি এসব ধর্মান্তরের খবর ফলাও করে প্রচার করা হয় সামাজিক মাধ্যমে। সরকারী ও বেসরকারী বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমেও অন্য ধর্মগুলোর প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। শিশুদের মধ্যে অন্য ধর্মের শিশুদের প্রতি ঘৃণা বা তাচ্ছিল্য প্রকাশ শেখানো হয়।  হাস্যকর বিষয় হচ্ছে সংখ্যালঘু হলেও  আহমেদিয়া সম্প্রদায়কে রাখা হয়েছে এই কমিশনের বাইরে। তারা নীজেদের মুসলিম হিসেবে বিবেচনা করলেও পাকিস্তান তাদের স্বীকার করে না। এ কারণে সংখ্যালঘু হয়েও কমিশনের আওতার ঠাই হয়নি তাদের। এসব কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পাকিস্তানের আলেম ও রাজনীতিবিদরা। পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন রষ্ট্রিয় এক বাহিনী। নিরস্ত্র সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তীব্র সহিংসতা এবং বোমা হামলা, উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু করাসহ নানা হামলার ঘটনাও ঘটছে প্রতি সপ্তাহে।

কমিশনের বিষয়ে জাতিসংঘের প্রাক্তন রেপুর্টার হিনা জিলানী বলেছেন, সংসদে বিল পাশের মাধ্যমে অন্যান্য জাতীয় কমিশনের যেভাবে তৈরি করা হয় সংখ্যালঘু কমিশন সেভাবে তৈরি করা হয়নি।  ফারহানাজ ইস্পাহানির মতে, সংবিধান সংশোধন এবং অসম আইন পরিবর্তন করার কোন এখতিয়ার দেওয়া হয়নি নতুন এই কমিশনকে। এতেই বোঝা যায়ে  পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের ধর্মীয়  অধিকার রক্ষায় কোন ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না কমিশন করে। এটি পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের ২০১৪ সালের রায়কে কাগজে কলমে কার্যকর করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ইস্পাহানি বলেন, পাকিস্তান সরকারের উদ্দেশ্য ছিল অকার্যকর একটি  প্রতীকী কমিশন তৈরি করা যার বহু দশক ধরে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় বৈষম্য রোধ করার কোন ক্ষমতাই থাকবেনা। বাস্তবে হয়েছেও তাই। পাকিস্তান ইতিমধ্যে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করেছে। কারণ কমিশন গঠনের পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে "ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষার দিকে পাকিস্তানের অব্যাহত যাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।" হিসেবে প্রশংসা করেছিল। অথচ এর কিছু দিন পরে যখন করোনা দূর্যোগ এলো তখন পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু হিন্দু ও খ্রিস্টানদের  খাদ্য সহায়তা দিতে অস্বীকার করার ঘটনা প্রকাশ পায়। এর তীব্র  নিন্দা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের নিরাপদ দূরে রেখে ও নানা কায়দা করে বেশ কয়েক বছর ধরে পারমানবিক শক্তি থেকে শুরু করে সন্ত্রাসবাদসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেশটির চাপ ঠেকিয়ে আসছে পাকিস্তান। সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতার দিতে কমিশন বানানোর ক্ষেত্রেও একই কৌশল অবলম্বন করছে পাকিস্তান। এক্ষেত্রে কৌশল হচ্ছে সরকারী কাগুজে নীতি প্রণয়ন। মিথ্যা জনসংযোগ। মার্কিন কর্মকর্তাদের সেই ফাঁদে পড়া ঠিক হবে না।

ফারহানাজ ইস্পাহানি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রিলিজিয়াস ফ্রিডম ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এবং  ‘পিউরিফিং দ্য দি পিউর: হিস্ট্রি অফ পাকিস্তানস রিলিজিয়াল মাইনরিটিস’ এর লেখক।

 

 

উপরে