আপডেট : ২৫ মার্চ, ২০১৮ ১৭:০৩

পদত্যাগ করেও ফেরা যায় জানেন না খালেদা

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
পদত্যাগ করেও ফেরা যায়
জানেন না খালেদা

প্রতিদিনি সকাল ৭টার দিকে আগারতলার কাঁচাবাজারগুলোতে আসেন তিনি কোনদিন পায়ে হেঁটে আবার কোনদিন রিকশায়। হাতে বহুদিনের পুরনো ক্যানভাসের বাজারের ব্যাগ। পড়নে আটপৌড়ে শাড়ি। দরদাম করেন মাছ, আনাজপাতি, চাল ডাল ও গৃহস্থালি জিনিসপত্রের। খুব সতর্ক হয়েই কেনেন তিনি। কখনো কখনো দাম নিয়ে দরকষাকষিও করতে দেখা যায় তাকে। চেষ্টা কিছু পয়সা বাঁচানো। যেন পরের দিনগুলোতে একটু স্বস্তি পাওয়া যায় কেনাকাটায়।

তিনি কিন্তু যেনতেন সাধারণ নারী নন। তিনি আগরতলার সদ্য পদত্যাগী মূখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের স্ত্রী পঞ্চালী সরকার। মানিক সরকার গত ২৫ বছর ধরে ত্রিপুরার মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন। দুইদিন আগে লোকসভা ভোটে তিনি পরাজিত হন বিজেপির কাছে। মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী থাকাকালীন বা তার আগে থেকেও খুব সাধারণ জীবনযাপন করছেন পঞ্চালি। মূখ্যমন্ত্রী পত্নী হয়েও ব্যবহার করেন নি সরকারি গাড়ি।

আর মানিক সরকারও ছিলেন এমনই। রোজ ঘুম থেকে উঠে তার প্রথম কাজ হচ্ছে নিজের জুতো কালি করা। এরপর নিজের কাপড় ধুয়া। মুখ্যমন্ত্রীর জন্য রাষ্ট্রীয় যে রাজকীয় বাসভবন বরাদ্দ ছিল তা তিনি ব্যবহার করেন নি কোনদিন। থেকেছেন পৈত্রিক টিনশেডের বাড়িতে। তাও আবার পাঁচশো স্কয়ার ফিটের। আগরতলার বাজার দরে এই বাড়ির দাম দুই লাখ বিশ হাজার টাকা। বর্তমানে অবশ্য মানিক সরকার থাকছেন পার্টি অফিসে। ব্যংকে জমানো টাকা আছে পাঁচ হাজার রুপি। খুব প্রয়োজন না পড়লে মানিক সরকারও পায়ে হেঁটে বাসা থেকে অফিসে যেতেন।

মূখ্যমন্ত্রী অবস্থায় যখন গাড়ি চড়তেন তখন প্রটোকল নিতেন না। ট্রাফিক সিগন্যালে অন্য আট দশটা সাধারণ গাড়ির মতই তার গাড়ি সিগন্যাল মেনে চলতো। রাষ্ট্র থেকে যা বেতন পেতেন তা দিয়ে দিতেন পার্টি তহবিলে। কোন ইমেইল নেই তার। নেই মোবাইল ফোনও। সেই দিক দিয়ে বিচার করলে মানিক
সরকারের চেয়েও ধনি ছিলেন নেপালের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা। তার ছিল তিনটি মোবাইল ফোন। যার মধ্যে একটি আইফোন। একটি পুরনো। আর একটি নষ্ট। ফোন বাদে আর কোন স্থাবর অস্থাবর সম্পদ ছিল না সুশীল কৈরালার। থাকতেন ভাইয়ের বাড়িতে। বেতন যা পেতেন দিয়ে দিতেন পার্টি তহবিলে। কোন ব্যাংক একাউন্ট ছিল না তার। ২০১৪ সালে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখন বেতন তোলার জন্য তার ব্যাংকে একাউন্ট খোলার প্রয়োজন পড়ে। এটিই ছিল ৭০ বছরের সুশীল কৈরলার প্রথম ব্যাংক একাউন্ট।

নেপাল বা আগরতলা থেকে বেশি দূরে নয় ঢাকা। এখানেও অনেক রাজনীতিবিদের জন্ম হয়েছে। এখানে রাজনীতির দ্বৈরথ আছে। পুঁজিবাদের দৌড়ঝাঁপে এদের মধ্যে কেউ কেউ খেই হারিয়ে ফেলেছেন। রাজনীতিকে ব্যবহার করেছেন টাকা উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে। অবস্থাটা হয়েছে এমন যে, রাজনীতিবিদরা দূর্নীতি করবেন কিন্তু বিচার করা যাবে না। আর যদি জেলে যেতে হয়, সেটাকে মনে করছেন তার বিরুদ্ধে অবিচার করা হচ্ছে। তখন ন্যায় বিচারের দাবীতে মাঠে ময়দানে নামানো হচ্ছে পার্টির কর্মীদের।

প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক নেতারা কী আইনের উর্ধ্বে? ১৯৯০ সাল পরবর্তী সময়ে যখন হোসেইন মোহম্মদ এরশাদকে জেলে যেতে হয়। সেসময়েও তার দাবী ছিল, তার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। এখনও মাঝে মধ্যে জনসভায় এসব কথা বলেন তিনি। বগম খালেদা জিয়া দুবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দ্বিতীয় দফা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। এ সময়টা দূনীতির স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছিলো বাংলাদেশ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালে সূচকে টানা পাঁচবার দূর্নীতির শীর্ষ আসনটি ছিল বাংলাদেশের দখলে। তার দুই ছেলেও নানা দূর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিলেন। অখ্যাত এক হাওয়া ভবন হয়ে উঠেছিল দূনীতির কেন্দ্রবিন্দু। কথিত আছে সেসময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যলয়ের চেয়েও প্রভাবশালী ছিল হাওয়া ভবন। সেটি চালাতেন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান।

জিয়া অরফানেঞ্জ দূনীতি মামলায় বেগম খালেদা জিয়া এখন জেলে। তার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ উঠেছে সেগুলো অমূলক প্রমাণে তৎপর বিএনপির আইনজীবীরা। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করা হয় তারেক রহমানকে। এ নিয়ে বির্তক হচ্ছিলো তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করতে গঠনতন্ত্রের ৭ ধারা বাদ দেয়া নিয়ে। বিএনপির গঠনতন্ত্রে ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী- দ-িত ব্যক্তি, দেউলিয়া, উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি বা সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি পার্টির সদস্য পদে থাকতে পারবেন না। বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার রায় ঘোষণার ১০ দিন আগে ৭ নম্বর ধারা বাদ দিয়ে বিএনপি দলীয় গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেয়। এ থেকে নিশ্চিত প্রমাণ হয় তারেক রহমানের মতো দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের হাতে নেতৃত্ব দিতেই ধারা পরিবর্তন করা হয়েছে।

বিএনপির অফিসে ঢোকার মুখেই বিশাল এক সাইনবোর্ডে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান প্রণীত ১৯ দফার একটি বিশাল সাইনবোর্ড চোখে পড়বে সবার। সেই সাইনবোর্ডের ১৮ নং ধারায় বলা হয়েছে দূর্নীতিমুক্ত, ন্যায়নীতি ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা। জিয়ার এই উনিশ দফা বিএনপির
ওয়েবসাইটেও রয়েছে।

‘আপাত দৃষ্টে মনে হচ্ছে জিয়ার আদর্শ থেকে সরে এসেছে বিএনপি।’ এটা দলটির শীর্ষ নেতাদের অনেকের মনের কথাও। শুধু পদ ও পদবী হারানোর ভয়ে বলতে পারছেন না। ২০১৫ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যন পদ থেকে অবসরে গিয়ে এ কথাগুলো বলেছিলেন বর্ষিয়ান বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরী। তিনি বলেছিলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গঠনমূলক রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা করতেন। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সেই চিন্তা-চেতনা থেকে সরে এসেছে। সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশে রাজনীতিতে অবক্ষয় ঘটেছে। যা এক অশনি সংকেত।

একটি গনতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের জন্য গঠনতন্ত্র একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। গঠনতন্ত্র মেনেই চলতে হয় দলকে। বিএনপি যদি গঠনতন্ত্র মেনে চলতো তবে দূর্নীতির দায়ে দলীয় প্রধানের পদটি বেগম খালেদা জিয়া হারাতেনই দূর্নীতির দায়ে। কিন্তু হয়েছে উল্টোটা। পদ যাতে না হারাতে হয়, সেজন্য গঠনতন্ত্রের ৭ ধারাটিই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন দূর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চাদাবাজ যে কেউই দলটির সদস্য হতে পারবে।

এখন কথা হচ্ছে বিএনপি কি গণতান্ত্রিক? বিএনপি কি স্বচ্ছ? বিএনপি কি তার দলের নেতাকর্মী ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধ? যদি তাই হয় তবে খালেদা জিয়ার উচিত ছিল দূনীতির কথা যখন উঠছে তখনই চেয়ারপার্সনের পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। তারপর তিনি মামলা লড়তে পারতেন। যদি তিনি বিচারে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারতেন তবে আবার ফিরেও আসতে পারতেন। আর সে ফিরে আসা হতো আরও শক্তিশালী। আরও দৃঢ়। দলের জন্যও তা হতো এক বিজয়ের। কিন্তু তিনি তা করেন নি। উল্টো জেলে যেতে হতে পারে এই কথা আগে থেকে মাথায় রেখে তিনি গঠনতন্ত্রের সাত ধারা পরিবর্তন করেছেন।

দূনীতির দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করেছেন আবার সেই দায়মুক্ত হয়ে নিজ আসনে ফিরে এসেছেন এরকম উদাহরণ আমাদের আশেপাশেই আছে। দূর্নীতির দায় কাঁধে নিয়ে এই দায় প্রমাণের আগেই অনেক রাষ্ট্রনেতা পদত্যাগ করেছেন।

আবার দায় প্রমাণ না হওয়ায় স্বপদে ফিরে এসেছেন এরকম উদাহরণ অনেক আছে। শুধু উদাহরণ নেই এখানে। ভারতের ৭ম উপ-প্রধানমন্ত্রী বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানির উদাহরণ তো বেশী দিনের পুরনো নয়। হুন্ডি করে বিদেশে টাকা পাচারের দায় পড়েছিল তার ওপর। সেই দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন তিনি। পরে যখন কোর্টে এই অভিযোগ প্রমাণিত না হয় তিনি ফিরে এসেছিলেন স্বপদে।

কথা হচ্ছে, তিনি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিরোধী দলীয় নেত্রী। তিনি কেন জেলে যাবেন? বিরোধী দল হোক আর ক্ষমতাসীন দলই হোক। পৃথিবীর অনেক রাষ্টনায়ক বা রাজনীতিবিদকে দুর্নীতি করে জেলে যেতে হয়েছে। ২০১৭ সালের ১৭ আগষ্ট ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় আট বছরের সাজা মাথায় নিয়ে জেলে যেতে হয়েছে কিরগিজস্তানের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ওমরবেক তেকিবায়েভকে। তিনি ছিলেন কিরগিজ আতামাকেন (পিতৃভূমি) পার্টির চেয়ারম্যান। জনগনের সম্পদ নষ্ট করাসহ আরও কিছু অপরাধের দায়ে ১৩ বছরের সাজা খাটছেন ভেনিজুয়েলার ভলান্টেডে পপুলার পার্টির প্রধান লিয়োপোলদো লোপেজ।

মালয়শিয়ায় জেলে যেতে হয়েছে পাকাতান রাকায়াত পার্টির প্রধান আনোয়ার ইব্রাহিমকে।

রোমানিয়ার ডেমোক্রেটিক লিবারেল পার্টি (পিডিএল) এর ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ স্টেফানের বিরুদ্ধে যখন অভিযোগ ওঠে তখনই তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থার শীর্ষপদে তার পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া। এছাড়াও তিনি কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান থেকে অনৈতিক উপায়ে টাকা কামিয়েছিলেন।

গনতন্ত্রের জন্যই এদেশে একটি শক্ত গনতান্ত্রিক বিরোধী দল দরকার। বিএনপিও গণতান্ত্রিক উপায়ে একটি শক্ত বিরোধীদল হয়ে উঠতে পারে। এই বিরোধীদলের কাজ হবে ক্ষমতাসীন দলের সব কাজের পরীবিক্ষন ও পূনমুল্যায়ন। তারা সরকারের সব ধরণের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করবে। সরকারকে গাইডও করবে। এভাবেই গঠনমূলক পালাবদলে দেশ এগিয়ে যাবে।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

উপরে