নেপথ্যে ‘স্বাধীন খালিস্তান’ আন্দোলনে গতি দিতে ভারতীয় শিখদের আস্থা অর্জন | BD Times365 নেপথ্যে ‘স্বাধীন খালিস্তান’ আন্দোলনে গতি দিতে ভারতীয় শিখদের আস্থা অর্জন | BdTimes365
logo
আপডেট : ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১৮:৩৩
কার্তারপুর করিডোর খুলে দিল পাকিস্তান
নেপথ্যে ‘স্বাধীন খালিস্তান’ আন্দোলনে গতি দিতে ভারতীয় শিখদের আস্থা অর্জন
সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন

নেপথ্যে ‘স্বাধীন খালিস্তান’ আন্দোলনে গতি দিতে ভারতীয় শিখদের আস্থা অর্জন

সম্পর্কের তীব্র রেষারেষীর মধ্যেই গত ৯ নভেম্বর পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের কার্তারপুর করিডোর খুলে দেয় পাকিস্তান। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নীজেই করিডোরটির উদ্বোধন করেন। এর  ফলে পাকিস্তানের কার্তারপুর করিডোর দিয়ে ভারতীয় শিখ পুণ্যার্থীরা ভিসা ছাড়াই পাকিস্তানের ভূখন্ডে প্রবেশ করতে পারছেন।

কার্তারপুর করিডোরের অবস্থান পাকিস্তানের পাঞ্জাবে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার সময় যে সীমান্তরেখা টেনেছিল তার ফলে ওই তীর্থস্থানটি পাকিস্তানের  মধ্যে পড়ে যায়। ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে আরও চার কিলোমিটার যাওয়ার পর কার্তারপুরের গুরুদুয়ারা দরবার শরীফ। শিখ সম্প্রদায়ের পবিত্র তীর্থস্থান। সীমান্ত লাগোয়া পূর্ব পাশেই ভারতের শিখ অধ্যুষিত অমৃতসর শহর। তাদের দীর্ঘদিনের ইচ্ছার প্রেক্ষিতে গত মাসে এই করিডোর উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ। শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু নানকের ৫৫০ তম জন্মবার্ষিকীকে সামনে রেখে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান। এর ফলে তীর্থস্থানে যাওয়ার বিশেষ অধিকার পেলেন ভারতে বসবাসরত শিখরা। টানা কয়েক বছর ধরে ভারত পাকিস্তান এ দুটি দেশের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সর্বশেষ কাশ্মির ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্কে স্মরণাতীত টানাপোড়েন চলছে। তার মধ্যেই ভারতের পুণ্যার্থীদের জন্য পাকিস্তান তাদের সীমান্ত খুলে দিয়ে বড় ধরণের উদারতার পরিচয় দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন। করিডোরটি উদ্বোধন করার মুহুর্তে সেদিন ইমরান খান বলেছিলেন- ‌‌‌‌‍‍ কেবল সীমান্ত খুলে দেয়া নয়, পাকিস্তান তাদের হৃদয় দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ভারতে পূণ্যার্থী শিখদের প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধাবোধও’  একই বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন – দুদেশের মধ্যে চাপা টেনশন ও শীতল সম্পর্ক দূর করতে এ উদ্যোগ বিশেষ ভুমিকা পালন করবে। তিনি উদ্যোগটিকে তুলনা করেছিলেন ১৯৮৯ সালে দুই জার্মানের মাঝে বার্লিন দেয়াল পতনের সং্গে।

তবে মাস যেতে না যেতেই  এই উদ্যোগের মধ্যখানে বিষবাষ্পের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে সন্দেহ আর অবিশ্বাস। ভারত পক্ষের দাবী এই উদ্যোগটি ছিল পাকিস্তানের নতুন এক ষড়যন্ত্রের প্লট। যে কারণে কার্তারপুর করিডোর নিয়ে শুরুতে প্রবল উৎসাহ দেখালেও শেষ মুহুর্তে এসে এই উদ্যোগ ভারতকে প্রবল দ্বিধা আর সংশয়ে ফেলে দিয়েছে। কারণ, করিডোরের উদ্বোধনের ঠিক আগে পাকিস্তান খালিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রমোট করার প্রমাণ মিলেছে। এই অনুষ্ঠানের প্রমোশনাল ভিডিওতে স্থান পেয়েছে জার্নাইল সিং ভিন্দ্রেনওয়ালে, মেজর সেহবেগ সিং, আমৃক সিং এর মতো নিহত ব্যক্তিরা। শিখ বিচ্ছিন্নতার সমর্থকরা যাদের ভাবেন শহীদ আর ভারত সরকার ভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী।ভারতীয় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং এই কারণেই গণমাধ্যমকে বলেছেন, প্রথম দিন থেকেই তাদের সন্দেহ ছিলো এই করিডোর বানানোর পেছনে পাকিস্তানের কোনও গোপন এজেন্ডা আছে।

