আপডেট : ৫ মে, ২০১৬ ০৯:৩৫

অকুতোভয় মহান বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ১০৫তম জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

বিডিটাইমস ডেস্ক
অকুতোভয় মহান বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ১০৫তম জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

আজ একটি কথা আমাকে বলতেই হচ্ছে, যা আমি সেই ছোট বেলা থেকে শুনে আসছি, তা হল “যে জাতি তার বীরদের প্রতি সম্মান দেখায়না সে জাতিকে কেউ সম্মান করেনা।” তাই এই লেখার শুরুতেই আমি বিনীত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাচ্ছি আমাদের সব বীরদের প্রতি।

অনেক ত্যাগ,তিতিক্ষা আর রক্তের বিনিময়ে আমরা আজ একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক, যাপন করতে পারছি সম্মানিত জীবন। আমাদের এই দেশের উত্থানের পেছনে রয়েছে অনেক অশ্রু ঝরা দিন আর রক্ত ঝরা অধ্যায়। সেই অধ্যায়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী হল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। আর এই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সাথে যে ক’জন জড়িত, প্রবল্ভাবে আলোচিত তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মাস্টারদা সূর্যসেন এবং তাঁর যোগ্য শিষ্য প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।

বয়স কত? একুশ। পরনে মালকোঁচা ধুতি। মাথায় গৈরিক পাগড়ি, গায়ে লাল ব্যাজ লাগানো শার্ট। ইনিই দলনেতা। এক হাতে রিভলবার, অন্য হাতে হাতবোমা। দলের সদস্যসংখ্যা সাত। সবার পরনে রাবার সোলের কাপড়ের জুতো। সবাই প্রস্তুত। দলনেতার মুখে ‘চার্জ’ শুনতেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল শত্রুর ওপর। তারা তখন ক্লাবে মত্ত নাচ-গানে। পিকরিক অ্যাসিডে তৈরি বোমাটি বর্জ্রের মতো ভয়ংকর শব্দে ফেটে পড়ল; হলঘরে তখন শুধু ধোঁয়া। দলনেতাই এগিয়ে গেল সবার আগে। অথচ এটাই তার প্রথম অভিযান। বোমার বিস্ফোরণ, গুলির শব্দ, শত্রুর মরণ চিত্কার—সব মিলে এলাকাটা যেন পরিণত হলো এক দক্ষযজ্ঞে!
এটা কোনো অ্যাডভেঞ্চার ফিল্মের দৃশ্য নয়। এটি ইতিহাসের এক অনন্য ঘটনা। আমরা আরও রোমাঞ্চিত হই—যখন জানি, ২১ বছরের সেই দলনেতা পুরুষ বেশে একজন নারী! বাংলাদেশেরই নারী! নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।


১৯৩২ সাল। যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই বাঙালি নারী। তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ‘প্রীতিলতা’। আত্মদান করে প্রমাণ করেছেন, মেয়েরাও পারে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম আত্মহুতি দেয়া নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আজ ১০৫তম জন্মদিন। প্রীতিলতা ১৯১১ সালের ৫ মে পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর মা এর নাম প্রতিভাদেবী এবং বাবাজগবন্ধু ওয়াদ্দেদার । জগবন্ধু পরিবারের আদি পদবী ছিল দাশগুপ্ত। তাঁদের বংশের কোনো এক পূর্বপুরুষ নবাবী আমলে 'ওয়াহেদেদার' উপাধি পেয়েছিলেন। সেই ওয়াহেদেদার থেকে ওয়াদ্দেদার বা ওয়াদ্দার হয়।

প্রীতিলতাই একজন বাঙালী, যিনি ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী মহিলা শহীদ ব্যক্তিত্ব।


কেমন ছিলেন তিনি
ভীষণ লাজুক এবং অন্তর্মুখী স্বভাবের প্রীতিলতার ডাক নাম ছিল রানী। মেধা ছিল অসাধারণ, অসম্ভব মেধাবী এই রাণীকে তাঁর পিতা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে ডা. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করান। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পান প্রীতিলতা। ওই স্কুল থেকে তিনি ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে। থাকতেন কলেজের ছাত্রীনিবাসে। ওই সময় প্রীতিলতা বিপ্লবী লীলা নাগের সংস্পর্শে আসেন। লীলা নাগ ওই সময় দীপালী সংঘের নেতৃত্বে ছিলেন। দীপালী সংঘ ছিল ঢাকার বিপ্লবী দল শ্রীসংঘের নারী শাখা। ১৯৩০ সালে তিনি আইএ পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে পঞ্চম হন। এরপর কলকাতার বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩২ সালের ডিসটিংশনসহ তিনি বিএ পাস করেন।

