আপডেট : ২৪ মে, ২০১৭ ১১:১৯

অবশেষে আওয়ামী লীগের ঘুম ভেঙেছে

পীর হাবিবুর রহমান
অবশেষে আওয়ামী লীগের ঘুম ভেঙেছে

অবশেষে আওয়ামী লীগের ঘুম ভেঙেছে। নিবেদিত প্রাণ, ত্যাগী, আদর্শিক নেতাকর্মীদের দূরে ঠেলে সুবিধাবাদীদের জন্য দলের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া সংগঠন ও মানুষের জন্য যে কল্যাণ বয়ে আনে না তা বুঝতে পারছেন নেতারা। আওয়ামী সভানেত্রী মুখ খোলার পর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের পরিষ্কার বলেছেন, কেন্দ্রের অনুমতি ছাড়া কাউকে দলে যোগদান করানো যাবে না। যিনি যোগদান করাবেন তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আওয়ামী লীগ এই উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি রাজনৈতিক দলই নয়; জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে এর চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছিল এক দফা।

৭৫ এর ১৫ আগস্ট কালো রাতে ঘটে যাওয়া মানব সভ্যতার ইতিহাসে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দলটির যে বিপর্যয় এসেছিল সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আরেক দফা জনপ্রিয় দল হিসাবে তৃণমূল বিস্তৃত সাংগঠনিক শক্তি লাভ করেছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ স্বাধীকার, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সুমহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় নেতৃত্বই দেয়নি; এদেশের গণমানুষের দলে পরিণত হয়েছিল। সুমহান মুক্তিযুদ্ধের আর্দশ, মূল্যবোধ ও গণমানুষের আশা আকাঙ্খা লালন করে অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক কথায় গণতন্ত্রের দীর্ঘ লড়াইয়ের পথে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা দলে বিভিন্ন স্তরে নেতাকর্মীরা জেল খাটেননি এমন ইতিহাস নেই। নেতাকর্মীরা রক্ত দেননি, নির্যাতনের শিকার হননি এমন কোনো আন্দোলনের নজির নেই।

টানা ৯ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের কোনো মাপকাঠিতে ফেলা যায় না। এটি একটি সাংবিধানিক সংকট উত্তরণের নির্বাচন ছিল। কিন্তু তার আগে পরে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়লাভ ছিল ইঙ্গিতবহ। যদিও হঠকারী, উগ্র আগুন সন্ত্রাসের হরতাল অবরোধের অকার্যকর কর্মসূচিতে একদিকে সাধারণ মানুষের মৃত্যু অন্যদিকে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীর নামে মামলা, কারাবরণ দলের সাংগঠনিক শক্তি ক্ষয় ঘটিয়ে দিয়েছে। এই সুযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ দলীয় এমপিরা নিজেদের পাল্লা ভারী করতে মামলা খাওয়া বিএনপি- জামায়াতের অনেককেই দলে ভিড়িয়েছেন।

আজকাল আওয়ামী লীগের কোনো মন্ত্রী, নেতা, এমপি কোনো পথ দিয়ে হেঁটে গেলে জনতার ঢল নামে। এই ঢলের মুখগুলো কি আদৌ সবাই দলের নিবেদিত প্রাণ নেতাকর্মী? নাকি ক্ষমতাসীন দলের ছায়ায় এসে মুনাফা লুটে নাদুশ-নুদোশ হওয়া সুবিধাভোগী? বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে আওয়ামী লীগ নেতারা যখন রাস্তায় হরতালে অবরোধে মিছিলে নামতেন তথন আজকের আওয়ামী লীগের দেশজুড়ে যে জনস্রোত তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মুখ দেখা যেত না।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও অভিজ্ঞতার উপলব্ধি থেকে বলেছেন, ওরা দলে ঢুকে কমিশন খাওয়ার জন্য। ব্যবসায়িক ফায়সা হাসিলের জন্য। এদের চাপে কোণঠাসা হয়ে যায় নিবেদিত প্রাণ নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগ একদা ছিল গরিবের দল, একদা ছিল গণমানুষের শক্তি, একসময় ছিল সৎ রাজনীতির এক আদর্শিক বটবৃক্ষ। সেই ধারায় আজকের আওয়ামী লীগ কতটা পথ চলছে, সেই হিসাব-নিকাশ থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি লাভের পথ না নিয়ে এদের কি রুখে দেয়া সম্ভব? যেখানে মধু সেখানেই মৌমাছি, যেখানে খাবার সেখানেই কাউয়ার উড়াউড়ি, যেখানে সুবিধা সেখানেই তো ডাকে বসন্তের কোকিলেরা।

আওয়ামী লীগ রাজনীতির চিত্রপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু ৭০ সালের নির্বাচনে দলের গরিব, সৎ, আর্দশ অন্তঃপ্রাণ মাঠকর্মী, স্কুল শিক্ষক থেকে দিন এনে দিন খাওয়া অতি সাধারণ পরিবারের উকিলদেরকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ইমেজের ওপর, নামের ওপর জয়লাভ করে তারা রাজনীতিকে আলোকিত করেছিলেন। সামন্ত শ্রেণীর ধ্বংসস্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা তথাকথিত বনেদী বা অভিজাত পরিবারের মুসলিম লীগারদের পরাজিতই করেননি, রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের জন্য স্বপ্নময় করে তুলেছিলেন।

আওয়ামী লীগ ৯১ সাল পর্যন্ত সেই ধারা অব্যাহত রাখলে সেই নির্বাচনে বিএনপি টাকাওয়ালাদের এবং সামরিক শাসকদের সুবিধাভোগী আমলাদের মনোনয়ন দিয়ে যখন ক্ষমতায় চলে এলো তারপর আওয়ামী লীগও নিজেদের আদর্শিক ধারার লড়াই থেকে সৎ মানুষের রাজনীতির পথ থেকে টাকাওয়ালাদের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। টাকাওয়ালারা রাজনীতিতে বিনিয়োগ করেন। দল ক্ষমতায় এলে সুদে আসলে ৩ গুণ উঠিয়ে নেন। একসময় আদর্শিক রাজনীতিবিদদের সৎ জীবন যাপনের সঙ্গে মানুষের কল্যাণের রাজনীতিতে নিয়োজিত থাকতে শুভাকাঙ্খী ব্যবসায়ীরা আর্থিক সহযোগিতা দিতেন। রাজনীতিবিদরাও সেই অর্থ ভোগ, বিলাসের জীবন যাপনে ব্যয় না করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতেন।

এক সময় সামরিক শাসকদের পথ ধরে ‍উঠে আসা ব্যবসায়ী ও সামরিক-বেসমারিক আমলারা সংসদে নিজেদের সংখ্যা বাড়ালেন। সেই প্রতিযোগিতায় আওয়ামী লীগের মতো দল যেখানে বলা হয় গৌরবের সঙ্গে আওয়ামী লীগ হয়ে জন্মাতে হয়, আওয়ামী লীগ হওয়া যায় না। সেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসারা রাতারাতি আওয়ামী লীগ হয়ে গেলেন? আওয়ামী লীগ শুধু এখানে আদর্শিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আপোসই করেনি, দলের অনেকে এমপি মন্ত্রী হয়ে ব্যবসায়ী হতে শুরু করলেন। আগে ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে এসে বাণিজ্য করতেন আর এখন রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক বাণিজ্যিকীকরণকে আত্মস্থ করছেন।

সরকারের দমন নীতির মুখে সারাদেশে আওয়ামী লীগের এমপি মন্ত্রীদের হাত ধরে বিভিন্ন নাশকতার মামলার আসামি, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরাও আওয়ামী লীগে যোগ দিতে থাকলেন। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই সরকার দলীয় এমপি আব্দুল ওয়াদুদের হাত ধরে ৮০০ জামায়াত কর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কি বিশ্বাস করেন এরা সুমহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বাস্তবায়ন করতে এসেছেন? আওয়ামী লীগ তাদেরকে চিহ্নিত করে এখনো কেন দল থেকে বের করছে না? আওয়ামী লীগ দলের অভ্যন্তরে মাঠ পর্যায়ে নিবেদিত প্রাণ নেতাকর্মীদের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের মহোৎসব ঘটিয়ে যারা তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে, সেইসব দলীয় অপরাধীদের দলীয় কোর্ট মার্শালে দাঁড় করাতে পেরেছে কি?

আওয়ামী লীগ দেশের ব্যাপক উন্নয়ন চিত্র জনগণের সামনে নিয়ে যাচ্ছে। জনগণের রায় আনতে এটাই স্বাভাবিক, এটাই আওয়ামী লীগের শক্তি। আওয়ামী লীগের শাসনামলে নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজই শেষ হচ্ছে না, অসংখ্য রাস্তাঘাট, সেতু, ফ্লাইওভারই নির্মিত হচ্ছে না, উন্নয়নের মহাকর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ শাসনামলে প্রশ্নপত্র ফাঁস, ব্যাংকিংখাতে লুটপাট এবং শেয়ার কেলেংকারির মতো ঘটনা নিয়ে দলীয় ফোরামে ব্যাপক আলোচনার ভিত্তিতে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দায়িত্বশীলদের কখনো বলা হয়েছে কি? দেশের বিদ্যুতের উন্নয়নে, প্রযুক্তি বিপ্লবে আওয়ামী লীগের উন্নয়ন গৌরবেরই নয়, সমুদ্র বিজয় থেকে ছিটমহল সমস্যার সমাধান ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু সারাদেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কারা কারা সিন্ডিকেট গঠন করে কমিশন বাণিজ্যের রমরমা ব্যবসা করছেন, কাদের অনুমতি ছাড়া মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারছে না? তাদের দলীয়ভাবে কি আদৌ চিহ্নিত করা গেছে?

আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাকর্মীরা নিবেদিত প্রাণই নন, সৎ ও গণমুখী চরিত্রের। আওয়ামী লীগের মহাদুর্দিন ৭৫ উত্তর দুর্দিনে যারা দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে মাঠে ময়দানে অনন্য সাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একদিকে সামরিক স্বৈরশাসক অন্যদিকে অতি বিপ্লবী ও উগ্রপন্থি রাজনৈতিক শক্তির অস্ত্রের মুখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পতাকা তুলে ধরে পথ হেঁটেছেন, তাদের কতজন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আজকে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছেন? তাদের অনেককে দলের বাইরে নির্বাসিত জীবনে রাখা হয়।অন্যদিকে বিএনপি জামায়াতের কর্মীদের দলে টানা হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের যে উপলব্ধি হয়ে, যেভাবে টনক নড়েছে তাতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গণমানুষের সৎ রাজনৈতিক নেতাকর্মীর নেতৃত্বে গণমুখী দল হিসাবে ক্লিন ইমেজে নিয়ে আসতে হলে ভোগবাদী, লুটেরা চরিত্রগুলো সরিয়ে আদর্শিক সৎ নেতৃত্ব মাঠ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করা ছাড়া এই সমস্যার সমাধান কি আদৌ সম্ভব? দলের নেতৃত্বকে এটিই আজ বিবেচনায় নিতে হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে