তিন হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ! কাউকে পরোয়া করছে না হলমার্ক প্রধানরা | BD Times365 তিন হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ! কাউকে পরোয়া করছে না হলমার্ক প্রধানরা | BdTimes365
logo
আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১০:৪৪
তিন হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ! কাউকে পরোয়া করছে না হলমার্ক প্রধানরা
বিডিটাইমস ডেস্ক

তিন হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ! কাউকে পরোয়া করছে না হলমার্ক প্রধানরা

ব্যাংক থেকে নিয়ম মেনে ঋণ নিলে ফেরত দিতে হয় সুদে-আসলে, কড়ায়-গণ্ডায়। ৫০০ টাকা বকেয়া থাকলেও কোমরে দড়ি বেঁধে জেলে নেওয়া হয়। কিন্তু অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ভাষায় ‘ডাকাতি আর জালিয়াতি’ করে সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা থেকেই দুই হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা নেওয়া হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম সবাইকে তাজ্জব করে দিয়ে জামিন পেয়েছেন দু-দুবার। জামিনে মুক্তির পর তাঁর মনোযোগ শুধুই ব্যাংকের টাকায় কেনা কারখানার যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করার দিকে। সেই টাকার একটি অংশ কারা কর্মকর্তাদের পকেটে দিয়ে স্বামী হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদের জন্য কারাগারে বিলাসী জীবন নিশ্চিত করা আর প্রভাবশালীদের হাতে রেখে তাঁর জামিনের ব্যবস্থা করা। সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সোনালী ব্যাংকের কল্যাণে সে কাজে তিনি এগিয়ে চলেছেন দক্ষতার সঙ্গেই। তাই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থ কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েও হলমার্ক গ্রুপের এই মালিক দম্পতি বেশ সুখে-শান্তিতেই রয়েছেন।

হলমার্কের উচ্চ পর্যায়ের সাবেক একজন কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগের গত সরকারের মেয়াদে একজন প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে প্রতি মাসে সরকারের কোষাগারে ১০০ কোটি টাকা জমা দেওয়ার ‘ফাঁকা’ শর্তে জামিন পান জেসমিন ইসলাম। পরে উচ্চ আদালত ওই জামিন বাতিল করে রায়ে বলেন, আসামিকে শর্তযুক্ত জামিন দেওয়া অবৈধ। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকাবস্থায় তানভীর মাহমুদ প্রায়ই ওই প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। জেসমিন ইসলামের জামিন নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক এড়াতেই প্রথমে মাসে ১০০ কোটি টাকা পরিশোধের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় ওই প্রতিমন্ত্রীর পরামর্শেই। প্রথম দফার জামিন বাতিল হওয়ার পর মাসখানেকের জন্য আবারও কারাগারে যান জেসমিন। পরে দ্বিতীয় দফায় শর্তমুক্ত জামিন পান তিনি। এর পর থেকে জেসমিন ইসলাম আইন-আদালত, সোনালী ব্যাংক, দুদক কিংবা ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট—কাউকেই পরোয়া করছেন না। দুদক কয়েক দফায় জেসমিনের সম্পদের হিসাব চাইলেও তিনি তা দেননি। বন্ড সুবিধায় আনা এক হাজার ২০০ টন সুতা খোলাবাজারে বিক্রির দায়ে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট কার্যালয় ১১৬ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির দাবিনামা পাঠালেও আমলে নিচ্ছেন না তিনি। হলমার্কের পুরনো সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিদায় করে দিয়েছেন জেসমিন, নিয়োগ দিয়েছেন নতুন করে।

এদিকে কারাগারে বেশ আরাম-আয়েশে রয়েছেন হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদ। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে রাজধানীর শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে পার করেছেন তিন মাস। ওই সময় তিনি হাসপাতালের কেবিনে বসে অফিসের ফাইলে সই করেছেন। স্ত্রী জেসমিন ইসলামও দিন-রাত কাটিয়েছেন সেখানে গিয়ে। পরে তানভীরকে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়া হয়। সূত্র জানায়, সেখানে হাওয়া ভবনের অন্যতম নিয়ন্ত্রক গিয়াসউদ্দিন আল মামুনসহ বিএনপির অন্য নেতারা চলেন মূলত তানভীরের দেওয়া উপহার-নজরানা পেয়েই। সেখানেও জেসমিন ইসলামের ছিল অবাধ যাতায়াত। তবে কয়েক মাস ধরে কারাগারে তানভীর মাহমুদের বিলাসী জীবনে কিছুটা ছেদ পড়েছে বলে জানা গেছে। অথচ দুর্নীতি মামলার তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে হলমার্ক গ্রুপের কয়েকটি ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়া হয়েছে।

২০১০ ও ২০১১ সালের বিভিন্ন তারিখে হলমার্ক গ্রুপ বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন (বর্তমানে রূপসী বাংলা) শাখা থেকে প্রায় দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়। এই কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর হলমার্কের মালিক-এমডি তানভীর মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রী গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামসহ হলমার্কের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সোনালী ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১২ সালের ৪ অক্টোবর ঢাকার রমনা থানায় ১১টি মামলা দায়ের করে। মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে দুই হাজার ৬৬৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় তানভীর ও তাঁর স্ত্রী জেসমিন ইসলামকে।  পরে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ ও সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে তাঁদের জামিনের আবেদন করা হলে আদালতের তৎকালীন বিচারক মো. জহুরুল হক ২০১৩ সালের ৪ আগস্ট রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রতি মাসে ১০০ কোটি টাকা করে দেওয়ার শর্তে ১১টি মামলায় জেসমিন ইসলামের জামিন মঞ্জুর করেন।

সোনালী ব্যাংক ও হলমার্কের সাবেক কর্মকর্তারা জানান, কারাগারের বাইরে জেসমিন আর ভেতরে তানভীর যখন আয়েশে আছেন, তখন জালিয়াতি করে সোনালী ব্যাংক থেকে নেওয়া দুই হাজার ৬৬৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা সুদে-আসলে গত নভেম্বর পর্যন্ত দুই হাজার ৯৬৪ কোটি ৮৪ লাখে দাঁড়ায়, যা এখন তিন হাজার কোটি ছাড়িয়েছে। ঋণ নিয়ে ফেরত না দিলে জেল-জরিমানা, সম্পদ বিক্রি করে অর্থ আদায় হয়। ঋণের সঙ্গে সুদ পরিশোধের পরও সামান্য বকেয়ার কারণে শাস্তি পেতে হয় অনেক গ্রাহককে। অথচ জালিয়াতি করে আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি মেরে দিলেও হলমার্কের কাছ থেকে আসল টাকা আদায় করতেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে তানভীর ও জেসমিন ইসলাম এই পুরো টাকাই ‘অনুদানে’ পাওয়া অর্থের মতো ভোগ করছেন।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রদীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘জালিয়াতি করে নিলেও হলমার্কের কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের কোনো লক্ষণ নেই। পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সোনালী ব্যাংক অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে। আর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মামলা করার পর হলমার্ক গ্রুপের পক্ষে ব্যরিস্টার রফিক-উল হক উচ্চ আদালতে রিট মামলা দায়ের করেছেন। ফলে হলমার্ক গ্রুপের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় তানভীর ও জেসমিন গ্রেপ্তার হওয়ার আগে হলমার্ক কিছু কিস্তি দিয়েছিল সোনালী ব্যাংককে। আর বকেয়া কিছু রপ্তানি বিল মিলিয়ে সোনালী ব্যাংক মোট পেয়েছে ৪১০ কোটি টাকা। বাকি টাকা আদায়ের কোনো লক্ষণ নেই দূরবর্তী ভবিষ্যতেও। কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর অর্থমন্ত্রীর বারবার তাগাদা সত্ত্বেও সোনালী ব্যাংকের দুই বছর সময় লেগেছে হলমার্কের সম্পত্তির নিলাম ডাকতে। কিন্তু নিলাম বাক্স পেয়েছে ফাঁকা। পরে নামকাওয়াস্তে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে দায়িত্ব শেষ করেছে সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। সেই মামলা নিষ্পত্তি হতে কত বছর লাগবে? রায় কী হবে? সোনালী ব্যাংকের পক্ষে রায় হলেও টাকা উদ্ধার হবে কোথা থেকে? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই কারো কাছে। সোনালী ব্যাংকের হিসাবে, হলমার্ক গ্রুপের মোট যে সম্পদ ছিল, তার আর্থিক মূল্য মাত্র এক হাজার ১৭০ কোটি টাকা। সেখান থেকে জেসমিন ইসলাম একে একে বিক্রির পর আর কতটুকু অবশিষ্ট থাকবে, অচল হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতির আদৌ কোনো মূল্য থাকবে কি না, তারও কোনো জবাব জানা নেই কারো।

সরেজমিনে হলমার্কের কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ কারখানায় কোনো যন্ত্রপাতি নেই। সবই বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। খামারে থাকা দুই হাজার ৯০০ গরুর একটিও নেই। বিক্রি করা হয়েছে গোয়ালের শেডও। বন্ড সুবিধায় রপ্তানির উদ্দেশ্যে আমদানি করা প্রায় এক হাজার ২০০ টন সুতা ও ফেব্রিক্সও বিক্রি করে দিয়েছেন জেসমিন। হলমার্কের বেশ কয়েকটি কারখানা ভবন ও মসজিদ নির্মাণাধীন ছিল। তানভীর ও জেসমিন গ্রেপ্তার হওয়ার আগে এসব নির্মাণকাজের জন্য প্রায় তিন কোটি ইট ও বিপুল পরিমাণ রড-সিমেন্ট কিনেছিলেন। সেগুলোরও নামগন্ধ নেই। রেজিস্ট্রেশনবিহীন ১০টিরও বেশি দামি গাড়ি বিক্রি করেছেন জেসমিন। এখনো এ ধরনের অন্তত দুটি গাড়ি গোপনে রাখা আছে সাভারের জিরাবোতে হলমার্কের প্রতিষ্ঠান ফারহান টেক্সটাইলের গুদামে। হলমার্কে দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন এমন একজন বিশ্বস্ত কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, যে দুটি গাড়ি রয়েছে, তার একটি সাড়ে চার কোটি টাকা দামের ল্যান্ড ক্রুজার ভি৮ মডেলের, অন্যটি সাড়ে তিন কোটি টাকা দামের ল্যান্ড রোভার। এ দুটি গাড়ি বিক্রির জন্যও ক্রেতা খুঁজছেন জেসমিন। আর হলমার্কের নিটওয়্যার ফ্যাক্টরির দুটি ইউনিট (৩ ও ৪) এবং লেভেলিং কারখানা এখনো চালু রয়েছে।

সচল কারখানাগুলোর কার্যক্রম দেখভালের জন্য দায়িত্ব পালন করছেন হলমার্ক গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আবদুল হক। তিনি জানান, গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামের নির্দেশেই কারখানাগুলো চালু রেখেছেন তিনি। কারখানাগুলো থেকে খুব একটা লাভ হয় না। যা হয়, তা দিয়ে কর্মচারীর বেতন ও মামলা পরিচালনাসহ অন্যান্য কাজে চেয়ারম্যান ব্যয় করেন।

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তাদের মতে, চালু থাকাবস্থায় রপ্তানির জন্য ৩৪৯টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে প্রায় এক হাজার ২০০ টন সুতা ও ফেব্রিক্স আমদানি করেছিল হলমার্ক গ্রুপ। বন্ড সুবিধার আওতায় বিনা শুল্কে আমদানি করা ওই সব পণ্য দিয়ে উৎপাদিত পোশাক রপ্তানি করা হয়নি। সেগুলো দেশের ভেতরেই গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ১১৬ কোটি টাকা শুল্ক হাতছাড়া হয়েছে। শুল্ক ফাঁকির ওই অর্থ চেয়ে হলমার্ক গ্রুপের কাছে দাবিনামা পাঠানোর পর শুনানির উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। সেই টাকা পরিশোধ কিংবা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের দাবিনামাকে খুব একটা আমলে নিচ্ছেন না জেসমিন ইসলাম।

গরু, সুতা ও ফেব্রিক্স এবং নির্মাণ উপকরণ বিক্রির কথা স্বীকার করে হলমার্ক গ্রুপের জিএম ও তানভীর মাহমুদের চাচাতো ভাই শামীম আল মামুন বলেন, ‘সম্পদ বিক্রি করা অর্থ দিয়ে হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম এবং এমডি তানভীর মাহমুদের মামলা পরিচালনার ব্যয় মেটানো হচ্ছে।’

এসব বিষয়ে কথা বলতে চজাইলেও পাওয়া যায়নি জেসমিন ইসলামকে। তবে এর আগে একবার জেসমিন ইসলাম বলেছিলেন, ‘আমরা সোনালী ব্যাংকের অর্থ পরিশোধে রাজি আছি। কারখানা সচল রেখে যে আয় হবে, সেখান থেকেই ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করা হবে। এ জন্য আমাদের অবশ্যই ঋণপত্র খোলার সুযোগ দিতে হবে। সে জন্য একাধিকবার হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। ব্যাংক আর সরকার হলমার্কের পক্ষে কোনো উদ্যোগ না নিলে আমরা কোনো টাকা পরিশোধ করব না।’

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/

সূত্র: কালের কণ্ঠ