মুজিববর্ষে আগামীকাল ঢাকায় 'পাকিস্তান দিবস' উদযাপন! | BD Times365 মুজিববর্ষে আগামীকাল ঢাকায় 'পাকিস্তান দিবস' উদযাপন! | BdTimes365
logo
আপডেট : ২২ মার্চ, ২০২০ ২৩:১৩
মুজিববর্ষে আগামীকাল ঢাকায় 'পাকিস্তান দিবস' উদযাপন!
অনলাইন ডেস্ক

মুজিববর্ষে আগামীকাল ঢাকায় 'পাকিস্তান দিবস' উদযাপন!

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুচনা হয়েছিল ১৯৪৮ সালে যখন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় ঘোষণা করেছিলেন যে উর্দু্‌ই হবে পুরো পাকিস্তানের (পূর্ব এবং পশ্চিম) মাতৃভাষা। যেটি  তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র ক্ষোভের কারণ হয়ে উঠেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা  হওয়ায় তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান জিন্নাহর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল।তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ‘ভাষা আন্দোলনে’ হয়েছিল মুহম্মদ আলী জিন্নাহর বাংলাভাষী মানুষের উপর উর্দু চাপানোর এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার জন্যই।এ কারণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি জয়গায় পুলিশের সঙ্গে সহিংসতায় অনেক শিক্ষার্থী ও বুদ্ধিজীবী প্রাণ হারান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ‘ভাষা আন্দোলন’ গতি দেওয়ার পাশাপাশি ধর্মও একটি ব্যাপক ভুমিকা রেখেছিল।এটি স্পষ্টতই দেখা যায় যে, পূর্ব পাকিস্তানের জন্মের পূর্বে তৎকালীন বাংলায় (পূর্ব পাকিস্তান) ধর্ম কখনই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।তবে সম্পূর্ন বিপরীতে ছিল পশ্চিম পাকিস্কতান। সেখানে ধর্ম দিয়েই সবকিছু বিবেচনা করা হতো এবং মানুষকে ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভক্ত করা হতো। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘দুই জাতি তত্ত্ব’ এক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

২১ শে ফেব্রুয়ারিকে পরবর্তীতে ইউনেস্ক ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করে। নিঃসন্দেহে ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের মুক্তির পথ প্রশস্ত করেছে। পূর্ব পাকিস্তানীরা গভীরভাবে নিজেকে বাঙালি হিসাবে চিহ্নিত করেছিল এবং ‘বাঙালিত্ব’ তাদের সংস্কৃতি মূর্ত করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানীরা সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার দিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তানীদের চেয়ে এগিয়ে ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই সময়কালে পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে শিক্ষার একটি বিশেষ মর্যাদার আসনে ছিল। উপরোক্ত ঘটনাগুলি এই অর্থে গুরুত্বপূর্ণ যে, ঢাকায় একটি নির্দিষ্ট কূটনৈতিক মিশনে ২৩ শে মার্চ ১৬ কোটি বাংলাদেশির অনুভূতিকে অবজ্ঞা করে ‘পাকিস্তান দিবস’ উদযাপন করার কথা রয়েছে। তারা একটি গল্প উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন যে, মুসলমানদের কাছে দিনটি (২৩ শে মার্চ) গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু ১৯৪০ সালে তৎকালীন মুসলমানরা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের আধিপত্য থেকে স্বাধীনতা অর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে তারা ভুলে যেতে ব্যর্থ হন যে, ধর্মীয় কার্ড খেললে তাদের কোনও লভ্যাংশ দেওয়া যায় না, কারণ বাংলাদেশের ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র এবং গণতন্ত্রের চারটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। এই বিশেষ মিশনের উদ্দেশ্য বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক বিভেদ বাড়িয়ে তোলা এবং প্রতিবেশী ভারতের সাথে বিভেদ সৃষ্টি করা, যার মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে অটল সমর্থন দিয়ে পাশে থেকেছিল।মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে তাদের গণহত্যা সম্পর্কে দু: খ প্রকাশ না করে তারা ২৩ শে মার্চকে নিজের এজেন্ডা অনুসারে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটাও মুজিববর্ষের সময়।

বাংলাদেশ এমন এক সংগ্রামের দ্বারা জন্মগ্রহণ করেছিল যা সম্ভবত এই উপমহাদেশের ইতিহাসে অনন্য। এই সংগ্রামের আরও গভীরে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের এর ভন্ডামি এবং তার কুফলগুলি। ১৯০৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ব বাংলা তৈরির মাধ্যমে ধর্মীয় ভিত্তিতে 'বঙ্গভঙ্গ' করার প্রথম প্রয়াস ব্রিটিশরা করেছিল। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলেও পূর্ব বাংলায় মুসলমানরা জনসংখ্যার বেশি ছিল। তবে ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভাজন টিকিয়ে রাখতে পারেনি এবং কঠোর প্রতিরোধের মুখে ১৯১১ সালে 'বঙ্গভঙ্গ' বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। ব্রিটিশরা যখন স্বাধীন ভারতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চলেছিল তখন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তৎকালীন অবিভক্ত ভারত বিভাগকে আরও একবার ধর্মীয় রীতিতে বিভক্ত করায় জোর দিয়েছিলেন। জিন্নাহর এই তত্ত্বটি এই উপমহাদেশের ইতিহাসে 'দ্বি-জাতীয় তত্ত্ব' হিসাবে বহুল পরিচিত। তবে এবার জিন্নাহ সফল ছিলেন। তার কূটকৌশলে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বতন্ত্র দেশ জন্মগ্রহণ করেছিল ১৫ ই আগস্ট, ১৯৪৭ সালে।ভারত বিভাগের পরে ভারতবর্ষ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং পাকিস্তান একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পাকিস্তানের দুটি অংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তান ভৌগোলিকভাবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে ভারতীয় অঞ্চল দিয়ে পৃথক হয়েছিল। এই বিচ্ছেদ কেবল দুটি অংশের মধ্যে বিশাল ভৌগলিক দূরত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, পাশাপাশি ভাষা এবং সংস্কৃতিতেও ছিল বিস্তর ফারাক। প্রকৃতপক্ষে, শেষ দুটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমানে বাংলাদেশ) পাকিস্তানের খপ্পর থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে (চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার জন্য উপদেষ্টা প্যানেলের প্রতিবেদন ১৯৭০-৭৫, ভলিউম-১) অনুসারে, পূর্ব পাকিস্তান  সর্বদা পশ্চিমা পাকিস্তানের পিছনে ছিল। ১৯৫০/৫১-১৯৫৪ /৫৫ এ, মোট ব্যয়ের ৪৬ শতাংশ পূর্ব অংশে ব্যয় করা হয়েছিল, বাকি অংশ পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ১৯৫৫ / ৫৬-১৯৫৯-৬০ সালে পূর্বাংশের জন্য বরাদ্ধের চিত্রটি আরও কমেছে, সেখানে ৩২ শতাংশে নেমে আসে এই বরাদ্দ। পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় এই অঞ্চলটি (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) বেশি জনবহুল হওয়া সত্ত্বেও ১৯৫০ / ৫১-১৯৬৯-৭০-এর সময়কালে মোট জাতীয় বাজেটের গড়ে ৩৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের রফতানি আয় ছিল ৭০শতাংশ অথচ পূর্বের জন্য আমদানি ব্যয় করা হতো মাত্র ২৫ শতাংশ। ১৯৪৮ সালে, পূর্ব পাকিস্তানের ১১টি টেক্সটাইল মিল ছিল, যখন পশ্চিমে ছিল মাত্র ৯টি। ১৯৭১ সালে এই চিত্র উল্টে দাঁড়ায় পূর্ব পাকিস্তানে ১৫০টি বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র এই সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ২৬টি। উপরের পরিসংখ্যানগুলি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, পাকিস্তান (তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তান) পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করা এবং শোষণের নীতি অবলম্বন করেছিল, যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তির পথ সুগম করেছিল। এটি আরেকটি উদাহরণ যা পাকিস্তানকে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের ভন্ডামি প্রকাশ করে।

'পাকিস্তান দিবস' যা প্রতিবছর ২৩ শে মার্চ পালিত হয়। এটা তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান উভয় অংশেই পালিত হত। তবে ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানে 'অপারেশন সার্চলাইট' চালু করার পর থেকে পূর্বের মুসলিম জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভণ্ডামি ধরে ফেলে। এখন আবার এই দিবস পালন ভন্ডামির চূড়ান্ত উদাহরণ।১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা সেনা সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে এসে ঢাকার নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর গণহত্যা শুরু করে, পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে একযোগে আক্রমণ শুরু করে, শেখ মুজিবুর রহমানকে রাত ১টা ১৫ মিনিটে গ্রেপ্তার করে তার বাসা থেকে। অবশ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অবশ্য শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তারের কয়েক মিনিট আগেই ঘোষণা করেছিলেন। গভীর রাতে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক কোয়ার্টারে অভিযান চালিয়ে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে হত্যা করে।

সুতরাং সংক্ষেপে বলা যায়, যে কেউ সহজেই দেখতে পাবে যে ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক শোষণ এবং পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) উপর তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য প্রভৃতি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পিছনে মূল ভুমিকা রেখেছিল, ধর্ম নয়। ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ১৭ মার্চ ২০২১ সাল বাংলাদেশে যে মুজিববর্ষ পালন করা হচ্ছে তা অবশ্যই শান্তিপূর্ণ এবং পুরো উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক আবেগ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। পাকিস্তানের নীল নকশাকে এটা অবশ্যই পরাস্ত করবে।

২৩ শে মার্চ 'পাকিস্তান দিবস' উদযাপন এই কূটনৈতিক মিশনের স্পষ্টতই একটি দুষ্টু পদক্ষেপ। তারা ২৫-২৬ মার্চ নিরীহ বেসামরিক বাঙালিদের  উপর পাকবাহিনীর  বর্বর আক্রমণের দ্বারা ক্ষতগুলিকে ভুলে গেছে, যখন রাজাকার, আলবদর এবং আল-শামসের সহযোগিতায় নির্মম বাহিনীর দ্বারা গণহত্যা করা হয়েছিল। "মুজিববর্ষ" বাংলাদেশের একক এবং পবিত্র অনুষ্ঠান। ১৬ কোটি বাংলাদেশিদের অনুভূতির সঙ্গে জড়িত।এমন পরিস্থিতিতে ঢাকায় 'পাকিস্তান দিবস' উদযাপন পাকিস্তান সরকারের ঘৃণ্য কূটকৌশলেরই অংশ। মুজিববর্ষে এই জাতীয় কর্মকাণ্ড হতাশাব্যঞ্জক এবং সর্বোপরি তাদের গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নেরই প্রতিফলন।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/ধ্রুব