তার দাবীএই করিডোর খুলে দেওয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান ভারতের শিখ সম্প্রদায়কে আস্থায় আনার চেষ্ঠা করছে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর মাধ্যমে ভারতীয় শিখদের দিয়ে স্বাধীন খালিস্তান আন্দোলন বেগবান করানোর অপচেষ্ঠায় লিপ্ত রয়েছে। ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটের দাবিতে ‘শিখস ফর জাস্টিস (এসএফজে)’ নামে একটি সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা করছে পাকিস্তান। ২০২০ সালে ওই গণভোট করার দাবিতে এই সংগঠন এবং আন্দোলনে প্রত্যক্ষ সহায়তা করেছে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘শিখস ফর জাস্টিস’সংস্থাটি গঠিত হয় ২০০৭ সালে। পাঞ্জাব প্রদেশকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন ‘খালিস্তান’ রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যে ‘শিখ ফর জাস্টিস’ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পাকিস্তানের সহায়তায় এরা ২০২০ সালে গণভোটের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে। এই সংগঠনের প্রধান হিসেবে আছেন গুরপাতওয়ান সিং পান্নু এবং অবতার সিং পান্নু নামের দুই ভারতীয় বংশদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। এই সংগঠনের অধিকাংশ নেতারা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় বসবাস করেন। এরা পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী ছোট ছোট গ্রুপগুলোকে একত্রিত করা এবং তাদের ফান্ডিং করে থাকে।  তাদের প্রধান লক্ষ্য স্বাধীন খালিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

‘শিখস ফর জাস্টিস’ সংস্থাটির লক্ষ্য চলতি বছরের নভেম্বরে ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে স্বাধীন ‘খালিস্তান’ রাষ্ট্রের দাবিতে গণভোটের আয়োজন করা। এবং সে জন্য উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন , সিঙ্গাপুর ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত শিখদের অনলাইনের মাধ্যমে একত্রিত করা। এই গণভোট ক্যাম্পেইনের উদ্দেশ্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শিখদের একত্রিত করে পাঞ্জাবকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এসএফজে এর প্ল্যান স্বাধীন খালিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অনলাইনে কমপক্ষে ৫০ লাখ ভোট যোগাড় করা। এই ভোট যোগাড় করে সেটা গণভোটের পক্ষের সমর্থন হিসেবে তারা জাতিসংঘে প্রেরণ করবে। আর এই কাজের পেছনে ইন্ধন জোগাচ্ছে পাকিস্তানের আইএসআই। তারা যেভাবে খালিস্তানি নেতাদের উসকানি দিয়ে কানাডা ও ব্রিটেনে বসবাসকারী শিখ সম্প্রদায়কে ভারত-বিরোধিতার কাজে লাগাচ্ছে তাতে বেশ উদ্বিগ্ন ভারত সরকার। এসজেএফ নেতাদের লজিস্টিক সাপোর্ট দিচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিক সংগঠন, যাদের সঙ্গে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের যোগসূত্র আছে। এমনকি সংগঠনটির ওয়েবসাইটও পাকিস্তানের করাচি থেকে পরিচালনা করা হয় বলে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ মিলেছে। এই গোষ্ঠিটি উস্কানি দিয়ে পাঞ্জাবের তরুণদের বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে এমনকি তাদের অর্থনৈতিক সাহায্যও করছে।

শিখস ফর জাস্টিসকে (এসজেএফ) তাদের এসব বেআইনি কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ভারত সরকার ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করেছে। গুগল সম্প্রতি প্লে-স্টোর থেকে ‘২০২০ শিখ গণভোট’ নামের তাদের একটি অ্যাপ মুছে ফেলেছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে পাঞ্জাবে গণভোটের জন্য মানুষ সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছিল। এই অ্যাপের ভোটারদের ডাটা yestokhalistan.org নামের একটি ওয়েবসাইটে যাচ্ছিল। এই ওয়েবসাইটটি পরিচালনা করছিল এসজেএফ এর সদস্যরা।

