আপডেট : ৩০ অক্টোবর, ২০২০ ২২:৫৩

ওয়াহাবী আক্রোশেই আগুন জ্বলে বাংলায়; পুড়ে ছাই হয় জীবন্ত মুসলমান

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
ওয়াহাবী আক্রোশেই আগুন জ্বলে বাংলায়; পুড়ে ছাই হয় জীবন্ত মুসলমান

আবূ মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহুর রসূল! সর্বোত্তম মুসলিম কে? তিনি বললেন, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।’ [বুখারি ১১, মুসলিম ৪২, তিরমিযি ২৫০৪, ২৬২৮, নাসায়ি ৪৯৯৯]

সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সৌদি আরবই যে ওয়াহাবিবাদের পৃষ্ঠপোষক সেটা স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করলেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। তার এ সাহসী উচ্চারণে নড়েচড়ে বসেছে মুসলিম বিশ্ব। আর নতুন করে বিপদ টের পাচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব। সাক্ষাৎকারে সৌদি প্রিন্স বেশ স্পষ্ট ভাষায় ও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, ‘গত শতকের ৭০ দশকে স্নায়ুযুদ্ধের সময় পশ্চিমারাই ওয়াহাবিবাদের প্রচারে অর্থ ঢালতে সৌদি আরবকে অনুরোধ করেছিল।’ প্রিন্সের ধারণা করেন, মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের যেন কোনো সুসম্পর্ক তৈরি না হয় সেজন্যই পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো সৌদি আরবকে ব্যবহার করেছে। পশ্চিমাদের অনুরোধেই বিভিন্ন দেশে মসজিদ-মাদরাসায় অর্থ ঢেলে ওয়াহাবি মতাদর্শের বিস্তারে কাজ করেছে সৌদি আরব। মূলত কাজটি ছিল ইসলাম ধর্মের মাঝে নানা বিভেদ তৈরি করা। তারা এতে সফলও হয়েছে। গত ত্রিশ বছর ধরে এই প্রচারণার নেতিবাচক প্রভাবে গায়ে গভীর ক্ষত নিয়ে আজ ধুঁকছে মুসলিম বিশ্ব।

হাজার বছরের যা কিছু গৌরবের সেই মুসলিম বিশ্বের আজকের এই পরিণতির জন্য দায়ী ওয়াহাবি দর্শন। এ কারণে বর্তমানে মুসলিমরা সারা বিশ্বেই বর্ণবাদের শিকার হচ্ছে। নিগৃহীত হচ্ছে। বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম দেশ এখন ওয়াহাবিবাদের ভাইরাস বহন করে চলেছে। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে নিজেদের মধ্যে। মতাদর্শের বিরোধ হলেই এক মুসলিম হত্যা করছে আর এক মুসলিমকে। চোখের সামনেই ইরাককে পুড়তে দেখা গেছে। আফগানিস্তানের রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে অগণিত মুসলিমের মৃতদেহ। বোমায় ক্ষতবিক্ষত হতে দেখেছি আমরা সিরিয়াকেও। গ্যাসবোমা দিয়ে শিশুদের মারার দৃশ্য আমাদের শিহরিত করেছে। ইসলামী স্টেটের (আইএস) যোদ্ধারা ধর্ষণ করছে মুসলিম নারীদেরও। ভূমধ্যসাগর থেকে গুলশানের হলি আর্টিজান- সর্বত্রই এই ওয়াহাবিবাদের নির্মম নিদর্শন; যা সারা বিশে^ মুসলিমদের একটি নেতিবাচক পরিচিতি দিয়েছে।
পশ্চিমারা আমাদের দিয়েই আমাদের মারছে। মাঝখানে অস্ত্র বিক্রি করছে তারা। পূর্ব ইউরোপের ৮টি দেশের অর্থনীতি তো টিকেই আছে মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র বিক্রি করে। আর সেসব অস্ত্র নিজেদের দিকেই তাক করেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। অথচ একসময় পশ্চিম যখন ডুবছিল, সেসময় পতপত করে উড়তো ইসলামের গৌরবের পতাকা।

