আপডেট : ১৮ এপ্রিল, ২০২০ ১৯:৩৯

করোনা জয়ে উত্তাল সমুদ্রে মন্ত্রের সাধনা....

তাহমিনা ইসলাম
করোনা জয়ে উত্তাল সমুদ্রে মন্ত্রের সাধনা....
করোনা হাই এলার্টের মধ্যেই ঢাকার একটি মসজিদে নামাজ পড়ছেন মুসল্লীরা

ইতিহাস থেকে উঠে আসা জয় পরাজয় থেকে মানুষ তাদের অমানুষিক শক্তি, অবিচল চিত্তের প্রমান বার বার দিয়েছে।বার্তমান পরিস্থিতে পৃথিবীর মানুষদের আবারো সেই শক্তির পরিচয় দিতে হবে। এমনি শক্তির সঞ্চার জোগাতে ইতিহাস থেকে উঠে আসা একটি গল্প পাঠকদের উদ্দেশ্যে....

১৮১৪ সালে ইংরেজ গভর্নমেন্ট নেপাল রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন।ঘোষনার পর জেনারেল গিলেস্পি দেরাদুন হতে নেপাল সীমান্তপ্রদেশে আক্রমন করতে আগ্রসর হয়।যুদ্ধ ঘোষনার পর নেপালের সীমান্তপ্রদেশের কলুঙ্গা নামক স্থানে অল্পসংখ্যক একদল গোরক্ষ সৈন্য ছিল মাত্র তিনশ জন এবং তাদের অধিনায়ক ছিল বলভদ্র থাপা।এই সৈন্য দলের কাছে তেমন কোন অস্ত্র ও ছিল না, কারো কাছে ছিল তীর,ধনুক আর কারো কাছে পুরাতন বন্দুক। তারা তাদের অত্মোরক্ষার জন্য পুরাতন ভগ্ন প্রাচীর কোনরকম ঠিক ককরতে লাগলো। ২৫ অক্টোবর মাঝ রাতে বলভদ্রের কাছে ইংরেজ দূত যুদ্ধপত্র পাঠালেন এবং তাকে লিখা ছিল: "এই অসম যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করা বীরপুরুষের জন্য গ্লানিজনক না, গোরক্ষ- সেনাদের বিনা রক্তপাতে দূর্গ ত্যাগ করাই উত্তম"। এবং একথার উত্তরে গোরক্ষ সেনাপতি ইংরেজ দূতকে লিখেছিলেন: "তোমাদের দলপতি কে বলবে আগামীকাল যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি একথার উত্তর পাবেন"।

একমাসের বেশি সময় ধরে চলতে লাগলো কলুঙ্গার রক্ষার এবং অধিকারের যুদ্ধ।গোরাক্ষ সৈন্যদের ততোদিনে ফুরিয়েছে যুদ্ধের উপকরণ খাবার এবং পানি।ইংরেজদের কামানের গোলায় গোরক্ষ সৈন্যসহ মারা যায় তাদের স্ত্রী এবং তাদের সন্তান।এত বিপদের মাধ্যেও যোদ্ধারা অবিচলিত চিত্ত।গোরক্ষো সৈন্য অমানুষিক শক্তিতে যুদ্ধ করতে লাগলো,বারুদ ফুরালে তীর- ধনুক দিয়ে,তীর- ধনুক ফুরালে পাথর ছুড়ে শত্রুর নাজেহাল অবস্থা করতে লাগলো।এই অসম সংগ্রামে গোরক্ষদের জয় হয় আর দূর্গজয়ের আশা নেই দেখে ইংরেজ- সৈন্য দেরাদুন ছেড়ে চলে গেলো। পরবর্তীকালে অবশ্য আবারো আক্রমনে কলুঙ্গা জয় করে ইংরেজ সৈন্যদল।

এবার আসি এক অন্য যুদ্ধের কথায়। এবারের যুদ্ধটি সারা পৃথিবী ব্যাপী। সারা পৃথিবীর মানুষ এখন এক অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে লড়াই করছেন। এই অদৃশ্য শত্রু খালি চোখে দেখা যায় না ধরা যায় না ছোঁয়াও যায়না। এই শত্রুর নাম কোভিড-১৯। ইতিমধ্যে পৃথিবীতে প্রতি ঘন্টায় হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে এই ভাইরাসের সংক্রমণে। এই ভাইরাস কে সামলাতে পৃথিবীর বড় বড় দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে। চায়না থেকে শুরু করে আমেরিকা, ইতালি ফ্রান্স, ব্রিটেন সবাই নাস্তানাবুদ। পর্যাপ্ত চিকিৎসা সামগ্রী করোনা সনাক্তকরণ উপকরণ এবং পর্যাপ্ত জ্ঞান সম্পন্ন লোকবল এর অভাবে আজ বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে। এই যুদ্ধে মানুষ আজ পরাস্ত। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে যে দেশটিকে বলা হয় বিশ্বের পরাশক্তি এবং বিশ্বের মোড়ল, সেই দেশটি ও আজ নাকাল অবস্থা। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই গতকাল পর্যন্ত ৩৭হাজার মানুষ করোনায় মারা গেছে। সেখানেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সামগ্রী নেই, নেই করোনা সনাক্তকরণ উপকরণ। এবারে আসি আমাদের বাংলাদেশের কথায়। দেশটিতে প্রাচুর্যের তুলনায় জনসংখ্যা কয়েক হাজার গুণ বেশি। নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা সামগ্রী। পর্যাপ্ত বললে ভুল হবে আমাদের চিকিৎসাসেবা বলতে গেলে এক ধরনের শূন্যের কোঠায়। যে দেশে পথ চলতে মানুষে মানুষে ঠোকাঠুকি হয় এই দেশটিতে করোনা সামাল দেওয়ার কোন শক্তি জনগণের নেই, সরকারের নেই। তবে শক্তি আছেও;তা হচ্ছে অদম্য মনোবল। করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত ঘরে থাকা। সেটাই হতে পারে করোনা যুদ্ধের একমাত্র হাতিয়ার অন্ততপক্ষে বাংলাদেশের জন্য।

দেশের এই উত্তাল পরিস্থিতিতে নিজেদের অসচেতনতার অভাবে করোনার মতো জটিল এবং ধ্বংসাত্মক ভাইরাসকে বাড়তে দেওয়া যাবে না,এর জন্য চাই সরকারের বিধিনিষেধ মেনে ঘরে থাকা, দরকার ছাড়া বাড়ির বাইরে না যাওয়া, সর্বাত্মক সাচেতনতার সাথে এই কঠিন অবস্থা মোকাবেলা করা এবং নিজের মানুষিক অবস্থা ঠিক রেখে নিজে সচেতন হওয়া এবং অন্যকেও সচেতন করা।

উপরে