কয়েক যুগ ধরে পাঞ্জাব প্রদেশে সংখ্যাগুরু শিখ ধর্মাবলম্বীদের একাংশ ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘স্বাধীন খালিস্তান’ রাষ্ট্র গড়ার আন্দোলন চালিয়ে আসছে। গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে ওই আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছিল। ১৯৮৪ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী শিখরাই ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ওপর গুপ্তহত্যা চালায়। এছাড়া সে সময় আয়ারল্যান্ড উপকূলে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি প্লেনও বিধ্বস্ত করে তারা। ওই ঘটনায় যাত্রী ও ক্রুসহ ৩২৯ জন নিহত হন। পরবর্তীতে ৯০ দশকে ভারত সরকারের ব্যাপক পুলিশি অভিযান, ধরপাকড় ও জনসমর্থন হারানোর ফলে স্তিমিত হয়ে পড়ে স্বাধীন খালিস্তান আন্দোলন। 

কিন্তু কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদের ঘটনায় উদ্ভূত পরিস্থতির সুযোগে পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতায় আবারও বিচ্ছন্নতাবাদী শিখদের ওই আন্দোলন দানা বাঁধছে বলে আশঙ্কা ভারতের। এরই মাঝে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্বাধীনতাকামী শিখ প্রতিনিধিরা পুনরায় খালিস্তান আন্দোলনের ছাইচাপা আগুন জ্বালাবার চেষ্টা করছে। কাশ্মীর ইস্যুতে বিশেষ সুবিধা করতে না পারার ফলেই পাকিস্তান এবার নিজেদের সীমান্তঘেঁষা পাঞ্জাবকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ ভারতের বিভিন্ন মহলের। 

গত ২৯ আগস্ট জাপানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ এ বিষয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে জানানো হয়, সম্প্রতি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক জেনারেল মির্জা আসলাম বেগ প্রকাশ্যে শিখদের খালিস্তান আন্দোলনকে সহযোগিতা ও সমর্থনের ব্যাপারে ইসলামাবাদকে আহ্বান জানায়। আসলাম বেগ বলেন, ‘ভারতকে সঙ্কটে ফেলতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও সরকারের উচিত খালিস্তান আন্দোলনকে ব্যবহার করা।’ 

কাশ্মীর নিয়ে দুই দেশের চলমান দ্বন্দের মাঝে পাকিস্তান ভারতের কূটনীতিক বহিষ্কার, বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও পাঞ্জাবের করতারপুর করিডোর খুলে দেওয়া এবং ভারতীয় শিখদের ভিসা ছাড়াই পাকিস্তান ভ্রমণের মতো উদারতা দেখিয়েছে, যেটা অনেকাংশেই সন্দেহজনক।

এসব ছাড়াও, গুরুদুয়ারা দর্শনে পাকিস্তান সফরকালে শিখ জনগোষ্ঠী ভারতবিরোধী বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণার সম্মুখীন হচ্ছেন বলেও উদ্বেগের কমতি নেই ভারত সরকারের। 

ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন ও জম্মুভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশ্লেষক অনিল গৌড় জানান, ভারত বর্তমানে সেই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ১৯৮০-র দশকে খালিস্তান আন্দোলন নিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় পাঞ্জাবে শত শত নিরীহ মানুষ নিহত হন। কাশ্মীর ইস্যুতে নিজেদের চাওয়া পূরণে ব্যর্থ হয়ে, পাঞ্জাবে সহিংসতা ছড়ানোর অভিপ্রায়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান ।     

অন্যদিকে কানাডাভিত্তিক শিখ ব্যবসায়ী ও সক্রিয় কর্মী জিতেন্দর সিং কাশ্মীর ইস্যুতে উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলেন, ‘জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদের সিদ্ধান্ত শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য এক আশীর্বাদ। এটি শিখদের স্বাধীন মাতৃভূমির দাবিতে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছে। খুব শিগগিরই কাশ্মীরি ও শিখরা ভারত থেকে মুক্ত হবে।’ 

