আপডেট : ১২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ২০:১০

তবুও হারমোনিয়ামের সুরে চলছে জীবন...! (ভিডিও)

মারুফ খান
তবুও হারমোনিয়ামের সুরে চলছে জীবন...! (ভিডিও)

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এবং বিকলাঙ্গ। কিন্তু জীবনের কাছে হার মানতে, হাত পাততে নারাজ। ৪৫ বছর ধরে গান গেয়ে যাচ্ছেন তিনি।

নাম তাঁর মোঃ ইমদাদ হোসেন বাউল। আড়াই মাস বয়সে লেপ তোষক বালিশে আগুন লেগে হাত মাথা চোখ পুড়ে যায়। পরবর্তীতে Sepsis হয়ে যাওয়ায় হাত কুনুইয়ের অল্প নিচ থেকে কেটে ফেলে দেয়া হয়েছিলো। আজ অবধি তার শরীরের ডান হাত, মাথা ও পায়ে পোড়ার দাগ।

আজ থেকে ৪৫ বছর আগে ভারতে কলকাতায় হারমোনিয়াম বাজানো শেখেন। চোখে দেখতে পেতেন না তবুও ওস্তাদ তাকে হাতে ধরে ধরে হারমোনিয়াম বাজাতে শেখাতো। তিনি চোখে দেখতে পেতেন না কিন্তু হাতের স্পর্শ আর কানে শুনে শুনে স্বরগ্রাম শিখে ফেলেন। কুনুইয়ের উপরে সামান্য হাড়ের অংশ থাকায় তা দিয়ে হারমোনিয়াম ধরেন।

কলকাতায় তার জীবনের ১৭ বছর কাটান। দক্ষিণ ২৪ পরগণায় জীবনের সে বছর গুলো কাটিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে খুলনায় আসেন। খুলনায় শহরের কাছেই এক ওস্তাদের সাথে ১০ বছর কাটান। সেই ওস্তাদের কাছে তার গান শেখা। খুলনা থেকে গোপালগঞ্জ এর টুঙ্গিপাড়ায় নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। তারপর পেটের দায়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি গান করে বেড়িয়েছেন। মানুষ খুশি হয়ে যা দেয় তাতেই তার সংসার চলতে থাকে।

তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে তার হাত নেই, চোখেও দেখতে পান না, তবুও তিনি হাল ছেড়ে দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি না করে কেন গান করে যাচ্ছেন? তিনি উত্তর দিলেন, “ করি না কারন, নবীর শিক্ষা করিওনা ভিক্ষা, মেহনত করিয়া খাও। এখন নবীর শিক্ষা তাই ছোটবেলা থেকে নিয়ত করসি যে আল্লাহ, আমাকে কখনো মানুষের কাছে হাত পাতায়ো না। এমনি এমনি হাত পাতলে কেমন একটা লাগে না? আমার বাবার ১২-১৪ বিঘা জমি ছিলো। তা বিক্রি করে করে আমাদের খাওয়াইসে। যখন শেষ হয়ে গেলো তখন রাস্তায় নামসি। কারো কাছে হাত পাততে রাজি না। এমনি গান শুনাইয়া বলতে পারি অন্ধ মানুষ, সবাই আমাকে হেল্প করেন, সহযোগিতা করেন। এছাড়া আমি যদি না খেয়ে মরেও যদি যাই তবুও ইচ্ছে করে না যে আমি কারো কাছে হাত পাতবো।“

জিজ্ঞেস করলাম যে আপনি আপনার মানসিক জোরের জন্য কখনোই কারো কাছে আত্নসমর্পন করবেন না। তিনি উত্তর দিলেন, “ না না না, এক আত্নসমর্পন আমি আল্লাহর কাছে আর মা-বাবার কাছে করবো। এছাড়া আর কারো কাছে না।“

জীবন এভাবে যাচ্ছে তা নিয়ে আপনার কি চিন্তাভাবনা আছে? তিনি উত্তর দিলেন, “ কোন চিন্তা- ভাবনা নাই। যেভাবে কয়দিন বাঁচায় রাখে আল্লাহ। আল্লাহপাক যদি খাওয়ায় তাহলে আমি খাবো। আর উসিলা মানুষ, খাওয়াবে তো আল্লাহই উসিলার মাধ্যমে।“

জিজ্ঞেস করলাম তার আত্নীয় স্বজন আছে কিনা। উনি উত্তর দিলেন সব আছে শুধু তিনি (স্ত্রী) নেই। তারা এই দেশে এই গোপালগঞ্জেই থাকেন। তার পৈত্রিক ভিটা চর কুশলি গ্রামে তার আত্নীয়রা থাকেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম যে তারা তাকে ডাকে কিনা বাড়িতে। গান- বাজনা ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে থাকতে। তিনি উত্তর দিলেন যে সেরকম দরদি আর এদেশে তার নেই। তার দুই গরীব ভাই আছে। তাদের ছেলে মেয়ে নিয়েই তাদের খাওয়ার কষ্ট। তাই তিনি এভাবে গান গেয়ে চেষ্টা করেন তাদের কিছু দেয়ার জন্য। কিন্তু কারোটা নেন না কখনোই। বরঞ্চ তাদেরকে দেন।

আমাদের চারপাশেই কত অজস্র মানুষ, হাত পা চোখ সব থাকতেও জীবনের কাছে হার মেনে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামে। আর আমরা, হাত পা মাথা এবং মাথার উপরে একটা ঘর থাকা সত্বেও জীবন নিয়ে হতাশ থাকি। কখনো কখনো জীবনের কাছে হার মেনে নিয়ে আত্নহত্যার চিন্তাভাবনা করি।

স্বচ্ছলতা, সামর্থ্য সহ মৌলিক চাহিদা সব মিটে যাবার পরও জীবন নিয়ে আমাদের অজস্র অভিযোগ। সৃষ্টিকর্তার প্রতি অভিযোগ। জীবনে এত কিছু থাকার পরও জীবন নিয়ে হতাশাগ্রস্থ। অথচ আমরা শিখতে পারি এমন মানুষ গুলো থেকে। সুখ হলো তৃপ্তিবোধে। এই মানুষটা তার জীবন নিয়ে তৃপ্ত এবং সুখী। তিনি নিজেকে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছের প্রতি সপে দিয়েছেন, তাই দুনিয়াবি চাহিদা তার কাছে তুচ্ছ।

জীবন হলো সংগ্রামের এ জীবন কখনোই হেরে যাবার নয়। এগিয়ে যেতে হলে পথ খুজে নিতে হয়, কোন পথ না থাকলে এই মানুষটার মত পথ তৈরি করে নিতে হয়। তবুও কাপুরুষের মত হার মেনে নিয়ে সৃষ্টিকর্তার উপর অভিযোগ ছুড়ে দিয়ে পরাস্থ হতে নেই। আমাদের মন থেকে নেগেটিভিটি কে যদি দূরে রাখতে পারি এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে সকল উত্থানপতন অবস্থাকে যদি পজেটিভ ভাবে মনেতে নিয়ে জীবন সংগ্রামের পথে এগিয়ে যেতে পারি তবেই আমরা বিজয়ী। জীবনের সফলতা সম্পদ বা কোন গন্তব্যে নয়, বরং জীবনের সফলতা হলো এক ভ্রমনে, যে ভ্রমনের ব্যাকপ্যাক হলো পজেটিভ থটস। সুখ তো এক অনুভূতি মাত্র। আর অনুভব করা কেবল ইচ্ছামাত্র।

এই অদম্য মানুষটার সঙ্গে যোগাযোগ ও শুভকামনা জানাতে চাইলে, তার নিজস্ব এই ০১৭৩৫২৩৩৮১৪ নাম্বারে ফোন দিবেন। সহোযোগিতার জন্য নয়, এই হতাশ প্রজন্মকে জীবন যুদ্ধে এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরণা নেবার জন্য।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে