আপডেট : ৩ মে, ২০১৮ ১৯:২৯

প্রতারক চক্রের টার্গেট ধনীর দুলালী

অনলাইন ডেস্ক
প্রতারক চক্রের টার্গেট ধনীর দুলালী

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বন্ধুত্বের ফাঁদে ধনাঢ্য পরিবারের নারীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি বিদেশি চক্র। প্রতারক চক্রের মূল হোতা নাইজেরিয়া, কেনিয়া বা আয়ারল্যান্ডের নাগরিক বলে সন্দেহ করছেন গোয়েন্দারা। তবে চক্রটি ওই কাজে ব্যবহার করছে তাদের এ দেশীয় সহযোগীদের। বিশ্বাস জমাতে কাস্টমস কর্মকর্তা সেজে টার্গেট ধনীর দুলালীর কাছে ফোনও করা হয়।

চট্টগ্রামের খুলশী থানার এক ধনাঢ্য পরিবারের নারীর কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে সাড়ে আট লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়ার পর গোয়েন্দা পুলিশ অনুসন্ধান শুরু করে। জয়া চৌধুরী (ছদ্মনাম) নামে ওই নারীর মামলার পর চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদে গোয়েন্দা পুলিশ জেনেছে, মাসে লাখ লাখ টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। গ্রেপ্তারকৃতদের ব্যাংক হিসাবে প্রতিসপ্তাহে কয়েক লাখ টাকা করে জমা হয়। কিন্তু জমা হওয়ার দিনই মূল এজেন্টের কাছে টাকাগুলো চলে যায়। সাব এজেন্টরা পান কমিশন।

এ প্রসঙ্গে নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার আসিফ মহিউদ্দিন বলেন, ‘বিদেশি অপরিচিত লোকজনের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুত্ব করা এবং তাদের কাছ থেকে উপহার গ্রহণে রাজি হওয়া দুটোই বিত্তবান পরিবারের নারীদের ভুল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুত্ব করার আগে বন্ধু সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে হবে। না হলে বিপদে পড়তে হবে।’

গত ২৪ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত টানা চারদিন চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ঢাকায় অভিযান চালিয়ে প্রতারক চক্রের সদস্য বিপ্লব লস্কর, কায়েস হোসেন, রবিউল হোসেন ও মোশারুল ইসলাম মুছাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে প্রথমে ধরা পড়েন কায়েস হোসেন। তাঁর তথ্যের ভিত্তিতে ধরা পড়েন বিপ্লব লস্কর। আর বিপ্লবের তথ্যের ভিত্তিতে ধরা হয় রবিউল ও মোশারুলকে।

গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্য, বিদেশি প্রতারকদের মূল এজেন্ট বিপ্লব লস্কর। বিপ্লবই সাব এজেন্ট নিয়োগ দেন। সাব এজেন্টের মাধ্যমে আদায়কৃত টাকা দেশের নানা জেলার ব্যাংক ঘুরে পৌঁছে বিপ্লব লস্করের হাতে। গোপালগঞ্জের বাসিন্দা বিপ্লবকে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ খুঁজছিল দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু গ্রেপ্তার এড়াতে সমর্থ হন বিপ্লব। তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগরীর তিন থানায় অস্ত্র, অপহরণ ও প্রতারণার তিনটি মামলা আছে। তাঁর সহযোগী ও সাব এজেন্ট মো. কায়েস হোসেন, রবিউল হোসেন সজিব ও মোশারুল ইসলাম মুছা নিজদের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে প্রতারণার টাকা নেন। পরে প্রতিলাখে দুই হাজার টাকা করে কমিশনের বিনিময়ে ওই টাকা পৌঁছে দেন বিপ্লব লস্করের হাতে।

তবে মূল প্রতারক বিদেশি নাগরিক এখনো অধরা। গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ড আবেদন জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক স্বপন কুমার সরকার।

কেমন এই প্রতারণার ফাঁদ : ধনাঢ্য পরিবারের নারীদের টার্গেট করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিস্তারিত জানিয়েছেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের (বন্দর) সহকারী কমিশনার আসিফ মহিউদ্দীন।

তিনি বলেন, ‘বিদেশি প্রতারকরা মূলত বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ধনাঢ্য পরিবারের নারীদের টার্গেট করে। তারা প্রথমে ভুয়া নাম ঠিকানা ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলেন। এরপর টার্গেটকৃত নারীর কাছে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান। ওই নারী বন্ধুত্বের আহ্বানে সাড়া দিলে তাদের মধ্যে শুরু হয় চ্যাটিং। চট্টগ্রামের খুলশী থানার মামলার ক্ষেত্রে জয়া চৌধুরী এমন বন্ধুত্বের ফাঁদে পা দিয়েছিলেন।’

বন্ধুত্বের একপর্যায়ে জয়া চৌধুরীর কাছে কিছু উপহার পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিদেশি বন্ধুর কাছ থেকে দামি উপহার পাওয়ার প্রস্তাব পেয়ে জয়া চৌধুরী আপ্লুত হন। উপহার পাঠানোর প্রস্তাবের সপ্তাহখানেক পরেই বাংলাদেশ থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয়ে এক নারী ফোন করেন জয়া চৌধুরীকে।

কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ফোন করা ওই নারী জয়া চৌধুরীকে জানান, তাঁর নামে বিদেশ থেকে একটি পার্সেল এসেছে। এতে ডায়মন্ডসহ মূল্যবান সামগ্রী আছে। বাংলাদেশ কাস্টমস আইন অনুযায়ী শুল্ক পরিশোধ সাপেক্ষে এই পার্সেল ছাড়িয়ে নিতে হবে। শুল্ক পরিশোধের জন্য জয়া চৌধুরীকে চারটি ব্যাংক হিসাব নম্বর দেওয়া হয়। এসব হিসাবে টাকা জমা করার পর রসিদ ই-মেইলে পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়।

ডায়মন্ডসহ মূল্যবান উপহার সামগ্রী বিদেশ থেকে বাংলাদেশে পৌঁছেছে-এমন তথ্যে আপ্লুত হন জয়া চৌধুরী। পরে কাস্টমস কর্মকর্তার দেওয়া ব্যাংক হিসাব নম্বরগুলোত ১৮ এপ্রিল সাড়ে আট লাখ টাকা জমা করেন। এই টাকা জমার পর রসিদ ই-মেইল করার পর পুনরায় ফোন করেন কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া ওই নারী। তিনি জয়া চৌধুরীকে বলেন, ‘পার্সেলের শুল্কায়ন হিসাবে কিছুটা ত্রুটি হয়েছিল। বিদেশি পার্সেলের বিপরীতে শুল্ক এসেছে ১৫ লাখ টাকা। তাই জয়া চৌধুরীকে বাকি টাকাও পরিশোধ করতে হবে। না হলে এই বিষয়ে মামলা হতে পারে এবং সাড়ে আট লাখ টাকাও খোয়া যাবে।’

কাস্টমস কর্মকর্তার কাছ অবশিষ্ট টাকা না দিলে মামলার হুমকি পেয়ে জয়া চৌধুরী বুঝতে পারেন তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এরপর বিষয়টি পরিবার এবং গোয়েন্দা পুলিশকে জানান। গোয়েন্দা পুলিশের পরামর্শে অজ্ঞাতনামা প্রতারকদের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার সূত্র ধরেই গোয়েন্দা পুলিশ প্রতারণার রহস্য উম্মোচন করে।

প্রতারণার ধাপ : গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তা আসিফ মহিউদ্দিন জানান, মূল প্রতারক বিদেশি নাগরিক। তিনি জয়া চৌধুরীকে উপহার পাঠানোর প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘এটা তাদের দেশের রীতি। বন্ধুকে উপহার দিতে হয়।’ জয়া চৌধুরী উপহার নিতে রাজি হলে পার্সেল বাংলাদেশে এসেছে জানিয়ে ফোন করেন কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া আরেক বাংলাদেশি নারী। শুল্ক পরিশোধের টাকা জমা করতে বলেন ব্যাংক হিসাবে। এসব ব্যাংক হিসাবধারীও বাংলাদেশি নাগরিক। প্রথম ধাপে ছিলেন কায়েস হোসেন। তিনি একজন সাব এজেন্ট। তাঁর হিসাব নম্বরের বিপরীতে ব্যাংকের চেকে স্বাক্ষর করিয়ে জমা রাখেন মূল এজেন্ট বিপ্লব লস্কর। সাব এজেন্টের ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হওয়ার দিনই ডেবিট কার্ড অথবা চেকের মাধ্যমে টাকা তুলে নেন বিপ্লব লস্কর। এক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাব নম্বর ব্যবহৃত হওয়ায় প্রতি এক লাখ টাকার বিপরীতে দুই হাজার টাকা কমিশন পান সাব এজেন্ট কায়েস হোসেন।

দ্বিতীয় ধাপে প্রতারণার মাধ্যমে আদায়ের টাকা চলে যায় মূল এজেন্ট বিপ্লব লস্করের কাছে। এবার বিপ্লব লস্কর টাকা স্থানান্তরের জন্য আর ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করেন না। নগদ টাকা পৌঁছে দেন মূল প্রতারক তথা বিদেশির কাছে। এক্ষেত্রে বিপ্লব লস্কর পান প্রতি এক লাখ টাকায় তিন হাজার টাকা হারে কমিশন।

যোগাযোগ চলে হোয়াটঅ্যাপে : গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছেন, তাঁরা কখনো মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করে নিজদের মধ্যে যোগাযোগ রাখেন না। হোয়াটঅ্যাপ ব্যবহার করে যোগাযোগ রক্ষা করেন। তাঁদের পুরো বাসা থাকে ওয়াইফাই সিস্টেমের আওতায়। পরিবারের সদস্যরাও কথা বলেন হোয়াটঅ্যাপে। আবার হোয়াটঅ্যাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কোনো মোবাইল অপারেটরের সিম ব্যবহৃত হয় না। বিদেশি মোবাইল অপারেটরের সিম ব্যবহার করায় এই সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারেন না গোয়েন্দারা।

গ্রেপ্তার এড়ানোর ফাঁদ : প্রতারকরা প্রযুক্তিতে খুবই সচেতন। একজন ধরা পড়লেও যেন দলের অন্য কেউ ধরা না পড়েন, সেই লক্ষ্যে তাদের বিশেষ বার্তা দেওয়া থাকে। বার্তা হলো, কখনো কারো মোবাইল ফোন ৩০ মিনিটের বেশি বন্ধ থাকবে না। এর বেশি বন্ধ থাকলে অন্যরা বুঝে নেবে দলের এই সদস্য বিপদে পড়েছেন বা গ্রেপ্তার হয়েছেন। অতএব, অন্যরা নিরাপদে সরে যাবে। তার সঙ্গে আর কখনো যোগাযোগ হবে না।

অধরা বিদেশিরা : প্রতারণার ফাঁদ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেলেও বিদেশি প্রতারকরা এখনো অধরা। গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, তাদের ধরার চেষ্টা চলছে। আপাতত নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও আয়ারল্যান্ডের কয়েকজন নাগরিকদের নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। তবে এখনো প্রতারণার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে যারা কাজ করছে তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে