আপডেট : ২৯ নভেম্বর, ২০১৬ ১০:২৭

সরকারের রাজস্ব আত্মসাৎ করে কোটিপতি এখন দলিল লেখক

অনলাইন ডেস্ক
সরকারের রাজস্ব আত্মসাৎ করে কোটিপতি এখন দলিল লেখক

ঘটনা এক:  রিনা আক্তার। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার আলীরচর গ্রামের জামাল মিয়ার স্ত্রী। স্বামী বিদেশে থাকেন। সম্প্রতি একটি জমি রেজিস্ট্রি করেন। এর শ্রেণি ছিল নাল, যার সরকারি মূল্য ২০ লাখ টাকা। কিন্তু দলিল লেখক জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে নালকে বানিয়েছেন ডোবা। মূল্য দেখিয়েছেন দুই লাখ টাকা। দলিল লেখকের এ প্রতারণায় সরকার রাজস্ব হারিয়েছে এক লাখ ৬২ হাজার টাকা। এই হয়রানির সুরাহা পাচ্ছেন না গৃহবধূ।

ঘটনা দুই : উপজেলার বাখরাবাদ মৌজায় ১০৪৫ দাগ চান্দিনা ভিটি। ভিটি জমির প্রতি শতাংশের সরকারি দাম ৪২ লাখ ৩৪ হাজার ৯৫২ টাকা। সম্প্রতি ওই মৌজায় জমি রেজিস্ট্রি হয় ৫.৯৪ শতাংশ, যার সরকারি মূল্য দাঁড়ায় দুই কোটি ৫১ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৪ টাকা। বিধিমতো, এর ৯ শতাংশ (২২ লাখ ৬৪ হাজার পাঁচ টাকা) সরকারি কোষাগারে ব্যাংক চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। কিন্তু ভুয়া কাগজ বানিয়ে চান্দিনা ভিটিকে শ্রেণি পরিবর্তন করে বাড়ি দেখানো হয়েছে। এ অনুযায়ী জমির দাম তালিকা অনুযায়ী আসার কথা ৩২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৯৩ টাকা। এখানে সরকারের রাজস্ব পাওয়ার কথা ছিল দুই লাখ ৯১ হাজার ১২২ টাকা। তবে এখানে অফিসের লোকদের সহায়তা নিয়ে দলিলের মূল্য দেখানো হয় ২৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। যা থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয় দুই লাখ ৪০ হাজার ৩০০ টাকা। যে কারণে এখানে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় ৫০ হাজার ৮২২ টাকা। এসব দলিল রেজিস্ট্রি বাবদ সরকার মোট রাজস্ব হারায় ২৩ লাখ ১৪ হাজার ৮২৭ টাকা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছরের ৭ মার্চে মুরাদনগর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে ২২০৫, ২২০৬ ও ২২০৭ নম্বর দলিলে রাজস্ব ফাঁকি ঘটেছে। এই জমির দলিলগুলোর লেখক মুরাদনগর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক সমিতির সভাপতি শাজাহান (সনদ নম্বর ১৭)।

রামচন্দ্রপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাখরাবাদ মৌজার ১০৪৫ দাগের জমি চান্দিনা ভিটি। আমার কাছে এর প্রমাণ রয়েছে।’ দলিল গ্রহীতা রামচন্দ্রপুর গ্রামের দিন মোহাম্মদ বলেন, ‘শাজাহানের কথায় ও কাজে ঠিক নেই। জমির দলিল যেভাবে রেজিস্ট্রি করার কথা ছিল, সেভাবে করেননি। পরে অনেক দেনদরবার করার পর এক লাখ টাকা আমাদের ফেরত দিয়ে ক্ষমা চান।’ মুরাদনগর সাবরেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গড়ে মাসে এক হাজার ২০০ দলিল হয়। গত ১৮ মাসে শাজাহান মোক্তার ৮০ শতাংশ দলিল বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে ভাগিয়ে নেন। অফিসের অসাধু কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা তাঁর অপকৌশল। এর মাধ্যমে সরকারের মোটা অঙ্কের রাজস্ব আত্মসাৎ করে কোটিপতি হয়েছেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্তত ২০ জন দলিল লেখক জানান, শাজাহান ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় এই রেজিস্ট্রি অফিসে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছেন। দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকা থেকে দলিলের কাজ সংগ্রহ করেন। তাঁর বাসা সদরে হওয়ায় তিনি সব দলিল লেখকের সঙ্গে বসে কাজ করেন না। বিগত সরকারের আমলে তাঁকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জাল দলিল ও স্ট্যাম্পসহ হাতেনাতে ধরে জেলহাজতে পাঠিয়েছিল।

অভিযুক্ত শাজাহান সুরে সুরে বলেন, ‘আমি শাহাজাদা, আমার কর্মচারীরা হচ্ছে হারামজাদা। তারা করেছে ভুল, তাই আমি দিব সে ভুলের মাসুল।’ তিনি আরো বলেন, ‘আর যদি করেন প্রশ্ন, দিব না উত্তর। পারলে দেন লেইখা, আমার কাছে আছে মন্তর।’

কুমিল্লা জেলা রেজিস্ট্রার শাহাবুদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘দলিল লেখক শাজাহানের বিরুদ্ধে আমাকে কেউ জানায়নি। লিখিতভাবে জানালে ব্যবস্থা নেব।’

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/বুলা

উপরে