আপডেট : ২৬ মার্চ, ২০২০ ১১:২২

করোনায় মরার আগে 'ক্ষুধায়' মরার শঙ্কা

আন্তর্জাতিক
করোনায় মরার আগে 'ক্ষুধায়' মরার শঙ্কা

পুরো ভারত লকডাউন। দেশটির ১৩০ কোটি মানুষকে বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মঙ্গলবারের এ ঘোষণা রীতিমতো মৃত্যুর পরোয়ানা হিসেবে হাজির হয়েছে ভারতের দিনমজুরদের আঙ্গিনায়।

শুধু কৃষক-শ্রমিক নয়, দেশটির নিুআয়ের প্রায় ৪০ কোটি শ্রমিকের এখন একটাই চিন্তা- কী খাব, কে খাওয়াবে? বুধবার বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে খেটে খাওয়া মানুষের এ অসহায় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, করোনায় মরার ভয়ের চেয়ে, না-খেয়ে মরার ভয়ে দিশেহারা হয়ে উঠেছে দেশটির ‘দিন এনে, দিন খাওয়া’ শ্রেণির মানুষগুলো।

মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওই দিন মধ্যরাত থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ৩ সপ্তাহ দেশ লকডাউনে থাকবে বলে ঘোষণা করেছেন। এমনিতে রাজধানী দিল্লির শহরতলি অঞ্চল নয়ডার লেবার চক অঞ্চল সব সময় পরিপূর্ণ থাকে কাজের খোঁজে থাকা নির্মাণশ্রমিকে।

ভবন নির্মাতারা এই জায়গায় এসে শ্রমিক ভাড়া করে নিয়ে যান। তবে জনতা-কারফিউ চলাকালে রোববার সকালে বিবিসির সাংবাদিক বিকাশ যখন ওই এলাকায় যান, তখন এলাকাটি ফাঁকা, পুরোপুরি শান্ত, চুপচাপ।

শুধু পাখির কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছিল; যা এলাকাটিতে কল্পনাও করা যায় না বলে মন্তব্য তার। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কয়েকজন লোককে দেখতে পান বিকাশ। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন, তারা জনতা-কারফিউ মেনে চলছে কি না।

সেখানে উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বানডা জেলা থেকে কাজের খোঁজে আসা রমেশ কুমার জানান, ভাড়া নেয়ার জন্য এখানে কেউ না-ও আসতে পারেন- এটা জানেন তিনি; কিন্তু তারপরও কোনো কাজ পাওয়া যায় কি না, দেখতে এসেছেন।

রমেশ বলেন, ‘প্রতিদিন আমি ৬০০ রুপি উপার্জন করি। ঘরে খাওয়ার লোক পাঁচজন। ঘরে যে খাবার আছে কয়েকদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। করোনাভাইরাসের ভয় আমারও আছে; কিন্তু আমার সন্তানরা না খেয়ে আছে- এটি সহ্য করতে পারব না আমি।

এলাহাবাদ শহরের রিকশাচলাক কিশান লাল তাদেরই একজন। আগের চার দিন তিনি কোনো কামাই করতে পারেননি বলে জানান। ‘আমার পরিবারকে খাওয়ানোর জন্য উপার্জন করা দরকার।

আমি শুনেছি, সরকার আমাদের টাকা দেবে; কিন্তু কখন কীভাবে দেবে, তা জানি না,’ বলেন তিনি। কিশানের বন্ধু আলী হাসান একটি দোকানে ক্লিনারের কাজ করেন। খাবার কেনার মতো কোনো টাকা নেই বলে জানান তিনি।

দুই দিন আগে দোকান বন্ধ হয়ে গেছে; কিন্তু আমার টাকা পাই নাই। কখন দোকান খুলবে তা-ও জানি না। আমি খুব ভয়ে আছি। আমার পরিবার আছে, তাদের খাওয়াব কীভাবে।’ দিল্লিতে ছোট একটি দোকানে লাচ্ছি বিক্রি করেন মোহাম্মদ সাবির।

আসছে গ্রীষ্মের কথা মাথায় রেখে ব্যবসা বাড়ানোর জন্য দু’জন লোক রেখেছিলেন তিনি। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘এখন আমি তাদের বেতন দিতে পারব না। আমার কাছে টাকা নেই। গ্রামে থাকা পরিবার চাষাবাদ করে কিছু আয় করে; কিন্তু শিলাবৃষ্টিতে এবার ফসলও নষ্ট হয়েছে, এখন তারা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি অসহায়বোধ করছি! মনে হচ্ছে, করোনাভাইরাসে মরার আগে ক্ষুধাই আমাদের মতো অনেককে মেরে ফেলবে।’ ভারতজুড়ে ৪৭ কোটি দিনমজুরের এই একই অবস্থা। তিন সপ্তাহ লকডাউন চলার সময় তাদের আয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই।

আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এ রকম অনেক পরিবারের মজুদ খাবার শেষ হয়ে যেতে পারে। উত্তর প্রদেশ, কেরালা ও রাজধানী দিল্লিসহ বেশ কয়েকটি রাজ্য সরকার রমেশের মতো শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) বলছে, ভারতের শ্রমিকদের অন্তত ৯০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত, যাদের অনেকেই নিরাপত্তারক্ষী, ক্লিনার, রিকশাচালক, হকার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও গৃহকর্মী।

অধিকাংশই পেনশনের আওতায় নেই, অসুস্থতাজনিত ছুটি, সবেতন ছুটি বা কোনো ধরনের ইন্স্যুরেন্সও নেই তাদের। অনেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টও নেই। দৈনিক চাহিদা পূরণে নগদ টাকার ওপরই নির্ভর করেন তারা।

অনেকেই কাজের খোঁজে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যাওয়া অভিবাসী শ্রমিক। এর অর্থ যে রাজ্যে কাজ করছেন সেই রাজ্যের বাসিন্দা তারা নন। এমন অনেক লোক আছেন যারা সারা বছর কাজের খোঁজে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে ঘোরেন। জনসংখ্যার ভাসমান এই অংশকে নিয়েও সমস্যা আছে।

 

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/ধ্রুব  

উপরে