আপডেট : ১০ আগস্ট, ২০১৬ ১২:২৩

শিক্ষকদের ব্যবসায়িক মানসিকতায় সেশনজটে নিয়মিত শিক্ষার্থীরা

বিডিটাইমস ডেস্ক
শিক্ষকদের ব্যবসায়িক মানসিকতায় সেশনজটে নিয়মিত শিক্ষার্থীরা
শিক্ষকদের বাড়তি আর্থিক চাহিদা আর ব্যবসায়িক মানসিকতার জন্য সেশনজটের কবলে পড়ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়া ও বিভিন্ন বিভাগে সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করায় নিয়মিত শিক্ষার্থীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ছোটখাটো অজুহাতে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষা পেছানো হয়। অথচ সান্ধ্যকালীন কোর্সের ক্ষেত্রে পুরো বিপরীত অবস্থা- ক্লাস বা পরীক্ষা পেছানোর কোনো নজির নেই। কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেও অন্য শিক্ষক দিয়ে ক্লাস চালিয়ে নেয়া হয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্লাসরুম ও শিক্ষক সংকট এবং বিভিন্ন সময় শিক্ষকদের আন্দোলন। ফলে বেশ কয়েকটি বিভাগে ছয় মাস থেকে এক বছরের সেশনজট সৃষ্টি হয়েছে।

শিক্ষকদের পাঠদানের জন্য ১৯৯৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের করা নীতিমালা অনুযায়ী একজন অধ্যাপক সপ্তাহে ১০ ঘণ্টা বা ১২টি ক্লাস, সহযোগী অধ্যাপক ১২ ঘণ্টা বা ১৪টি ক্লাস, সহকারী অধ্যাপক ১৪ ঘণ্টা বা ১৬টি ক্লাস ও প্রভাষক ১৬ ঘণ্টা বা ১৮টি ক্লাস নেয়ার কথা। এছাড়াও ১০০ নম্বরের কোর্সের জন্য ৫০ মিনিটের ৫০ থেকে ৬০টি ক্লাস এবং ৫০ নন্বরের কোর্সের জন্য ৩০টি ক্লাস নেয়ার কথা বলা হয়েছে। যদি শিক্ষকরা এ নীতিমালা অনুসরণ করে ক্লাস নেন তাহলে সপ্তাহে ছয় কার্যদিবসে একজন প্রভাষকের প্রতিদিন ক্লাস নিতে হয় তিনটি। একইভাবে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক কিংবা সহকারী অধ্যাপকদেরও দৈনিক একাধিক ক্লাস নিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো বিভাগের শিক্ষক এ নীতিমালা অনুসরণ করে ক্লাস নেন না। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নিয়মিত ক্লাস নিয়ে থাকেন তারা। কারণ সেখানে যথাসময়ে নির্ধারিত সংখ্যক ক্লাস নিতে না পারলে টাকা দেয়া হয় না। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষকরা বেশি মনোযোগী হওয়ায় নিজের বিভাগে নিয়মিত ও প্রয়োজন মতো সময় দিতে পারছেন না।

সান্ধ্যকালীন কোর্স : জাবির বিজনেস স্টাডিস অনুষদের অধীনে (বিবিএ) চারটি বিভাগে, বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ), ইংরেজি, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, সরকার ও রাজনীতি, ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি) ও লোকপ্রশাসন বিভাগে সান্ধ্যকালীন কোর্স পরিচালনা করা হয়। এসব কোর্সে বিভাগের নিয়মিত শিক্ষকরা ক্লাস নিয়ে থাকেন। আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় শিক্ষকরা সপ্তাহে দুই দিন এ কার্যক্রম নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। এর প্রভাবে বিভাগের নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। ফলে বিভিন্ন বিভাগে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বাড়ছে সেশনজট।

শিক্ষক সংকট : বিভিন্ন বিভাগে কোর্স আওয়ার হিসাব করে শিক্ষক সংখ্যা নির্ধারণের বিধান রয়েছে। কিন্তু সদ্য চালু হওয়া বিভাগগুলোসহ বেশ ক’টি বিভাগে শিক্ষক সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগে বর্তমানে সাতটি ব্যাচে শিক্ষার্থী রয়েছেন ৩৫০ জন। স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কমপক্ষে ১৫ জন শিক্ষক প্রয়োজন। কিন্তু বিভাগটিতে ছয়জন শিক্ষক দিয়ে চলছে একাডেমিক কার্যক্রম। পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগে পাঁচটি ব্যাচে শিক্ষার্থী দুই শতাধিক। কিন্তু বিভাগে শিক্ষক মাত্র পাঁচজন। একই চিত্র আইন ও বিচার বিভাগে- আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক মাত্র ছয়জন। জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে পাঁচটি ব্যাচের প্রায় আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক মাত্র আটজন। এছাড়া চারুকলা বিভাগে শিক্ষক মাত্র চারজন। অন্যদিকে বেশ ক’টি বিভাগে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকলেও অনেকে ছুটি নিয়ে দেশের বাইরে থাকায় ঘাটতি রয়েই গেছে।

শ্রেণীকক্ষ সংকট : প্রায় প্রত্যেকটি বিভাগে কমপক্ষে ছয়টি বা তার বেশি ব্যাচ রয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় অধিকাংশ বিভাগেই পর্যাপ্ত শ্রেণীকক্ষ নেই। যেমন আইন বিভাগের নিজস্ব কোনো শ্রেণীকক্ষ নেই। অডিটোরিয়ামের একটি কক্ষে কোনোভাবে তাদের পাঠদান চলছে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিলেবাস শেষ করতে না পেরে সেশনজটের কবলে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।

শিক্ষক আন্দোলন : শিক্ষক রাজনীতির কারণেও বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের আন্দোলনে ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ব্যাহত হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবিরকে ভিসি পদ থেকে পদত্যাগের আন্দোলনের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন পদত্যাগ পর্যন্ত টানা দুই বছর শিক্ষকদের বেশ কয়েকবার কর্মবিরতি, ধর্মঘট, প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও, শ্রেণীকক্ষ তালাবদ্ধ করে রাখা, ক্লাস বর্জনের মতো কর্মসূচির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের সৃষ্টি হয়েছে। ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম দায়িত্ব নেয়ার পর ধীরে ধীরে সেই পুরনো ক্ষত পূরণের চেষ্টা করছেন।

নাটক ও নাট্যতত্ত্বের ৪১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু রায়হান বলেন, এ মুহূর্তে আমরা যে অবস্থানে আছি তাতে মনে হয় না আগামী দুই বছরের আগে পড়াশোনা শেষ করতে পারব। অন্য বিভাগের বন্ধুরা পড়াশোনা শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনেকে চাকরিও করছে। অথচ আমরা এখনও চতুর্থ বর্ষেই পড়ে আছি।

শিক্ষকদের নিয়মিত ক্লাস না নেয়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার টিটু যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষকদের ক্লাস নেয়ার ব্যাপারে যে নীতিমালা করা আছে সেটা অনুসরণ করলেই কোনো বিভাগে সেশনজট থাকবে না। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই নীতিমালা খুব একটা মেনে চলতে দেখা যায় না।

সান্ধ্যকালীন কোর্সের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রোভিসি অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন বলেন, সান্ধ্যকলীন কোর্সের কারণে যদি রেগুলার স্নাতক-স্নাতকোত্তর শ্রেণীর ক্লাস-পরীক্ষার ন্যূনতম ক্ষতি হয় তবে আমরা এটা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেব। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। তিনি বলেন, যদি কোনো শিক্ষার্থী সরাসরি অভিযোগ করতে ভয় পায় তাহলে গোপনে অভিযোগ করলেও আমরা ব্যবস্থা নেব। শ্রেণীকক্ষ সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে প্রোভিসি বলেন, নতুন ভবনের সম্প্রসারণের কাজ চলছে। ধীরে ধীরে এ সংকট কেটে যাবে। শিগগিরই শিক্ষক সংকটেরও সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ড. আবুল হোসেন।

সূত্র- যুগান্তর

জেডএম

উপরে