আপডেট : ১৫ জুলাই, ২০১৬ ১৯:৪৫

যে সমাজে মেয়ে হয়ে জন্মানো প্রভুর অভিশাপ!

অনলাইন ডেস্ক
যে সমাজে মেয়ে হয়ে জন্মানো প্রভুর অভিশাপ!

আফ্রিকার দেশ তানজানিয়ার উত্তরাঞ্চলে বাল্যবিবাহ, ধর্ষণ, জোরপূর্বক বিয়ে যেন একটি নিয়মিত ব্যাপার। আর এমন সমাজে নারীরাই সবচেয়ে বেশি নির্মম অত্যাচারের স্বীকার হচ্ছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলে সুকুমা নামে একটি আদিবাসী গোষ্ঠী আছেন যেখানে দিনের বেলা নারীদের ঘর থেকে বের হওয়া বেশ বিপজ্জনক। দিনের বেলা যেসকল মেয়েরা স্কুলে যাওয়ার জন্য বের হয় চোখের পলকেই তাদের উঠিয়ে নিয়ে ধর্ষণ করতে বিন্দুমাত্র সময় লাগে না সুকুমা পুরুষদের। এতটা ভয়াবহ অবস্থার মাঝে কন্যা সন্তান জন্ম নিলেই বাবা-মায়ের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার।

এই সমাজের তরুণ ও পুরুষেরা নিজেদের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ বলে দাবি করে। জীবনকে উপভোগ করার জন্য বিধাতা তাদের মর্তে পাঠিয়েছে বলে মনে করেন তারা। তাদের জীবনে তিনটি জিনিস হলো সবচেয়ে বেশি মূল্যবান। আর তা হলো মদ, মাংস এবং নারী। তাদের শ্লোগান হলো ‘এই তিনটি জিনিসই আমাদের রক্তে মাংসে মিশে আছে যার ফলে আমরা পুরুষ হিসেবে নিজদেরকে উজ্জীবিত করতে পারি।’ এই সমাজের পুরুষেরা এতটাই প্রভাবশালী যে তাদের আতঙ্কে গ্রামে দিনে দিনে মেয়েদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। মেয়ে হয়ে জন্মানো প্রভুর অভিশাপ বলে মনে করে সুকুমা সমাজের মেয়েরা।

মেয়েরা একটু বড় হলেই কারো হাতে ধর্ষণ হওয়ার আগেই বাবা-মা চেষ্টা করেন তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়ার। আর সে জন্য মেয়েকে চুল কেটে আরো বিভিন্ন উপায়ে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়। ছোট মেয়েদের বয়সে বড় পুরুষদের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হলে অনেক সময় মেয়েরা ভীত হয়ে বিয়েতে রাজি হতে চায় না। আর মেয়ে যাতে রাজি হয় সে জন্য বাবা-মাকে তাকে জোড় করে নিয়ে যায় ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার যেন এমন ঔষধ দেয় যাতে করে মেয়েটি বিয়েতে রাজি হয় এবং একজন ভালো স্বামী পায়। তবে দ্বিধা নিয়েই বলতে হয় ডাক্তারের হাত থেকেও নিস্তার মেলে না মেয়েদের। আর তাতেও কাজ না হলে চামড়ার বেল্ট দিয়ে দিন রাত গরুর মতো প্রহার করা হয় তাদের।

আমাদের সমাজে যেখানে বিয়ের সময় ছেলে পক্ষকে যৌতুক নিতে দেখা যায়। সেখানে সুকুমাতে রয়েছে একটু ভিন্নতা। এখানে বাবা মেয়ের বিয়ের বিনিময়ে বরের কাছ থেকে যৌতুক আদায় করে। আর সেই যৌতুক কোন মোটা অঙ্কের টাকা বা দামি কোন বস্তু নয়। তা হলো কেবলমাত্র কয়েকটি গরু। দশটি গরুর বিনিময়েই মেয়ের বাবা তাকে তুলে দেন কয়েকবার বিয়ে করা একটি পুরুষের হাতে।

একজন ১২ বছরের সুকুমা শিশুর মতে, ‘আমার বাবা-মায়ের গরু পছন্দ কারণ তা দিয়ে তারা টাকা ও মাংস দুটিই পেয়ে থাকে। আমার মনে হয় আমি মানুষ না হয়ে গরু হয়ে জন্মালে বেশি ভালো হত। আমার বিয়ের ১১ মাস চলছে আর এই ১১ মাসে এমন একদিন বাদ যায়নি যে আমি নির্যাতিত হইনি।’

১৯৭১ সালে তানজানিয়ায় বিয়ের বয়স হিসেবে ১৫ বছর নির্ধারণ করা হয়। পরে ২০০৯ সালে তা বাড়িয়ে ১৮ তে আনা হয়। কিন্তু অনেকে আইন অমান্য করে মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছে। শহরের অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চগুলোতে শিশু, কিশোরী ও নারীদের দুরাবস্থা যেন কারোই চোখে পরে না। সেখানে দিনের পর দিন কি পরিমাণে আইনের লঙ্ঘন হচ্ছে তা দেখার যেন কেউ নেই।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় পদক্ষেপ নেয়া হলেও প্রভাবশালীদের তোপের মুখে তা আবার শিথীল হয়ে পরে। এসব করার পেছনে অনেকে অজ্ঞতাকে দায়ি করছে কেউ আবার দেশটির সরকারকে দায়ি করছে। তবে দায়ি যে পক্ষই হোক ক্ষতি হচ্ছে সমাজের মেয়েদের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানে ধর্ষণের প্রতিবাদে সেখানকার সচেতন নাগরিকরা নিজেদের অধিকার আদায়ে রাস্তায় নেমে আসে। সেখানে তানজানিয়ার মেয়েরা নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে সমাজের পুরুষের নির্মম অত্যাচার। স্বয়ং বিধাতা ছাড়া যেন তাদের কেউ নেই। 

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে