আপডেট : ২১ জুলাই, ২০১৬ ১১:০০

উত্তরাঞ্চলের শতাধিক চরে প্রশিক্ষণ নিয়েছে জঙ্গিরা!

বিডিটাইমস ডেস্ক
উত্তরাঞ্চলের শতাধিক চরে প্রশিক্ষণ নিয়েছে জঙ্গিরা!

বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের শতাধিক দুর্গম চরে আস্তানা গেড়েছিল জঙ্গিরা। সেখানে জঙ্গি সদস্যদের অস্ত্র চালানো থেকে শুরু করে নানা রকম প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। সম্প্রতি গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর ব্যাপক অভিযান শুরু হওয়ায় জঙ্গিরা এসব আস্তানা ছেড়ে পালিয়েছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই সংবাদমাধ্যমে চরগুলোতে সন্দেহজনক জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন তখন গা করেনি। এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, শোলাকিয়ায় হামলার পর গ্রেপ্তার জঙ্গি শফিউলের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার আগে চরের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের কাছে খবর ছিল না।

তবে চরগুলো এখন গোয়েন্দাদের নজরদারিতে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি এত দিন বেশির ভাগ চরকেই তাদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করত। বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার ১০টি চরে যৌথ অভিযান শেষে গত সোমবার বগুড়ায় আয়োজিত ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেছেন, গুপ্তহত্যায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের স্থানগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন সময়ে ধরা পড়া জঙ্গিদের তথ্য মতে, উত্তরবঙ্গের বিচ্ছিন্ন চরে প্রশিক্ষণ হয়েছে তাদের। বগুড়া এর মধ্যে অন্যতম।

বগুড়ার সারিয়াকান্দির দুর্গম চর কাজলা, শোনপচা ও ধারাবর্ষায় জেএমবি সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে সরেজমিন ওই প্রতিবেদনের পরও প্রশাসন সে সময় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি চরগুলোতে এত দিন গোয়েন্দা নজরদারিও ছিল না। স্থানীয়রা বলছে, আরো আগে থেকে ব্যবস্থা নিলে জঙ্গিরা সংগঠিত হতে পারত না।

একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, শোলাকিয়ায় হামলার পর অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার শফিউল ওরফে শরীফুলসহ ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার আরো কয়েকজন জঙ্গি সদস্য জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, বগুড়া, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের দুর্গম চরে তাদের প্রশিক্ষণ হয়েছে। সেখানে তাদের অস্ত্র চালনোসহ বিভিন্ন কায়দা শেখানো হয়েছে। শফিউলের বাড়ি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে। শফিউল জানিয়েছে, তারা চারজন মিলে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিল। সেখানে দুজন ছিল তাদের প্রশিক্ষক, আরেকজন সমন্বয়ক। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবীর রহমানের সঙ্গে তার (শফিউল) যোগাযোগ ও সমন্বয়ের কাজ করেছে ওই সমন্বয়কারী। বাড়িভাড়া, অস্ত্র, জামাকাপড় সরবরাহসহ যাবতীয় আনুষঙ্গিক বিষয় দেখভালের দায়িত্বও ওই সমন্বয়কারীর।

বগুড়ার চরে অভিযানের পর র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা বলেন, একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ দেয় ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিরা। তবে প্রশিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নেয় একই জায়গা থেকে।

র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি তাঁরা জঙ্গিদলের প্রশিক্ষণ শেষ না করে ফিরে আসা অন্তত ছয় তরুণের সন্ধান পেয়েছেন। জঙ্গিদের মতবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার পর ঘর ছেড়েছিল তারা। তবে চরাঞ্চলে বিশেষ প্রশিক্ষণে টিকতে পারেনি তারা। বিশেষ প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তাদের প্রথমেই জনমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। দিনের পর দিন দরজা-জানালা বন্ধ একটি অন্ধকার ঘরে থাকতে দেওয়া হয় তাদের। কিন্তু এভাবে থাকতে ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাদের দল থেকে বের করে দেওয়া হয়।

র‌্যাব-১২-এর অধিনায়ক শাহাবুদ্দিন খান বলেন, বগুড়ার কাজলা ইউনিয়নে বেশ কিছু দুর্গম চর রয়েছে। সেখানে জনমানবহীন এমন কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে মাসে এক দিনও কেউ যায় না। এ রকম অনেক জায়গায় জঙ্গিদের আস্তানার আলামত পওয়া গেছে। ঝাউগাছ ও কাশবনের মধ্যে ঘরের অস্তিত্ব পেয়েছেন তাঁরা। ধারণা করা হয়, এসব ঘরেই প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত সদস্যদের রাখা হতো। পরে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যাওয়া হতো ভিন্ন চরের ভিন্ন জায়গায়।

কাজলা ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা জানায়, শুকনো মৌসুমে বগুড়া থেকে নদীপথে অনেক ঘুরে এখানে আসতে হয়। কোনো কোনো চরে পৌঁছতে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লাগে। এ কারণে সাধারণত লোকজন এদিকে আসতে চায় না। তবে চার-পাঁচ বছর ধরে চরে অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা দেখেছে তারা। শহরের লোকজনের খামখেয়ালিপনা ভেবে তারা এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেয়নি। চরের লোকজন প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে। ফলে জঙ্গিদের আনাগোনার ব্যাপারটি এত দিন তারা জানত না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার সীমান্তে যমুনা নদীর মধ্যে ৪৫টি চর রয়েছে। এর মধ্যে সারিয়াকান্দির চরগুলো নদীপথে বেশি দুর্গম। এসব চরের মধ্যে রয়েছে বোহাইল ইউনিয়নে কমলপুর, মাঝিরা, চক মাঝিরা, শংকরপুর, ধারাবর্ষা, উত্তর ধারাবর্ষা, দক্ষিণ ধারাবর্ষা, আউলাকান্দি, পোওতিবাড়ি। চন্দনবাইশা ইউনিয়নে রয়েছে আটাচর। কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নে রয়েছে জাওনিয়ার চর, নান্দিনার চর, শোনপচা, তালতলা ও ডাকাতমারা। কাজলা ইউনিয়নে রয়েছে নব্বইয়ের চর, জামথল, টেংরাকুড়া, পাকেরদহ, পাকুরিয়া, বেড়া পাঁচবাড়িয়া, ঘাগুয়ারচর, তেরোখাদি ও কুড়িপাড়া। হাটশেরপুর ইউনিয়নে রয়েছে চকরথিনাথ, ধনারপাড়া, লয়াপাড়া, দিঘাপাড়া, মূলবাড়ী ও কলমজাপাড়া। চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নে রয়েছে শিমুলতাইড়, মানিকদাইড় ও পাঁচগাছি। দুর্গম এসব চরে র‌্যাবের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী গত রবিবার রাত থেকে সোমবার বিকেল পর্যন্ত কাজলা ইউনিয়নে জামথল ও টেংরাকুড়ায় অভিযান চালায়। অভিযান শেষে জানানো হয়, সেখানে জঙ্গিদের একাধিক আস্তানার আলামত পাওয়া গেছে।

সারিয়াকান্দি ও কালিতলা নৌঘাটের মাঝি আমিনুল, ফরিদসহ আরো কয়েকজন জানান, এই পয়েন্টে থেকে অপরিচিত অনেকেই নৌকা ভাড়া করে। এমন অনেক চর রয়েছে সেখানে যেতে-আসতে এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত নৌকা ভাড়া নেওয়া হয়। এর পরও অনেকে নৌকা ভাড়া করে সেসব চরে যায়। বিভিন্ন সময় তারা বড় বড় ব্যাগ বহন করলেও তাদের চালচলনে কখনো সন্দেহ করার মতো কিছু ছিল না।

সারিয়াকান্দি থানার ওসি জানান, নদীপথে তাদের টহল দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে একটিমাত্র টহল বোট থাকায় অনেক সময় পুরো এলাকা টহল দেওয়া সম্ভব হয় না। আর এসব দুর্গম চরে ঘুরে ঘুরে টহল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সাপোর্টও তাঁদের নেই।

গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, শোলাকিয়ায় হাতেনাতে গ্রেপ্তার জঙ্গি শফিউলের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁরা চরের এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির কথা জানতেন না। শফিউলের তথ্যানুযায়ী, শোলাকিয়ায় হামলার পর পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিরা হলো বাইক হাসান ওরফে নজরুল, মামা খালেক, বিজয়, গোলাম রাব্বানী, রিয়াজুল ওরফে মেহেদী ও সাদ্দাম ওরফে রাহুল ওরফে চঞ্চল। জেএমবির সংগঠক বাইক হাসানের বাড়ি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায়। সে বিভিন্ন স্থানে হামলার নেপথ্যের কারিগরদের একজন। রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি, ঝিনাইদহে শিক্ষক রতন কুমার, কুড়িগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলীর ওপর হামলাসহ বিভিন্ন হামলায় সে অংশ নিয়েছে। কোথায় হামলা হবে, কোন হামলায় কে জড়িত থাকবে, তার পরিকল্পনাও করে সে।

গোয়েন্দারা বলছেন, শফিউল জানিয়েছে, শোলাকিয়া ও গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিরা একই নেটওয়ার্কের। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন চরে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সেখানেই তাদের আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ থাকে। তাদের আরো আস্তানা রয়েছে জামালপুর ও গাইবান্ধায়। বিজয় নামের এক যুবক চরে তাদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেয়। জঙ্গিদের প্রায় সবাই যমুনা নদীর চরে অস্ত্র চালানো শিখেছে।

গোয়েন্দারা জানান, জঙ্গি রিয়াজুল ইসলামের বাড়ি কুড়িগ্রামের ফরকেরহাটে। সাদ্দাম ওরফে চঞ্চল ওরফে রাহুলের বাড়ি কুড়িগ্রামের রাজারহাটের বিদ্যানন্দের চরে। একই এলাকায় বাড়ি গোলাম রাব্বানীর। বিজয়ের বাড়ি বগুড়ায়। মামা খালেকের আসল বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। কিন্তু পরে সে দিনাজপুরে বসবাস শুরু করে। শফিউল ইসলামের সঙ্গে এই জঙ্গিরাও বিভিন্ন সময় বগুড়ার সারিয়াকান্দির চরে অবস্থান করেছে।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, বগুড়ার বিভিন্ন স্থানেই তাঁদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের হাতে এমন কিছু তথ্য রয়েছে যা ভাবিয়ে তোলার মতো। তবে আমরা পরিকল্পনা করে সামনে এগোচ্ছি। বগুড়ায় কোনো সন্ত্রাসী পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাবে না।

সূত্র- কালের কণ্ঠ

জেডএম

উপরে