শিখস ফর জাস্টিস’ ২০২০ সালে স্বাধীন খালিস্তান ইস্যুতে শিখ অধ্যুষিত পাঞ্জাবে গণভোট আয়োজনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছে বলেও জানান এ শিখ নেতা।

ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অনলাইন মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও টুইটারে খালিস্তানপন্থী লেখা পোস্ট করা অ্যাকাউন্টগুলোর বেশিরভাগই পাকিস্তানিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে রোহিঙ্গা ও কাশ্মীরিদের প্রতি সংহতিও প্রকাশ করা হয়। যাতে বিশ্বব্যাপী মুসলিম সম্প্রদায়ের সহানুভুতি পাওয়া যায়।

‘খালিস্তান’ হলো পাঞ্জাবি শব্দ যার অর্থ হলো বিশুদ্ধ ভূমি। পাঞ্জাবের শিখরা পাঞ্জাব অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি স্বতন্ত্র ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে আন্দোলন শুরু করে তাই মূলত খালিস্তান আন্দোলন নামে পরিচিত। ১৯৪০ সালে যখন ব্রিটিশ ভারতে মুসলিম লিগ লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবি জানায়। তখন শিখ নেতারা ভাবেন যে, ভারত ভাগ হলে কোন স্বাধীন শিখ রাজ্য থাকবে না। তাই তারা বৃহত্তর পাঞ্জাবে একটি খালিস্তান নামক রাষ্ট্রের ধারণা দেন। অনেক শিখরা বিশ্বাস করে থাকেন, ৪৭-এ ভারত ভাগ হওয়ার সময় তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, তাদেরকেও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দেওয়া হবে। পরবর্তীতে তা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে।

বর্তমানে শিখদের আন্দোলন বলতে গেলে বাতাসের সাথে মিলিয়ে গেছে। এর কারণ মূলত আশির দশকে সশস্ত্র রূপ নেয় ‘খালিস্তান আন্দোলন’। প্রবাসী শিখদের অর্থেই পরিচালিত হতো এই আন্দোলন। পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়, যখন প্রশাসনের সমান্তরালে থেকেই রাজ্য চালানো হতো স্বাধীনতাকামীদের নিয়ন্ত্রিত স্বর্ণমন্দির থেকে। এই পরিস্থিতির ইতি টানতেই স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয় ভারত সরকার।  নৃশংস ওই অভিযানে খালিস্তানের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এরই জের ধরে দুই শিখ দেহরক্ষীর হাতে নিহত হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এই হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতজুড়ে শিখবিরোধী দাঙ্গায় তিন হাজার লোক নিহত হয়।

নব্বই দশক থেকেই খালিস্তানের আকাঙ্ক্ষা ফিকে হতে শুরু করে। আর এখন 'খালিস্তান' সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে প্রতিবছর ৬ জুন পাঞ্জাবে টুকটাক বিক্ষোভ করে বার্ষিকী পালনের মধ্যে। তবে ব্রিটেন, কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রের বসবাসকারী প্রবাসী শিখরা এখনো স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেন।তাদের সংখ্যা এককোটি ৮০ লাখ থেকে তিন কোটির মধ্যে। মাতৃভূমির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষাকারী এই প্রবাসী শিখরা এখনো খালিস্তানকে সমর্থন করেন। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আদর্শকে ধরে রাখতে তহবিলের জোগানও দিয়ে যাচ্ছেন তারা। আর এদের পেছন থেকে ইন্ধন দিচ্ছে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই।

তবে এখন 'পাঞ্জাবে জনমত পাল্টেছে। এখন স্বাধীন খালিস্তান বেঁচে আছে ব্লু স্টার বার্ষিকীর লিফলেট আর স্লোগানে। কিন্তু তা কি পুরোপুরি বাস্তব নাকি এর উল্টো পিঠও আছে, যারা এখনও স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে? হ্যাঁ খালিস্তান আন্দোলন যে পুরোপুরি শেষ তা বলার উপাই নেই কারণ, যেহেতু প্রবাসী শিখরা আগামী ২০২০ সালে একটি গণ ভোট আয়োজেন করতে যাচ্ছে। যার মূল উদ্দেশ্য হলো একটি স্বাধীন এবং সর্বোভৌম শিখ রাষ্ট্র গঠন।

লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট