আপডেট : ১৮ জানুয়ারী, ২০২১ ০১:২৬

নগরের বরফ সময়...

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
নগরের বরফ সময়...

১৬ ডিসেম্বর ২০২০। রাত তিনটার দিকে মিয়ানমারের ইরাবতি নদীর ৩৪ হাজার ফিট উপরে বসে প্লেনের বাম জানালায় পশ্চিম আকাশে ঢুবে যাওয়া বিশাল চাঁদটিকে দেখছিলাম। আমার চোখে অপার বিষাদ। দুবছর আগে ঠিক এই দিনটিতে দেশে ফিরেছিলাম বাবার মৃত্যু সংবাদ শুনে। আকাশে বসে পুর্নিমার চাঁদ এই প্রথম দেখা। বিশাল এক ফুটবল মাঠের মত চাঁদটির আলো ছড়িয়ে পড়ছে মেঘের ওপর। আর ওই মায়াবী আলোয় মেঘ সেজেছে এক অপার্থিব সাজে। আমার মনে তখন গভীর বিষন্নতা।

ঠিক একই সময়ে ঢাকার ইন্দিরা রোডের একটি নয়তালা বাসার ছাদে রেমি নামে এক ১৯ বছরের কিশোরী তাকিয়েছিল একই চাঁদের দিকে। ক্লান্ত রিক্ত সবর্স্ব হারানোর রেমির শুন্য দুচোখ যেন অসীমে মিলিয়ে যাওয়ার তীব্র আকর্ষণ। আকর্ষণ পৃথীবীর সব ব্যাথা মুক্তির। আকর্ণ প্রতারণার ব্যাথা ও  পরিবারের সবার প্রতি তীব্র অভিমানবোধে প্রিয়জনদের কাছ থেকে একদম দূরে সরে যাওয়ার। ওর হাতে সময় মাত্র ২৫ সেকেন্ডে।

বেদনার্ত চোখ যখন ঘুমে ঢুলুঢুলু সেই মুহুর্তে রেমি ঝাঁপ দিয়েছিল শুন্যে। না। ও চাঁদ ছুঁতে চায়নি। চেয়েছিল পৃথিবী থেকে একদম দূরে কোথাও চলে যেতে যেখানে কোন ব্যর্থতার যণ্ত্রণা নেই।ওইদিনের বিশাল সুন্দর চাঁদটিও আটকাতে পারেনি ওকে।

নীচের দিকে পড়তে পড়তে রেমি ভবনটির আটতলার জানালায় তাকালো। দেখতে পেল এক মা পরম আদরে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে তার আট বছরের কন্যা সন্তানকে। সেই অন্তীম মুহুর্তে রেমির চোখে ভেসে এল তার আপন মায়ের কথা। তিনিও একদিন এভাবে পরম যত্নে মমতায় আগলে রেখেছিলেন রেমিকে। রেমির জীবনে অনেক দু:খ। অনেক বড় বড় ঝড় বয়ে গেছে ওর এই ছোট জীবনে। অভিকর্ষে সাত তলা অতিক্রম করতে করতে মনে ভেসে এল তার মায়ের অন্তীম মুহুর্তের কথা। সতেরো বছর পর্যন্ত জীবনটা বেশ আনন্দের ছিল ওর। বাবা মা নানা নানি আর অনেকগুলো খালাতো ভাইবোন মিলে তেজতুড়ি বাজারের একটি বাড়িতে থাকতো ওরা। বাড়িটি ওর নানার। আলাদা ফ্লাটে থাকলেও সবাই এক ধরনের একান্নবর্তি পরিবারের মধ্যেই বসবাস করতো। ২০১৭ সালের কোন একদিন ওর বাবা মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল।সঙ্গে তার নানাও। বাবা গাড়ি চলাতে পারতো না। ড্রাইভারও আসেনি। বাবা গাড়ি নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার সময়ে বনানীতে একটি জায়গায় থামতে গিয়ে ব্রেক কষার পরিবর্তে এক্সিলেটরে চাপ দেওয়ায় তাদের গাড়িটি একটি দেয়ালে আছড়ে পড়ে। বাবা নানা সিট বেল্ট বাধা থাকায় তারা রক্ষা পায়। কিন্তু রেমির মা পেছনের সিট থেকে ছিটকে এসে গাড়ির সামনের কাচের গ্লাস ভেঙ্গে বাইরে পড়ে যায়। এরপর হাসপাতালে তিনদিন জীবনমৃত্যুর সঙ্গে লড়ে হেরে যায় রেমির মা। হাসপাতালের আইসিউতে মায়ের সেই মুখটি বারবার মনে পড়ছে রেমির।কিছুক্ষন আগে যে তীব্র অভিমানবোধের আগুনে যে চোখ দাউ দাউ করে জ্বলছিল সেখানে এখন বাধভাঙ্গা কান্না।

ছয়তলা নামতে নামতে রেমির মনে ভেসে আসছিল কত প্রিয় মুহুর্ত প্রিয় মুখ ছোট ভাই শৈশবের কথা আর এসব ছাপিয়ে ভেসে এল তার আর এক দু:খের কথা। মা মারা যাবার পর ভীষন বেদানার্ত হয়ে পড়লেও ও কোনদিন কাঁদতে পারেনি ছোট ভাইটির জন্য। সারাক্ষন মনে হতো ওকে কে দেখবে। বেদনা ভুলে সে আকড়ে ধরলো ছোট ভাইকে। ভাই তখন কিছু্ই বোঝে না। মাঝে মধ্যে মাকে খোঁজে। প্রায়ই সেসময়ে কথায় কথায় ভিষন কান্না পেত ওর। ছোট ভাইয়ের কথা চিন্তা করে কাঁদতেও ভুলে যায় সে। ভাইকে মায়ের অভাব ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে তাকে ও। চৌদ্দ বছরেই যেন চব্বিশ বছরের তরুণীতে পরিনত হয় সে। বুঝতে শুরু করে সংসারের নানা টানাপোড়েন।

সেসময়ে পরিবারের সবার কথা ‘সংসারে একজন মা চাই’। রেমির নানাই বেছে শুনে একদিন একজন নারীকে খুঁজে বিয়ে দেন ওর বাবার সঙ্গে। যেদিন সেই নারী সেজেগুজে বউ সেজে রেমির মায়ের ঘরে এসে ঢোকে সেদিন থেকেই ওর জীবনে তৃতীয় দু:খের জগত শুরু হয়। প্রথম প্রথম সে বোঝার চেষ্টা করতে থাকে কি হচ্ছে তার আসেপাশে। কিন্তু নানা নানী খালা খালু সবাই যখন নতুন মাকে নিয়ে ব্যস্ত  রেমি তখন দিশেহারা। রেমির মনে প্রশ্ন কে এই নারী ? যিনি ওর বাবার হাত ধরে আছেন?যিনি আজ থেকে ওর নতুন মা। রেমি কিছুতেই মেনে নিতে পারে না এটা। রেমির মনে ধারণা হতে থাকে ওর কষ্টটা কেউ বুঝতে পারছে না। এক সময়ে ধারনাটি ওর বিশ্বাসে পরিণত হয়। ও ভিষন একা হতে থাকে। মাঝে মধ্যে মনে হয় ভাইকে নিয়ে কোথাও পালিয়ে যায়।

পাঁচতলার জানালায় রেমি দেখতে পায় স্বামী স্ত্রী ঝগড়া করছে। এই বাসায় প্রচুর ঝগড়া হয় । তা এই বিল্ডিংএর সবাই জানে। এই ঝগড়া দেখতে দেখতে রেমির নতুন মায়ের সঙ্গে ওর বাবার ঝগড়ার কথা মনে পড়ে যায়। প্রথম প্রথম কিছুদিন নতুন মা আর বাবার সংসার ভাল গেলেও আস্তে আস্তে সংসারে নানা অশান্তি শুরু হয়। নতুন মা কোনমতেই রেমির নানা বাড়িতে থাকবেন না। কারণ এখানে রেমির মায়ের দিকের প্রভাব অনেক বেশি। সে তার বাবাকে তাগাদা দিতে লাগলো নতুন ফ্লাটে উঠে যাওয়ার । সেসময়টায় প্রতিদিনই বাবার সঙ্গে মায়ের ঝগড়া লেগে থাকতো। কোন কোন দিন নতুন মা ঝগড়া করে তার বাবার বাড়িতে চলে যেত। সে দিনগুলিতে বাবাও কেমন জানি অন্যরকম ব্যববহার করতো রেমির সঙ্গে। অনেক রাগ দেখাতো। রেমির মনে হতো এ সংসারে ও যেন এক অপাংতেয় হয়ে উঠছে। বাবা যেন ওকে আর সহ্যই করতে পারছে না। মাঝে মধ্যে নানা নানী খালাকে এসব কথা বলতো সে। কিন্তু তারাও যেন কেমন হয়ে গেছে। বাবার নতুন সংসারের বিষয়ে তারা কোন খোলাখুলি কথা বলতো না। কারন বাবা সবসময়েই ডিফেনসিভ থাকতো নতুন মায়ের বিষয়ে। মাঝে মধ্যে ওর মনে হতো বাবা যেন নতুন মাকে আগলে রাখছে পুরো পরিবার থেকে। আর বাবারও মনে হত নতুন মাকে পরিবারের কেউ গ্রহণ করতে পারছে না। এই টানাপড়েনের সম্পূর্ণ প্রভাব রেমির ছোট মাথায় বিশাল এক বোঝার মত হয়ে উঠলো। আস্তে আস্তে পড়াশোনায় ব্যঘাত শুরু হলো। কিন্তু বাবার ধারণা রেমি কিছুই পারছে না । অভিযোগের পর অভিযোগ ওর জীবনটা দুর্বিসহ করে তুললো। এরপরে গত বছরের মাঝামাঝি রেমির বাবা তার নানা বাড়ি ছেড়ে ইন্দিরা রোডের এই ফ্লাটটিতে এসে উঠলো। এই বাড়িতে রেমি তার ছোট ভাইকে নিয়ে আস্তে আস্তে একা হতে শুরু করে। নতুন বাড়িতে ওর মায়ের দিকের আত্মীয়দের সঙ্গে আস্তে আস্তে সংযোগ বিছ্ছিন্ন হতে শরু করে রেমির বাবার। সেই জায়গাটি দখল করে রেমির নতুন মায়ের আত্মীয় স্বজনরা। রেমি মেনে নিতে পারে না এসব। নিজেকে বড় একা আর অসহায় ভাবতে শুরু করে। ওর নতুন মাও পারেনি রেমিকে আপন করে নিতে। এভা্বে একা হতে হতে সে আস্তে আস্তে পরিবার থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করে। রেমির ঘর থেকে বাইরের জগতটাই হয়ে যায় কাছের; আপনজনদের মত। রেমির যত আনন্দ পুরোটাই ওই বাইরের জগতেই। সেখানেই সে বেশি সময় কাটাতে শুরু করে। সেখানেই প্রতারক পুরুষদের খপ্পরে পড়ে যায় রেমি কয়েকবার। এ দিকটার দিকে কখনই তাকায়নি ওর বাবা। সংসারে অশান্তি শুরু হয় ধীরে ধীরে। গত ডিসেম্বর এ নিয়ে তীব্র বাদানুবাদ হয় ওর বাবার সঙ্গে। সবশেষে ১৫ ডিসেম্বর দূপুরে বাবার হাতে প্রচণ্ড মার খায় রেমি। বাবা কেড়ে নেন  নিয়ে নেওয়া ওর মোবাইল ফোনটি। ভিষন অভিমানে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ও।পৃথিবীর কাউকেই আর আপন মনে হয় না ওর।  

চারতলার জানালা দিয়ে রেমি দেখতে পায় তার বয়সী কতগুলো ছেলে মেয়ে বেশ দারুন আড্ডা দিচ্ছে। শহরে চাঁদা দিয়ে এরকম রুম পাটি ও রুম ডেটিং এখন বেশ জনপ্রিয়। এরকম পার্টিতে সে কয়েকবার গেছেও। আড্ডা ড্রাগ কখনও জৈবিক তারনা সমন্ধে কিছু কিছু অভিজ্ঞতাও হয়েছে ওর। এসব পার্টিতে কিছু বন্ধু বান্ধব তৈরি হয়েছে ওর। কিন্তু ওদেরকে একদম সহ্য করতে পারে না ওর বাবা মা। কিন্তু ওদের সঙ্গে রেমির থাকতে ভাল লাগে। এ নিয়ে বাবার সঙ্গে বাদানুবাদ হয়েছে বেশ কবার। নতুন মা রামীকে কিছুই বলে না। তার যত অভিযোগ তা হচ্ছে বাবাকে তাতিয়ে দেওয়া। এর পরের সব কাজ বাবাই করেন। বাবা আস্তে আস্তে দূরে সরতে থাকেন রেমির জীবন থেকে।

শুন্যে ভাসতে ভাসতে মনে পড়ে যায় ওর ছোটবেলার কথা। একদিন ছুড়ি নিয়ে খেলতে যেয়ে হাত কেটে গিয়েছিল ওর । বাবা এসে হাত থেকে ছুড়িটা কেড়ে নিয়ে সপাটে এক চড় বসিয়ে দিয়েছিল ওর গালে। তারপরে ওর বাবাও অনেক কেঁদেছেন। পুরো একমাস ওকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে নিয়ে গেছেন। আজ সেই বাবার এ্ত পরিবর্তন আর মানতে পারে না ও। সব কিছুই কেমন জানি বিষাক্ত মনে হয়। সবাইকে আজকাল ও শত্রু মনে হয়। চারপাশের উৎসুক সুযোগসন্ধানী পুরুষগুলোকেওও বুঝতে পারে না। দেরী হয়ে গেছে অনেক। মধ্যকর্ষের তীব্র আকর্ষনে ও প্রবল বেগে তিনতলা দোতলা পেড়িয়ে রেমি আছড়ে পরে রাস্তায়। গভীর শুন্যতায় রেমি একসময়ে নিজেকে আবিস্কার করে মেঘের মাঝে ভেসে বেড়াচ্ছে। তখনই মনে পড়ে বাবা আসলে তার অনেক কাছের যাকে ও চিনতে পারেনি কোনদিন। উপলিব্ধি করতে পারে আকাংখ্যা যত কম পৃথিবী তত সুখের তত আনন্দের। ভাইটির কথা মনে পড়ে। রেমিকে ছাড়া ও কিভাবে থাকবে। কিন্তু অনেক দেরী হয়ে গেছে। রেমি ভাসতে ভাসতে মিলিয়ে যেতে থাকে মেঘের রাজ্যে।  

পাদটিকা: রেমি এখনও বেঁচে আছে। ও আমার কাছের পরিচিত একজনের আত্মীয়। ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে ঢাকার একটি নামকরা মহিলা কলেজে। খুবই মেধাবী ছাত্রী। গত ১৬ ডিসেম্বর শেষরাতে বাবা ও নতুন মায়ের সঙ্গে রাগ করে নয়তলা ছাদ থেকে ঝাঁপ দেয় সে। লোকজন যখন তাকে উদ্ধার করে তখন তার শরীর দূভাঁজ হয়ে গেছে। ঢাকার একটি নামী হাসপাতালে দু সপ্তাহ কোমায় থাকার পরে গত দশ জানুয়ারী জ্ঞান ফেরে ওর। ধীরে ধীরে কথা বলাও শুরু করে। এরই মধ্যে আরও দুটি অস্ত্রপচার হয় ওর শরীরে। রেমি বেঁচে গেছে। তবে সারাজীবনের জন্য বিছানায় নিশ্চল শুয়ে থাকতে হবে ওকে। মস্তিস্ক কাজ করলেও ওর মেরুদন্ড ও সারা শরীর বিকল হয়ে গেছে। কথা বলতে পারলেও হাত পা এমনকি মাথা ডানে বায়ে ঘোরানোর সামার্থ্য নেই ওর। রেমির বাবার অনেক টাকা। কিন্তু পৃথিবীর সব চিকিৎসার উর্ধে উঠে গেছে ও। রেমি এখনও স্কয়ার হাসপাতালেই আছে। একদিন হয়তো রেমি ঘরে ফিরে যাবে। সেই জীবনটা ওর কেমন হবে সেটা ভাবতেই বুকের মধ্যে কেমন জানি এক তীব্র হাহাকার করে ওঠে। ভিষণ কষ্ট হয় এই অচেনা মেয়েটির জন্য। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। রেমি তা আর দেখতে পাবে না কোনদিন। সারা জীবন থাকতে হবে অন্যের বোঝা হয়ে। সময়িক মোহ আর অকল্পনিয় জেদের কাছে হেরে গেছে ও। হয়ত সবকিছু ছাপিয়ে একদিন গভীর অনুতাপ এসে আচ্ছন্ন করবে ওকে। জানি না সেই অনিশ্চিত যন্ত্রণার ভবিষৎ ও আর ওর পরিবার কিভাবে সামলাবে।

একান্নবর্তি পরিবার থেকে একক পরিবারে রুপান্তরিত আমাদের ক্ষয়িষ্ণু সমাজে রেমির মত এরকম অসংখ্য ‘রেমির’ জন্য শুভকামনা। তারাও একদিন বুঝবে জীবনকে কখনও একপাশ থেকে দেখতে নেই। অন্যপাশেও কিছু যুক্তি থাকে যা হয়ত আরও যৌক্তিক। আর পরিবারই হচ্ছে দিনশেষে সবশেষ ঠিকানা। পরিবাবের সবাই সবাইকে ভালবাসে যে যার মত করে। পৃথিবীর সব রেমিরা সুখে ও আনন্দে থাকুক অনন্ত কাল।

উপরে