পশ্চিমা ইতিহাসে এগার থেকে সতের শতক অন্ধকার যুগ হিসেবে চিহ্নিত। ইউরোপজুড়ে তখন ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের জয়জয়কার। সে সময়টিতে ইউরোপের রাজারা বিলাসী ভোগবাদের মধ্যে সঁপে দিয়েছিলেন নিজেদের। দেশ চালনায় ছিলো খ্রিস্টান যাজকদের আধিপত্য। ‘চার্চ অর্ডার’ বা ‘ব্লাসফেমি’ নামে খ্রিস্টান যাজকদের ফতোয়ায় জেলে পঁচতো সাধারণ মানুষ। খৎনা নিয়ে তাচ্ছিল্য করা হতো মুসলিম ও ইহুদিদের। মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে দেওয়া হতো না। চার্চ থেকে নিষেধাজ্ঞা ছিল বিজ্ঞানচর্চার ওপর। পৃথিবী এই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে নয়, সূর্যও কেন্দ্র নয়, সূর্যও একটি গ্রহ বা নক্ষত্র এবং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে; বাইবেল অননুমোদিত এই বৈজ্ঞানিক চিন্তা প্রকাশ করায় নিকোলাস কোপার্নিকাস ও গ্যালিলিওকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। তাদের বই নিষিদ্ধ করা হয়। জিওদার্নো ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয় হাজার হাজার মানুষের সামনে। এসব বিষয়ই সতের শতকের স্পেনের কালজয়ী চিত্রশিল্পী ফ্রান্সিসকো গয়া তার বিভিন্ন চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তুলেছেন।

ইউরোপ যখন চরম অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে তখন শান্তি ও আলোর বাতি নিয়ে পশ্চিমে স্পেন থেকে পূবে চীনা প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে ইসলাম। ইসলামের এই গৌরবযাত্রার শুরুটা ৮০০ সাল থেকে ১৭০০ সাল পর্যন্ত। এ সময় ইসলামের হাত ধরে সংস্কৃতি, চিকিৎসা শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতিতে অনেক এগিয়ে যায় মুসলিমরা। বাগদাদ শহরটি হয়ে ওঠে জ্ঞান-বিজ্ঞানের তীর্থভূমি। বাগদাদে খলিফা হারুন-অর-রশিদের (৭৮৬ থেকে ৮০৯ সাল) হাত ধরেই এ আলোকযাত্রা। সে সময় জ্ঞানীর দরবার নামে অভিহিত হতো খলিফা হারুনের রাজসভা। সেখানে আসত বিভিন্ন দেশের জ্ঞানীগুণী। তাদের কাছ থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান সব কিছুই সংকলিত হতো আরবি ভাষায়। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় মুসলিমরা অনেক এগিয়ে ছিল খ্রিস্টানদের চেয়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক সময়টাও মুসলিমদের হাত ধরেই। আবু আলী আল হুসাইন ইবনে সিনা থেকে শুরু করে আল-রাজি, ইবনে রুশদ, আল বেরুনি, আল ফারাবির কথা আমরা জানি। বিশেষ করে রসায়ন, বীজগণিত এবং আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার অনেক কিছু মুসলিম চিন্তাপ্রসূত।

আমরা জানি, ওমর খৈয়াম একজন বিখ্যাত কবি, রুবাইয়াতের লেখক, কিন্তু তিনি একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ছিলেন। তবে, অনেক মুসলিম বিজ্ঞানীকেও নানা সময় ব্লাসফেমির শিকার হতে হয়েছে। দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন ইবনে সিনা। আবার এও সত্য, সেই অন্ধকার সময়ে যখন পৃথিবীর চারদিক থেকেই জ্ঞানচর্চার আলো স্তিমিত হয়ে আসছিল, তখন তা জ্বালিয়ে রেখেছিল মুসলিমরাই।

শুধু বিজ্ঞান নয়, মুসলমানদের মধ্যে তখন বিকশিত হয়েছে সুফিবাদ। বিশেষ করে পারস্যে। আজকের ইরানে, ইরাকে। ইসলামের একটি ধারা যখন রাজ্যবিস্তারে নিয়োজিত তখন সুফিরা সাধারণের বেশে জীবনের মর্ম খোঁজে বেড়াতেন। তারা পথে পথে হাঁটতেন আর প্রচার করতেন ইসলামের শান্তির বাণী। তাদের উদ্দেশ্য ছিল খোদার নূর তাজেল্লার সন্ধান। নিজেকে খোদার নূরের মধ্যে বিলীন করে দেওয়া। বৈষয়িক কোনো চিন্তা ছিল না তাদের। চিন্তা ছিল না দেশ-জাতি-বর্ণ নিয়েও। মানুষ মাত্রই তাদের কাছে সমান। তাওহিদ ও তাসাউফের বাণী নিয়ে তারা দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েন। তাদেরই কেউ কেউ এসে পৌঁছেন ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষ তখন অসংখ্য সম্প্রদায়ে বিভক্ত। রাজায় রাজায় হানাহানি। সমাজ নিমজ্জিত বর্ণপ্রথায়। সে সময় ইসলাম নিয়ে এলো ভ্রাতৃত্ব আর সম্প্রীতির ডাক। সুফিবাদে কোনো গোত্র-ধর্ম-বর্ণের বৈষম্য ছিল না। তার উদাহরণ এখনো দেখা যাবে আজমির শরিফে গেলে। খাজা মঈনউদ্দিন চিশতির (রহ.) দরবারে হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে প্রার্থনা করে। খাজা মঈনউদ্দিন চিশতি এবং তার অগণিত ভক্ত-মুরিদ এবং অন্যান্য পীর-আউলিয়ার হাত ধরেই ভারতবর্ষ তথা এই বাংলায় ইসলাম ধর্মের বিকাশ। বাংলাদেশেও এসেছিলেন হজরত শাহজালাল (রহ.), শাহপরান (রহ.)-এর মতো অনেক অলি-আওলিয়া-পীর-মাশায়েখ।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে আরবে যে ওয়াহাবি মতবাদের জš§ হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি তা ছড়িয়ে পড়ে ভারত ও বাংলাদেশে। ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রবর্তক ছিলেন মোহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহাব (১৭০৩-১৭৯২)। এই ওয়াহাবের ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন আজকের যে সৌদি রাজপরিবার; তাদের পূর্বপুরুষ মুহাম্মদ বিন সৌদ। নজদ (রিয়াদ) ও কুয়েতের কিছু অঞ্চল দখল করে তারা প্রতিষ্ঠা করেন প্রথম সৌদি রাষ্ট্র। তখনো আরবের ওই বিস্তৃত অঞ্চল ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের অধীনে। ওয়াহাবি কট্টরপন্থিরা প্রথম থেকেই সৌদি রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় সুফিবাদী ইসলামকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা শুরু করেন। ওয়াহাবীরা ইসলামকে মনগড়া কট্টরপন্থী মতবাদের দিকে নিয়ে যায়। এমনকি তারা মদিনায় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাজারেও হামলা চালায়।

১৮০১ সালে লক্ষাধিক অনুসারী নিয়ে তারা মক্কা শরিফ দখল করতে যায়। হামলা চালায় ইরান ও তুরস্কে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক হেরে গেলে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হয় এবং পুরো আরব অঞ্চল চলে যায় ব্রিটিশদের দখলে। ১৯৩২ সালে আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ যখন আধুনিক সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন তখন তার নাম দেন পূর্বপুরুষ মুহাম্মদ বিন সৌদের নামে। ‘চিরকাল ব্রিটিশদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে’- এই মর্মে লিখিত দিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে সৌদি রাষ্ট্র হস্তগত করেন তিনি। তারপর সৌদির সমস্ত শাসকই ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদের সেবা যেমন করেছে, তেমনি নিজেদের শক্তিমত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচার করেছে ওয়াহাবি মতবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশদের সঙ্গে যুক্ত হয় আমেরিকাও। পর্যায়ক্রমে সৌদি আরবের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে এবং এশিয়ার অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে তৈরি হয় বিভাজন রেখা। ওয়াহাবি খেলাফত আন্দোলনের নামেই একসময় তৈরি হয় তালেবান, আল-কায়েদা, আইএস। পবিত্র ইসলামের নামে তারা লিপ্ত হয় সন্ত্রাসবাদী কর্মকা-ে।

ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমা ষড়যন্ত্রেও শুরুটা হয়েছিলো যুক্তরাজ্যের হামফ্রে নামে এক গুপ্তচরকে দিয়ে। তিনি ছিলেন ইসলামিক সালাফি প-িত এবং ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহাবের বন্ধু। ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে আরবের নজদ প্রদেশে (বর্তমান রিয়াদ) তার জন্ম। মারা যান ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে। হামফ্রের প্ররোচনায়ই আবদুল ওয়াহাব নিজের ইচ্ছেমতো মনগড়া কথামালায় ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। বেশকিছু অনুসারীও জুটে যায় তার। সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে মোহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহাবকে সংযুক্ত করে দেন এই ব্রিটিশরাই। ফলস্বরূপ, ইসলাম ধর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ভয়ঙ্কর উগ্রবাদ। ইসলামী রাজত্বের নামে বিশ্বজুড়ে খুন হচ্ছে নিরীহ মানুষ।

ইউরোপের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে জানায়, পরমতসহিষ্ণু সুন্নিদের উগ্র ওয়াহাবিবাদে দীক্ষিত করতে ১৯৭০ থেকে চার দশকে এক হাজার কোটিরও বেশি ডলার ঢালে সৌদি আরব। এই অর্থের ২০ শতাংশের মতো আল কায়েদাসহ বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে যায়। ২০১৩ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ওয়াহাবিবাদকে ‘বিশ্ব সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর’ হিসেবে চিহ্নিত করে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী; যাদের অধিকাংশই ওয়াহাবি মতবাদের। এদেরকে সালাফিও বলা হয়।

ওই প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এই দুই পরাশক্তি পুরো বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করেছে- যে সময়টা স্নায়ুযুদ্ধের সময় হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছিল। ’৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। পৃথিবীতে একতরফা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় আমেরিকা। তখন আমেরিকার চোখ পড়ে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য। এই মধ্যপ্রাচ্যকে পেতে তারা ইসলাম ধর্মকে কলুষিত করতে ওয়াহাবিবাদকে ছড়িয়ে দিতে টাকা বিনিয়োগ শুরু করে। এ কাজে পুরোধা হিসেবে কাজ করেছে সৌদি রাজপরিবার।

যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দামকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে আবার তার সাম্রাজ্যও দখল করেছে। আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে সোভিয়েতবিরোধী লড়াইয়ে উগ্র মুসলিম গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে মদদ জোগানোর অভিযোগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। সে সময় চার্লি উইলসন নামে এক সিনেটরকে দিয়ে এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তিনি আফগানিস্তানে তালেবান বাহিনী তৈরি করে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে আফগানিস্তানের সোভিয়েত সমর্থনপুষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে তাদের লেলিয়ে দিয়েছিলেন। তালেবানদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতে ব্যবহার করা হয়েছে পাকিস্তানকে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আইএসআই তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। আবার নজিবুল্লাহ সরকার পতনের পর যখন এই তালেবানরা আশপাশের দেশগুলোর দিকে অস্ত্র তাক করতে শুরু করে তখন আবার আমেরিকাই তাদের রুখতে সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধে নামে।

তবে ওয়াহাবিবাদের প্রচারটা যেভাবে শুরু হয়েছিল, তা পরে সৌদি সরকারের হাতছাড়া হয়ে যায় বলে জানান যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান। পশ্চিমাদের কথামতো যে কাজটি সৌদি আরব শুরু করেছিল এখন এই কাজের নেতিবাচক ফল তারাও ভোগ করছে। আইএসের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু এখন তারাও। মহম্মদ বিন সালমানের আদর্শ এবং স্পষ্টভাষা ইঙ্গিত করে, তিনি তার পূর্বসূরীদের চেয়ে ব্যতিক্রমী, সাহসী ও বিচক্ষণ। প্রশ্ন হচ্ছে, যে সমস্যাটা তিনি দেখছেন তিনি তার সমাধান করবেন নাকি জিইয়ে রাখবেন! ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যদি ওয়াহাবিবাদকে আর পৃষ্ঠপোষকতা না করা হয় তবেই একদিন এই দর্শনটির অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে মুসলিম বিশ্ব। ফিরে আসবে ইসলামের হারানো গৌরব।

ওয়াহাবি আন্দোলন কী?

ওয়াহাবি আন্দোলন হচ্ছে ধর্মীয় আন্দোলন বা ইসলামের একটি শাখাগোষ্ঠী যা অর্থোডক্স, অতিচরমপন্থি, ‘মৌলবাদী, বিশুদ্ধবাদী,’ একেশ্বরবাদীর উপাসনার জন্য ইসলামী পুনর্জাগরণ, চরমপন্থি আন্দোলন ইত্যাদি নামে পরিচিত। ওয়াহাবি মতবাদে বিশ্বাসীরা মনে করেন, মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর ইসলাম ধর্ম মূল জায়গা থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাদের (ওয়াহাবি) আকিদা অনুযায়ী প্রচলিত ইসলামই সত্যিকারের ইসলাম এবং তারাই ইসলামের রক্ষক। তারা যুক্তি ও প্রেক্ষিতের আলোকে পবিত্র কোরআন গ্রহণ না করে আক্ষরিক অর্থে উপস্থাপন করে থাকেন। তাদের ভাষায়, ইসলামের মূলধারা থেকে বিচ্যুতদের সঠিক (ওয়াহাবিদের দেখানো) পথে ফিরিয়ে আনতে জিহাদ করাই সর্বোত্তম পন্থা।
হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমেদ শফী ‘মাসিক মইনুল ইসলাম’ (নভেম্বর ২০০৮ সংখ্যা) বলেছিলেন, ওয়াহাবিরা নিজেদের আকিদা ছাড়া ইসলামের অন্য আকিদার লোকদের কাফের বলে সম্বোধন করে। তারা অন্য আকিদার মুসলমানদের ধনসম্পদকে ‘গনিমতের মাল’ মনে করে এবং তাদের ধনসম্পদ কেড়ে নেওয়াকে হালাল মনে করে। যারাই তাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে তাদের দমন করতে অতীতে অনেক নির্মমতার স্বাক্ষর রেখেছে ওয়াহাবি মতাদর্শের লোকজন। ভিন্নমত দমনে চরমপন্থা বেছে নেওয়া ওয়াহাবিদের আদর্শ দ্বারা স্বীকৃত।
বিশ্বের ওয়াহাবি মতবাদে বিশ্বাসীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে বাস করে। সৌদি আরবের ২২.৯ শতাংশ, কাতারের ৪৬.৮৭ শতাংশ, আমিরাতের ৪৪.৮ শতাংশ, বাহরাইনের ৫.৭ শতাংশ, কুয়েতের ২.১৭ শতাংশ জনগণ ওয়াহাবিপন্থি। সৌদি আরবের ওয়াহাবিপন্থি লোকের বেশিরভাগ নজদ অঞ্চলে (বর্তমান রিয়াদ) বাস করে। সৌদি আরব, কাতার, শারজাহ এবং রাস আল খাইমাহতে ইসলামের অফিসিয়াল সংস্করণ হচ্ছে ওয়াহাবি মতবাদ। এদেরকে আহলে হাদিস, সালাফিও বলা হয়ে থাকে।

উপরে