সূর্যসেনের সান্নিধ্যে যেভাবে এলেন তিনিঃ
ডা. খাস্তগীর উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয় থেকে প্রীতিলতা ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করার পর ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে। থাকতেন কলেজের ছাত্রীনিবাসে। এ সময় প্রীতিলতা বিপ্লবী লীলা নাগের সংস্পর্শে আসেন। তখন বিপ্লবী লীলা নাগের নেতৃত্বে 'দীপালী সংঘ' সংগঠনটি পরিচালিত হত। দীপালী সংঘ ছিল 'শ্রীসংঘ'-এর মহিলা শাখা সংগঠন। 'শ্রীসংঘ' ছিল তখনকার ঢাকার একটি বিপ্লবী দল।

অনেকদিন পর লীলা নাগের সাথে প্রীতিলতার 'দীপালী সংঘ' নিয়ে কথা হল। কথাবার্তার মাধ্যমে লীলা নাগ বুঝে নিলেন প্রীতিলতাকে দিয়ে দেশের কাজ হবে। তাই লীলা নাগ তাঁকে 'দীপালী সংঘে'র সদস্য হওয়ার জন্য একটি ফর্ম দিয়ে বললেন, 'তুমি এর উদ্দেশ্য ও আদর্শের সাথে একমত পোষণ করলে বাড়ী থেকে এসে ফর্মটি পূরণ করে দিও।'

বাড়ী আসার পরের দিন তিনি ওই ফর্মটি পূর্ণেন্দু দস্তিদারকে দেখিয়ে বললেন, "দাদা, আমি এই সংঘের সাথে কাজ করবো। তোমরা তো আর আমাকে তোমাদের দলে নিবে না, তাই এখানে যুক্ত হয়ে আমি দেশের জন্য কাজ করব। পূর্ণেন্দু দস্তিদার ওই ফর্মটি প্রীতিলতার কাছ থেকে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, দলনেতাকে দেখিয়ে তোমাকে এটি ফেরত দিব"

১৯২৯ সাল। তখন সূর্যসেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক। পূর্ণেন্দু দস্তিদার প্রীতিলতার কাছ থেকে ফর্মটি নেয়ার পরের দিন বিকেল বেলা বিপ্লবীদের গোপন বৈঠকে উপস্থিত হলেন। বৈঠক শেষে জেলা কংগ্রেসের কার্যালয়ে তিনি মাষ্টারদা সূর্যসেনকে ওই ফর্মটি দেখালেন এবং প্রীতিলতার মনের কথাগুলো বললেন। মাষ্টারদা সূর্যসেন সবকিছু শুনে পূর্ণেন্দু দস্তিদারকে বললেন, আজ থেকে আমরা প্রীতিলতাকে আমাদের দলের সদস্য করে নিলাম। কিন্তু এই কথা আপাতত আমরা তিনজন ছাড়া অন্য কাউকে জানানো যাবে না। প্রীতিলতাকে একদিন আমার কাছে নিয়ে এসো।

অবশেষে ১৯৩২ সালের ১৩ জুন চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের প্রধান কেন্দ্র ধলঘাটের ঘাঁটিতে মাস্টারদা সূর্যসেনের সাথে দেখা করতে যান প্রীতিলতা। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় প্রীতিলতা তার মাকে সীতাকুন্ডে যাওয়ার কথা বলেন। যে বাড়িতে প্রীতিলতার সাথে মাস্টারদার সাক্ষাৎ হয় সে বাড়িতে নির্মল সেনও ছিলেন। সেই বাড়িতে সূর্যসেনের অবস্থানের কথা পটিয়া পুলিশ ক্যাম্প গোপন সূত্রে জানতে পারে। এর আগে একই বছর মে মাসে ব্রিটিশ সরকার সূর্যসেন ও নির্মল সেনকে জীবিত কিংবা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষনা করে। পটিয়া পুলিশ ক্যাম্পের অফিসার-ইন-চার্জ ক্যাপ্টেন ক্যামেরন খবরটি জানার পর পুরষ্কার এবং পদোন্নতির আশায় ঐ বাড়িতে অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং রাত প্রায় ৯টায় ধলঘাটের ঐ বাড়িতে উপস্থিত হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ব্যাপারটি নির্মল সেনকে জানিয়ে সূর্যসেন ও প্রীতিলতা বাড়ির পিছন দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও পুলিশের গুলিতে নির্মল সেন নিহত হন।

পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ

১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রামে পাহাড়তলীস্থ ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমনের সিদ্ধান্ত হলে সূর্যসেন এই অভিযানের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেন প্রীতিলতাকে। তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাব ছিল ব্রিটিশদের প্রমোদকেন্দ্র। পাহাড়ঘেরা এই ক্লাবের চতুর্দিকে ছিল প্রহরী বেষ্টিত। একমাত্র শ্বেতাঙ্গরা এবং ক্লাবের কর্মচারী, বয়-বেয়ারা, দারোয়ান ছাড়া এদেশীয় কেউ ঐ ক্লাবের ধারে কাছে যেতে পারতো না। সন্ধ্যা হতেই ইংরেজরা এই ক্লাবে এসে মদ খেয়ে নাচ, গান এবং আনন্দ উল্লাস করতো। এই ক্লাবের ফটকে লেখা ছিল “Dogs and Indians not allowed”। ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমনের আগে চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণ কাট্টলীতে যোগেশ মজুমদার নামের ঐ ক্লাবেরই একজন বেয়ারার বাড়িতে বিপ্লবীরা আশ্রয় পান। যোগেশ মজুমদার ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমনের ব্যাপারে বিপ্লবীদের সহায়তা করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর এ আক্রমণে প্রীতিলতার পরনে ছিল মালকোঁচা দেওয়া ধুতি আর পাঞ্জাবী, চুল ঢাকার জন্য মাথায় সাদা পাগড়ি এবং পায়ে রাবার সোলের জুতা। ইউরোপিয়ান ক্লাবের পাশেই ছিল পাঞ্জাবীদের কোয়ার্টার। এর পাশ দিয়ে যেতে হবে বিধায় প্রীতিলতাকে পাঞ্জাবী ছেলেদের মত পোষাক পড়ানো হয়েছিল। সে দিনের আক্রমনে প্রীতিলতার সাথে যারা ছিলেন তারা হলেন- কালীকিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী (এদের পরনে ছিল- ধুতি আর শার্ট), মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে এবং পান্না সেন (এদের পরনে ছিল- লুঙ্গি আর শার্ট)। বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা যোগেশ মজুমদার প্রথমে ক্লাবের ভিতর থেকে রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫ এর দিকে আক্রমণের নিশানা দেখিয়ে দেন এবং এর পরেই ক্লাব আক্রমণ শুরু হয়। সেদিন ছিল শনিবার, প্রায় ৪০জন মানুষ তখন ক্লাবঘরে অবস্থান করছিল। তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবীরা ক্লাব আক্রমণ শুরু করেন।

যেখানে তিনি শহীদ হন

কিন্তু আক্রমন শেষে সবাই ফিরে আস্তে সক্ষম হলেও গুলিবিদ্ধ হন দলনেতা প্রীতিলতা।
তবে তিনি যে অগ্নিকন্যা, জীবন দেবেন, কিন্তু ইংরেজদের হাতে ধরা দেবেন না কিছুতেই। তাই গুলিবিদ্ধ অবস্থতাতেই ‘পটাশিয়াম সায়ানাইড’ খেয়ে আত্মদান করলেন।
পরের দিন পুলিশ ক্লাবের পাশে পড়ে থাকা লাশটিকে প্রথমে পুরুষ ভেবেছিল। কিন্তু মাথার পাগড়ি খুলে লম্বা চু্লের মেয়েটিকে দেখে শুধু ব্রিটিশ পুলিশ নয়, গোটা ব্রিটিশ সরকারই নড়েচড়ে উঠল। আলোড়িত হলো গোটা ভারতবাসী।


যুদ্ধে যাবার আগে মা কে উদ্দেশ্য করে একটি চিরকুট লিখে রেখে গিয়েছিলেন তিনি,
‘মাগো, অমন করে কেঁদোনা! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করব মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভাবে অবনতা, লাঞ্ছিতা, অবমানিতা!
তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উত্সর্গ করতে পারবে না? তুমি কি কেবলই কাঁদবে?

উপরে